শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬,
২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: বাংলাদেশ নয় হাসিনাকে প্রাধান্য দিচ্ছে ভারত      হামের থাবায় নতুন ভয়      চার মন্ত্রণালয় ও বিভাগে নতুন সচিব নিয়োগ      পরিবর্তন হচ্ছে র‌্যাবের নাম      প্রথম শ্রেণিতে লটারি, অন্য সব শ্রেণিতে নেয়া হবে ভর্তি পরীক্ষা      ডেঙ্গু নিয়ে একদিনে হাসপাতালে ভর্তি ৪৭১      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু      
দেশজুড়ে
প্রথমবার ‘কাঁঠাল থেকে বিস্কুট’ তৈরি করে চমকে দিলেন ছাত্তার
গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২০ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

কাঁঠালের রাজধানীখ্যাত গাজীপুরে প্রতি মৌসুমে হাজার হাজার টন কাঁঠাল গাছেই পচে গলে নষ্ট হয়। ভরা মৌসুমে গাছপাকা কাঁঠালে সয়লাব হয়ে থাকে বাগান ও স্থানীয় বাজারগুলো। এ সময় দামও কম থাকে। পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতীয় এই ফল সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় পচনরোধ করা সম্ভব হয় না। স্থানীয় বাগান মালিকদের এমন অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে চলে আসছিল।

তবে সেই অভিযোগের সমাপ্তি হলো। নতুন কিছু তৈরি করে চমকে দিয়েছেন গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার বৈরাগীরচালা গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া। অপচয়রোধ আর কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহারের চিন্তা থেকে ‘কাঁঠাল বিস্কুট’ উৎপাদন করেছেন। সেই সঙ্গে বাজারজাত করে পেয়েছেন সাফল্য। আর তার কারখানায় কাজ করছেন খাদ্য উৎপাদনে অভিজ্ঞ কর্মীদের দল।

এদিকে ‘কাঁঠাল বিস্কুট’ উৎপাদনের খবরে স্থানীয় কাঁঠাল বাগান মালিকরা জাতীয় এ ফল চাষ থেকে আশার আলো দেখছেন। কাঁঠালের উপযুক্ত বাজারমূল্য পাওয়ার আশাও করছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুর জেলায় যে পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদন হয়, তার সিংহভাগ আসে শ্রীপুর উপজেলা থেকে। এই উপজেলায় যার জমি আছে, তার কাঁঠাল গাছ নেই—এমনটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। গাজীপুরে প্রতি বছর ৯ হাজার ১০০ হেক্টরের বেশি জমিতে কাঁঠাল উৎপাদন হয়। এর মধ্যে শ্রীপুর উপজেলায় হয় তিন হাজার হেক্টরের বেশি। শ্রীপুরের উঁচু লাল মাটির কারণে এখানকার কাঁঠাল সুস্বাদু, সুমিষ্ট এবং মানসম্মত।

বৈশাখ থেকে ভাদ্র—বছর ঘুরে এই সময়টাতে গাজীপুরের গাছে গাছে শোভা পায় জাতীয় ফল কাঁঠাল। তবে সঠিক সংরক্ষণ ও বিপণনের অভাবে প্রতি বছরই বাগানে পচে নষ্ট হয় টনকে টন ফল।

এবার সেই অপচয়রোধে আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া প্রযুক্তি ও জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কাঁঠালের রসে তৈরি করছেন বিস্কুট, যা ফলের পুষ্টি ও স্বাদ দুটোই ধরে রাখছে। কৃত্রিম ফ্লেভার ছাড়াই তৈরি এই কাঁঠালের বিস্কুট বাজারে আসতেই অনলাইনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক চাহিদা। নতুন এই বিস্কুট নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে দারুণ কৌতূহল।

যেভাবে তৈরি হয়

কারখানায় কাঁঠাল বিস্কুট উৎপাদনে নিয়োজিত প্রধান কারিগর মানিক মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পাকা কাঁঠাল থেকে কোষ বের করে ব্লেন্ড করা হয়। পরে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে কোনো প্রকার কেমিক্যাল ছাড়াই মিক্সার মেশিনে দেওয়া কাঁঠালের রসের সঙ্গে ঘি, বাটার, দুধ, ময়দা ও অন্যান্য উপকরণ। সব একসঙ্গে মিক্স করা হয়। এসব উপকরণ মিক্স হয়ে মণ্ড তৈরি হয়ে গেলে টেবিলে উঠিয়ে ডাইস দিয়ে কেটে বিস্কুট তৈরি করে ট্রেতে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। একটি ট্রেতে ৩৬ পিস বিস্কুট দেওয়া যায়। এরকমভাবে একটি ট্রলিতে ৩৬টি ট্রে একসঙ্গে রেখে তারপর ওভেনে ঢোকানো হয়। পরে ২৫ মিনিট পর বিস্কুট ওভেন থেকে বের করা হয়। গরম কমে গেলে বা ঠান্ডা হলে বক্স করা শেষে বাজারজাত করা হয়। একটি বক্সে ৮৫০ গ্রাম বিস্কুট দেওয়া থাকে।

