বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬,
৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: কলকাতার হোটেলে অগ্নিকাণ্ড, ৬ জনের পরিচয় শনাক্ত      ছয় ব্যাংকে আটকে আছে ডেসকোর ২৫০ কোটি টাকা      পর্যটন খাতে সহযোগিতা বাড়াবে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া      এনবিআরের পাঁচ অঙ্গীকার      কলকাতায় আগুনে ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু      তিন জেলার ডিসি প্রত্যাহার      রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করব: মির্জা ফখরুল      
খোলাকাগজ স্পেশাল
সুদিন ফিরেছে চা-শিল্পে
মো. এহসানুল হক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৩২ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

নানা প্রতিকূলতা ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ কাটিয়ে দেশের চা-শিল্পে ফিরেছে সুদিন। অনুকূল আবহাওয়া, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং নিলামে ভালো দাম পাওয়ায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদিত হয়েছে। গত তিন বছরের প্রথমার্ধের তুলনা করলে এটি সর্বোচ্চ উৎপাদন। চলতি বছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে— ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি। এ মৌসুমের জুন পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি মৌসুমে চা খাতের উৎপাদন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ১৭২টি বাগান ও ক্ষুদ্রায়তন চা বাগান মিলে উৎপাদন করেছিল ২ কোটি ২৪ লাখ ১৯ হাজার কেজি এবং ২০২৪ সালে হয়েছিল ২ কোটি ৪৩ লাখ ৫ হাজার কেজি। সে হিসাবে চলতি বছরের প্রথমার্ধে ২০২৪ সালের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে ৬৩ লাখ ২৬ হাজার কেজি বা ২৬ শতাংশের বেশি। বিশেষ করে মার্চ মাস থেকে উৎপাদনে বড় ধরনের গতি আসে। বছরের প্রথম চার মাসেই উৎপাদন ৯০ লাখ ৭৩ হাজার কেজিতে পৌঁছায়, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩০ শতাংশ বেশি ছিল। অনুকূল আবহাওয়া, নিলামে চায়ের ভালো দাম এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার কারণে এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন চা সংশ্লিষ্টরা। 

বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর ইসলাম জানান, চায়ের নিলামে ভালো দাম পেলে বাগানগুলোও বিনিয়োগ বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়াতে কাজ করবে। দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রির দাম অনেক কম ছিল। সরকার মূল্যস্তর নির্ধারণ করায় দাম কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, উৎপাদন ইতোমধ্যে গত বছরের চেয়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ২০৩০ সালের ১১৫ মিলিয়ন কেজির লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। ভবিষ্যৎ রফতানি বাড়াতে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি চায়ের বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করছি।

এদিকে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ২০২৬ সালে চা উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৭৩ হাজার কেজি। এ সময়ে ২০২৫ সালে উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৯ হাজার এবং ২০২৪ সালে ১ লাখ ৭৫ হাজার কেজি। ফেব্রুয়ারিতে চলতি বছর উৎপাদন কিছুটা কমে ২৪ হাজার কেজিতে নেমে আসে। এ মাসে ২০২৫ ও ২০২৪ সালে উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ৩০ হাজার ও ৪২ হাজার কেজি। এরপর মার্চ থেকে উৎপাদনে বড় ধরনের গতি আসে। চলতি বছরের মার্চে চা উৎপাদন হয় ২৫ লাখ ৫৮ হাজার কেজি, যেখানে ২০২৫ সালে ১৩ লাখ ৩৫ হাজার ও ২০২৪ সালে ১৫ লাখ ৯৩ হাজার কেজি উৎপাদন হয়েছিল। এপ্রিলেও প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে। 

চলতি বছরের এপ্রিলে ৫৯ লাখ ১৮ হাজার কেজি উৎপাদনের বিপরীতে ২০২৫ সালে ২২ লাখ ৭২ হাজার এবং ২০২৪ সালে ৪৮ লাখ ৮২ হাজার কেজি উৎপাদন হয়েছিল। চলতি বছরের মে মাসে উৎপাদন হয়েছে ৯১ লাখ ৫৩ হাজার কেজি। ২০২৫ সালের মে মাসে উৎপাদন ছিল ৮৬ লাখ ৪৮ হাজার ও ২০২৪ সালে ৪৭ লাখ ৭৫ হাজার কেজি। জুনে ১ কোটি ২৪ লাখ ৫ হাজার কেজি চা উৎপাদনের বিপরীতে ২০২৪ সালের জুনে উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ২৮ লাখ ৩৭ হাজার কেজি ও ২০২৫ সালে একই সময়ে উৎপাদন হয়েছিল ৯৮ লাখ ২৫ হাজার কেজি চা।

