বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। মোট ৩৪৩টি বৈধ ভোটের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে মির্জা ফখরুল নির্বাচিত হন। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ভোটের মাধ্যমে একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন।
রাষ্ট্রপতি পদটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় অনেকাংশে আনুষ্ঠানিক। নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা। কিন্তু রাষ্ট্রের সব পদকে কেবল সাংবিধানিক ক্ষমতার পরিমাপে বিচার করা যায় না। ইতিহাসের কিছু সন্ধিক্ষণে কোনো কোনো পদ তার আনুষ্ঠানিক সীমা অতিক্রম করে রাষ্ট্রের নৈতিক অভিমুখ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও জাতীয় বিবেকের প্রতীকে পরিণত হয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার তাৎপর্য এখানেই।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, প্রবীণতা, ব্যক্তিগত সংযম এবং তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে মির্জা ফখরুলকে অনেকে প্রচলিত রাজনীতির ভেতরেও একটি ভিন্ন রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে দেখেন। ফলে প্রশ্নটি এখন কেবল তিনি রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব কতটা দক্ষতার সঙ্গে পালন করবেন, তা নয়; বরং এই বিভক্ত, ক্লান্ত ও অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সময়ে তিনি রাষ্ট্রের নৈতিক পরিসরে কোনো আলাদা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবেন কি না।
এই প্রশ্নের সূত্র ধরে মনে পড়ে লেখক, গবেষক ও কলামিস্ট আমিন আল রশীদের ‘পরিচ্ছন্ন রাজনীতির খোঁজে’ নিবন্ধটির কথা। সেখানে মির্জা ফখরুলকে একজন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিক হিসেবে মূল্যায়নের পাশাপাশি ৮ মে নওগাঁয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে তার একটি আক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়েছিল। মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও প্রাণের বিনিময়েও দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন পুরোপুরি আসেনি।
আক্ষেপটি নিছক একটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয়; এর ভেতরে বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ সংকটের প্রতিচ্ছবি আছে। কারণ পরিচ্ছন্ন রাজনীতি কেবল ব্যক্তিগত সততা বা দুর্নীতিমুক্ত থাকার নাম নয়। এটি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি—যেখানে ভিন্নমতকে শত্রু ভাবা হয় না, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার আকাঙ্ক্ষা রাজনীতির ভাষা হয়ে ওঠে না, ক্ষমতা ব্যক্তিগত বা দলীয় আধিপত্যের হাতিয়ারে পরিণত হয় না এবং রাষ্ট্র কোনো দল, পরিবার বা ব্যক্তির সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয় না।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্যও এখানেই। ক্ষমতায় থাকা যেমন বৈধ, ক্ষমতার বাইরে থাকাও তেমনি বৈধ। আজ যে দল ক্ষমতায়, আগামীকাল তাকে বিরোধী দলে যেতে হতে পারে; আজ যে মত সংখ্যাগরিষ্ঠ, কাল সেটি সংখ্যালঘু হতে পারে। তাই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্যে যতটা, তার চেয়ে বেশি নিহিত রয়েছে সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের অধিকার রক্ষার সক্ষমতায়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে এই সহজ সত্য থেকে দূরে সরে গেছে। একসময় রাজনীতি ছিল আদর্শ, ত্যাগ, জনসম্পৃক্ততা ও সামাজিক পরিবর্তনের চর্চা। সময়ের সঙ্গে তার জায়গায় ক্রমশ প্রাধান্য পেয়েছে ব্যক্তি, পরিবার, আনুগত্য, অর্থ ও ক্ষমতার হিসাব। রাজনৈতিক দর্শনের জায়গায় এসেছে নির্বাচনী অঙ্ক; সাংগঠনিক চেতনার জায়গা করে নিয়েছে ব্যক্তিনির্ভর আনুগত্য। এর ফলে শুধু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়, রাজনীতির নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়েছে।
২০১৩ সালে একবার মির্জা ফখরুলের বাসায় তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়েছিল। আলাপের একপর্যায়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘রাজনীতিটা এখন আর ভালো মানুষের জন্য নাই।’ তখন কথাটি হয়তো ব্যক্তিগত হতাশা হিসেবেই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, কথাটির মধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত ছিল।
একজন রাজনীতিক যখন বলেন, রাজনীতি ভালো মানুষের জন্য নেই, তখন প্রশ্নটি আর ব্যক্তির থাকে না; প্রশ্নটি চলে যায় পুরো ব্যবস্থার কাছে। কেন সততা রাজনৈতিক যোগ্যতার বদলে দুর্বলতা হয়ে উঠবে? কেন নীতি ও আদর্শের চেয়ে আনুগত্য বেশি পুরস্কৃত হবে? কেন একজন ভালো মানুষকে রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য নিজের বিবেকের সঙ্গে বারবার সমঝোতা করতে হবে?