আসছে অনলাইনে

স্ট্যাড ফাস্ট কুরিয়ারের কর্মী রাকিব বলেন, গত দুই মাস ধরে কাঁঠালের বিস্কুটের অর্ডার আসছে অনলাইনে। অর্ডারগুলো মোমতাহিনা ফুড অ্যান্ড অয়েল মিলসের ‘মেহমান ফুড’ থেকে নিয়ে যাচ্ছি। দিনে দিনে অর্ডার বাড়ছে। একবার যিনি অর্ডার দিচ্ছেন, নতুন ভোক্তার পাশাপাশি পুরোনো ভোক্তাও আবার অর্ডার করছেন। কখনো কখনো দিনে একাধিকবার অর্ডার নিয়ে যেতে হচ্ছে। বেশ সাড়া ফেলেছে কাঁঠালের বিস্কুট।

আসছে কাঁঠালের চিপস

উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া খোলা কাগজকে বলেন, “আমি দেশের বাইরে, বিশেষ করে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান ভ্রমণ করেছি। সেসব দেশে দেখতে পেয়েছি কাঁঠাল দিয়ে কীভাবে খাদ্য উৎপাদন করে তারা বাজারজাত করছে। তা থেকেই মূলত আমি কাঁঠালের বিস্কুট তৈরির সিদ্ধান্ত নিই। ভবিষ্যতে কাঁঠালের চিপসসহ আরও খাদ্যপণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার যদি নতুন এসব খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণে ভ্যাট মওকুফ করে, তাহলে ভোক্তার দোরগোড়ায় সুলভ মূল্যে তা পৌঁছানো সম্ভব।”

যা বলছেন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুরের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী খোলা কাগজকে বলেন, “কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হয় এবং প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে অপচয় হয়ে থাকে। অপচয় রোধে কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য তৈরির কোনো বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ ইতিমধ্যেই প্রায় ২০টিরও অধিক প্রযুক্তি এবং উপকরণ উদ্ভাবন করেছে। এগুলো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশব্যাপী বিভিন্ন উদ্যোক্তার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু কিছু উদ্যোক্তা কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য তৈরি করে এগুলো বিক্রিও করছেন।”

তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি শ্রীপুরের উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভুঁইয়া কাঁঠাল থেকে বিস্কুট তৈরি করেছেন, যা খুবই আশাব্যঞ্জক। এ ধরনের প্রযুক্তি বিশেষ করে কাঁঠালের বীজ, কাঁচা কাঁঠাল এবং পাকা কাঁঠাল শুকিয়ে যে পাউডার তৈরি করা হয়, এতে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিগুণ রয়েছে।’

বিশেষ করে প্রোটিন, মিনারেলস, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার—আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। কাঁঠালের এই পাউডারগুলো যদি আমরা আটা বা ময়দার সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিক্সড করে পাপড়, বিভিন্ন কুকিজ যেমন—বিস্কুট, কেক, ক্যান্ডি, আইসক্রিম এবং পাকা কাঁঠালের পাল্প দিয়েও একইভাবে বিস্কুট ও কেকসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য তৈরি করা যায়। এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিগুণ রয়েছে। এগুলো বিক্রির মাধ্যমে আমাদের কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব। আমাদের যারা উদ্যোক্তা, তারা বিক্রি করে যেমন লাভবান হবেন, তেমনই পারিবারিক আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। কাঁঠালের যে অপচয়, সে অপচয় রোধেও সহায়তা করবে।

আশাবাদী কাঁঠাল চাষিরাও

কাঁঠাল চাষি নজরুল ইসলাম খোলা কাগজকে বলেন, “শ্রীপুর তথা গাজীপুরে প্রতি মৌসুমে হাজার হাজার টাকার কাঁঠাল সঠিক সংরক্ষণের অভাবে পচে নষ্ট হয়। এগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় বাগানের ফল বাগানেই পচে নষ্ট হয়। প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে তা বাজারজাত করলে আমাদের মতো অনেক চাষি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। বিস্কুটের মতো আরও খাদ্যদ্রব্য তৈরি হলে আমরাও কাঁঠালের ন্যায্যমূল্য পাবো।”

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বিস্কুট   কাঁঠাল  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close