বাংলাদেশ চা বোর্ড জানিয়েছে, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও খরাসহনশীল জাতের চা গাছের ব্যাপক রোপণ এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে ১১৫ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। দেশের ১৭২টি চা বাগানের মোট ২ লাখ ৯৪ হাজার ১৪২ একর জমির মধ্যে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৪১ একরে চা চাষ হচ্ছে। অবশিষ্ট প্রায় ১৬ হাজার একর জমিও ভবিষ্যতে চা চাষের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। 

বর্তমানে উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাটেও চা চাষ দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশ্বে চা রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন অষ্টম। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং ভ্যালু অ্যাডেড চায়ের উৎপাদন কম থাকায় বড় উৎপাদনেও রপ্তানি বাড়ানো যাচ্ছিল না। এ পরিস্থিতি বদলাতে সাধারণ চায়ের পাশাপাশি গ্রিন টি, উলং টি, হোয়ইট টি এবং অন্যান্য ভ্যালু অ্যাডেড চা উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

একইসঙ্গে ব্র্যান্ডিং, আধুনিক প্যাকেজিং ও আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণে নতুন বাজার অনুসন্ধানের পাশাপাশি চা রপ্তানিতে বিভিন্ন প্রণোদনা এবং প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশের তিনটি চা নিলাম বাজারেই প্রতি কেজি চা বিগত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে লেনদেন হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি নিলামেই ৯০-৯৫ শতাংশ চা কিনে নিচ্ছেন ক্রেতারা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম চা নিলাম বাজারে শতভাগের কাছাকাছি চা বিক্রি হচ্ছে। 

সর্বশেষ ১০ আগস্ট ১৫তম নিলামে ২২ লাখ ৯৬ হাজার ১৪০ কেজি চা বিক্রি হয়েছে। কেজিপ্রতি গড় মূল্য ৩০০ টাকা ছাড়িয়ে ২৯৯.৬৩ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। শ্রীমঙ্গল চা নিলাম বাজারে ১২ আগস্ট ১৫তম নিলামে ৫৯ হাজার ৭২৭ কেজি চা বিক্রি হয়েছে। কেজিপ্রতি গড় মূল্য ছিল ২৭৭.৯১ টাকা এবং  পঞ্চগড় চা নিলাম বাজারে ১১ আগস্ট ৯ নম্বর নিলামে ৬ হাজার ৭৫২ কেজি চা বিক্রি হয়েছে। একসময়ে এ অঞ্চলের বটলীফ চা মৌসুমে মাত্র ১২০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হতো। অতীতের তুলনায় অনেক বেড়ে কেজিপ্রতি গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ২৬৬.৩২ টাকা।

চা-সংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি মৌসুমের পর্যাপ্ত ও পরিমিত বৃষ্টিপাত চায়ের উৎপাদনে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে নিলামে চাহিদা ও মূল্য— দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
 
অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় প্রতি কেজি চায়ের ন্যূনতম নিলাম মূল্য (ফ্লোর প্রাইজ) সিলেটে ২৪৫ টাকা এবং উত্তরাঞ্চলের জন্য ১৭০ টাকা নির্ধারণ করায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। 

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে সাধারণ চায়ের পাশাপাশি গ্রিন টি, উলং টি, হোয়াইট টি ও অন্যান্য ভ্যালু অ্যাডেড (মূল্য সংযোজিত) চা উৎপাদনে এখন বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। উৎপাদন ও গুণগত মান উন্নয়নে গবেষণা কার্যক্রমের পাশাপাশি বাগানের ব্যবস্থাপক ও ক্ষুদ্র চাষিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সার ও পরিবেশবান্ধব বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি চা শ্রমিকদের মজুরি, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা সুবিধা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। 

চা বাগানের উন্নয়নে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে পাঁচ বছর মেয়াদি কৃষিঋণ এবং ভর্তুকি মূল্যে সার সরবরাহ করা হচ্ছে। ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়া চা বাগানে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়। 

কেকে/এআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  চা   শিল্প  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close