আজ সেই প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন এক বাস্তবতা। ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর তরুণদের একটি অংশ রাজনীতিতে নতুন দৃশ্যমানতা পেয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। একটি সমাজে নতুন প্রজন্ম রাজনীতিতে অংশ নিতে চাইলে সেটিকে গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক শক্তি হিসেবেই দেখা উচিত। কিন্তু সেই সম্ভাবনার সঙ্গে যদি অসহিষ্ণুতা, ঔদ্ধত্য, প্রতিপক্ষকে অপমান, রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অবক্ষয় এবং কুরুচিপূর্ণ ভাষা যুক্ত হয়, তবে সেটি রাজনৈতিক নবজাগরণ না হয়ে পুরোনো অবক্ষয়েরই নতুন সংস্করণে পরিণত হতে পারে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, তীব্র বিতর্কও থাকবে। কিন্তু প্রতিপক্ষকে গালি দিয়ে, অপমান করে কিংবা তার মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে কোনো গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। রাজনীতি যখন যুক্তির ভাষা হারায়, তখন সমাজও ধীরে ধীরে সহনশীলতা হারাতে থাকে। তাই নতুন প্রজন্মকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং তাদের ইতিহাসবোধ, গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণের চর্চায় অভ্যস্ত করাই এখন জরুরি।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের কাছে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা থাকতে পারে। তার সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও তার নৈতিক অবস্থান, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং জনসমক্ষে উচ্চারিত বক্তব্যের প্রভাব সীমিত নয়। তিনি যদি রাজনৈতিক ভাষায় সংযম, ভিন্নমতের প্রতি সম্মান এবং প্রতিপক্ষের মানবিক মর্যাদার পক্ষে ধারাবাহিক অবস্থান নেন, তবে সেটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
একইভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাসের প্রশ্নেও রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে দৃঢ় ও ন্যায়নিষ্ঠ হতে হবে। ১৯৭১-এর ইতিহাসকে বিকৃত, অস্বীকার বা মুছে ফেলার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। জামায়াত-শিবিরসহ যে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনের কেউ যদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অস্বীকার বা বিকৃত করার চেষ্টা করে, তার মোকাবিলা হতে হবে সংবিধান, আইন ও ঐতিহাসিক সত্যের ভিত্তিতে। প্রতিরোধের ভাষা যেন প্রতিহিংসা বা নির্বিচার দমনের ভাষা না হয়ে ওঠে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতির কাছে দলমত নির্বিশেষে দেশপ্রেমিক নাগরিকদের প্রত্যাশা থাকবে, তিনি মুক্তিযুদ্ধকে কোনো দলের একক সম্পত্তি হিসেবে নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ও জাতীয় আত্মপরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। ইতিহাস কোনো দলের সম্পত্তি নয়। ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা মানে অতীতকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো নয়; বরং সত্যকে স্বীকার করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তার কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
রাষ্ট্রপতির ভূমিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা পুনর্গঠনে নৈতিক ভূমিকা রাখা। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে টিকে থাকে না; টিকে থাকে প্রতিষ্ঠান, আইন, জবাবদিহি ও নাগরিক আস্থার ওপর। মানুষ যখন মনে করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কোনো দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ক্ষয়ে যায়। সেই আস্থা পুনর্গঠনে রাষ্ট্রপতির সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা না থাকলেও তাঁর অবস্থান থেকে একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক বার্তা দেওয়া সম্ভব।
আমি নিজে প্রান্তিক পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে এবং জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে দুই দফা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাজনীতিকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। অভিজ্ঞতা অনেক সময় হতাশ করেছে, কিন্তু রাজনীতি সম্পর্কে আমার মৌলিক বিশ্বাস বদলায়নি।
আমার কাছে রাজনীতি কখনোই শুধু ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়; এটি জ্ঞানচর্চা, জনসেবা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক কঠিন ব্রত। একজন রাজনীতিকের প্রকৃত পরিচয় জনগণের কাছে তার দায়বদ্ধতায়। সেই বিশ্বাস থেকেই মনে হয়, বাংলাদেশের সামনে এখন আরেকটি ক্ষমতার পালাবদলের চেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনর্গঠন।
এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা দরকার, যেখানে সততা দুর্বলতা হবে না, ভিন্নমত অপরাধ হবে না, তরুণেরা রাজনীতিতে আসবে কিন্তু শিষ্টাচার হারাবে না, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রাজনৈতিক সুবিধাবাদের হাতে বন্দী হবে না এবং কোনো রাজনৈতিক দলই রাষ্ট্রের মালিকানা দাবি করতে পারবে না।
রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক সাংবিধানিক পদ শুধু ক্ষমতার প্রশ্ন নয়; কিছু পদ নৈতিক নেতৃত্বেরও সুযোগ তৈরি করে। মির্জা ফখরুলের সামনে সেই সুযোগটি এখন সবচেয়ে বড়।
তার রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তাই হয়তো রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগে নয়, ক্ষমতার সীমারেখা মেনে চলার মধ্যেই। তিনি কি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সব নাগরিকের রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন? রাজনৈতিক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারবেন? প্রতিপক্ষের অধিকার রক্ষার সময়ও কি একই নৈতিক দৃঢ়তা দেখাতে পারবেন? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার পক্ষে কি নৈতিক অবস্থান নিতে পারবেন? এসব প্রশ্নের উত্তরই তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ধারণ করবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই মির্জা ফখরুল পারবেন কি পারবেন না—এত সরল নয়। প্রশ্নটি হলো, তিনি কোন ধরনের রাষ্ট্রপতি হওয়ার চেষ্টা করবেন। ক্ষমতার রাজনীতির আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, নাকি রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের নৈতিক ভারসাম্যের একটি নির্ভরযোগ্য প্রতীক—সময়ই তার উত্তর দেবে।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেই পরিবর্তন একা ঘটাতে পারবেন না। কিন্তু তিনি চাইলে পরিবর্তনের পক্ষে একটি নৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। তাঁর প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি রাজনৈতিক সংকটে তার অবস্থান সেই দৃষ্টান্তের অংশ হয়ে থাকবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশ এখন শুধু একজন নতুন রাষ্ট্রপতি পায়নি; রাষ্ট্রের নৈতিক পরিসরে একজন প্রবীণ রাজনীতিকের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষার দরজাও খুলে দিয়েছে। সেই পরীক্ষায় তার সাফল্য নির্ভর করবে তিনি কতটা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলেন তার ওপর নয়, বরং কতটা ন্যায়, সংবিধান, সহনশীলতা, ইতিহাস ও জনগণের অধিকারের পাশে দাঁড়াতে পারলেন তার ওপর।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধি।
কেকে/এলএ