ভোর থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া হাইস্কুলসংলগ্ন মহাসড়কের পাশে খোলা জায়গা ও দোকানের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন অসংখ্য মানুষ। কেউ দিনমজুর হিসেবে কাজের আশায়, আবার কেউ এসেছিলেন শ্রমিক নিতে। প্রতিদিনের মতোই শুরু হতে যাচ্ছিল আরেকটি কর্মদিবস। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সেই অপেক্ষার স্থান পরিণত হয় মৃত্যুর মিছিলে।
নিয়ন্ত্রণ হারানো একটি যাত্রীবাহী বাস রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের চাপা দিলে ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে মিলিয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন আরও ১৫ জন। তাদের বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বগুড়া-নওগাঁ মহাসড়কের বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার দুঘোলগাছি গ্রামের তাজিমুল (৪৭), গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামের আবু সাঈদ (৪৫), জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পার্বতীপুর গ্রামের আনারুল হক (৫৫), জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার আমিরপুর গ্রামের আমিরুল ইসলাম (৪০), গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বহিল গ্রামের নুর আলম (৪৫), বগুড়া সদর উপজেলার ফাঁপোড় মধ্যপাড়া গ্রামের বেল্লাল হোসেন (৪০) এবং কাহালু উপজেলার নারহট্ট সরদারপাড়া গ্রামের নুর মোহাম্মদ (৭৫)। নিহতদের মধ্যে পাঁচজন দিনমজুর এবং দুজন শ্রমিক নিতে এসেছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী হারুন অর রশিদ ও জোবায়ের আহম্মেদ জানান, শাহ ফতেহআলী পরিবহনের একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস ঢাকা থেকে নওগাঁ যাচ্ছিল। এরুলিয়া হাইস্কুল এলাকায় একটি মোটরসাইকেল হঠাৎ মহাসড়কে উঠে এলে সেটিকে বাঁচাতে গিয়ে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান। বাসটি প্রথমে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ধাক্কা খেয়ে প্রায় ৫০ গজ সামনে গিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা পিচ্ছিল সড়কে ঘুরে বিপরীতমুখী হয়ে রাস্তার পাশে অপেক্ষমাণ মানুষের ওপর উঠে যায়।
দুর্ঘটনার পর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আর্তনাদ। স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজে অংশ নেন।
বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী বলেন, ‘ঘটনাস্থলেই তিনজন মারা যান। হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও চারজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। দুর্ঘটনার পর বাসের চালক, হেলপার ও সুপারভাইজার পালিয়ে গেছেন। বাসটি জব্দ করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহতদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।’
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজখবর নেন। আহতদের চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন গ্রুপের রক্তের সংকট দেখা দিলে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বেচ্ছায় রক্তদানের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নিহত প্রত্যেকের দাফন-কাফনের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা এবং দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন।
দুর্ঘটনায় বাসের কয়েকজন যাত্রীও আহত হন। তাদের মধ্যে নওগাঁ সদর উপজেলার বাসিন্দা ইউনুছ আলী বলেন, ভোরে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কম ছিল। চারমাথা বাস টার্মিনাল পার হওয়ার পর থেকেই বাসটি দ্রুতগতিতে চলছিল। বৃষ্টিতে ভেজা সড়কে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা মহাসড়কে অবরোধ করে গতিনিয়ন্ত্রক (স্পিড ব্রেকার) নির্মাণের দাবি জানান। তাদের অভিযোগ, এরুলিয়া এলাকায় তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, একটি মসজিদ ও অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও সড়ক বিভাগ এলাকাটিকে ‘দুর্ঘটনাপ্রবণ’ এলাকা উল্লেখ করে সাইনবোর্ড দিলেও মহাসড়কে কোনো গতিনিয়ন্ত্রক ছিল না। প্রতিদিন ভোরে শতাধিক দিনমজুর রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কাজের অপেক্ষা করেন, কিন্তু তাদের জন্য নিরাপদ কোনো অপেক্ষাস্থল নেই। এ কারণে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে।
খবর পেয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াজেদ আলী ও পুলিশ ঘটনাস্থলে যান। স্থানীয়রা জানান, গতিনিয়ন্ত্রক নির্মাণের কাজ শুরু না হওয়া পর্যন্ত তারা অবরোধ প্রত্যাহার করবেন না। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মীরা এরুলিয়া হাইস্কুল এলাকার মহাসড়কের দুই পাশে দুটি গতিনিয়ন্ত্রক নির্মাণের কাজ শুরু করলে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। এরপর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।