গাজীপুরের কাপাসিয়ার সিংহশ্রী ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও শিক্ষকদের এক যুগেরও বেশি সময়ের বিরোধে পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্বনামধন্য বিদ্যালয়টির সদ্য প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। বিগত চার মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পরও প্রভাবশালী এক ব্যক্তি আবারও সভাপতি হওয়ার তোরজোড় শুরু করলে এলাকাবাসী, অভিভাবক ও হয়রানির শিকার শিক্ষকগণ তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এবং দুদক কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
উপজেলার সিংহশ্রী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ও সিংহশ্রী বাজারে উত্তর-পূর্বে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ৮০ বছরের পুরানো ইউনিয়নের সেরা এ বিদ্যালয়টিতে বহু বছর ধরে এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র রয়েছে। এক সময় বিদ্যালয়ে ১০০০-১২০০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও বর্তমানে ৩০০-৩৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এক সময় এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেমন ভালো ফলাফল করতে পারছে না। ২০২৬ সালে এ বিদ্যালয় থেকে ৬৯ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মাত্র ২৮ জন শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়েছে এবং ৪১ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়।
গত ১৫ জুন ঢাকা শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান বরাবর ২১ জন ব্যক্তির স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত আবেদন ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ২৪তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাবশালী কর্মকর্তা মো. লোকমান হোসেন দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি তার স্ত্রী লতিফা আক্তার মিলা সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইর যুগ্ম পরিচালকের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকায় এবং স্ত্রীর বড় বোন ওয়াহিদা আক্তার শিলা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও পরবর্তী সময়ে সচিব পদে পদোন্নতি হওয়ায় তাদের সম্মিলিত প্রভাব খাটিয়ে ২০১৩ সাল থেকে ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত চার মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন মো. লোকমান হোসেন।
দীর্ঘ এ সময়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মানের পরিবর্তনের চেয়ে এলাকায় তার প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তারেই বেশি মনোযোগী ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে তার অনুগত লোকজন দিয়ে ম্যানেজিং কমিটি গঠন করে অনুগতহীনদের নানাভাবে হয়রানি করেছেন। তার হয়রানির কারণে সদ্য বিদায়ী প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ ৭ জন শিক্ষককে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, ‘স্থানীয় একটি কুচক্রী মহলকে সঙ্গে নিয়ে বিগত চার মেয়াদে প্রভাবশালী সভাপতি তার অনুগতহীন শিক্ষকদের নামে ভিত্তিহীন মামলা ও অভিযোগ দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করে চলছেন।’
সভাপতির মন যোগিয়ে চলতে না পারার কারণে মো. মহসিন ২০০৪ সালে বিদ্যালয়ে যোগদান করে ২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরে প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অবসরে গেলেও সরকারি বেতন-ভাতা, অবসর ও কল্যাণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম ২০১৩ সালের ২১ মার্চ যোগদান করে দায়িত্ব পালনকালীন বিভিন্ন সময়ে সভাপতি লোকমান হোসেনের মন যোগিয়ে চলতে আপত্তি করায় ২০১৭ সালে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলা দিয়ে তাকে বের করে দেন। মামলায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে তিনি ২০২২ সালে পুনরায় যোগদান করলেও ২০২৩ সালে লোকমান হোসেন সভাপতি হয়ে তার লোকজন দিয়ে জোরপূর্বক তাকে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেন। এখনো তিনি বিদ্যালয়ে যোগদান করতে পারছেন না।
সহকারী শিক্ষক (বাংলা) মো. মফিজুল হক মোড়ল ১৯৯০ সালে বিদ্যালয়ে যোগদান করে দায়িত্ব পালনকালে ২০১৭ সালে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলা দিয়ে তাকে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেন। চার বছর বিনা বেতনে থাকা অবস্থায় নানা রোগে ভোগে ২০২১ সালে তিনি মারা যান।
একইভাবে সহকারী শিক্ষক (হিসাব বিজ্ঞান) আবু বকর সিদ্দিক ও খন্ডকালীন ইংরেজি শিক্ষক এনায়েত কবিরকেও হয়রানি করে ২০১৮ সালে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেন। তাছাড়া সহকারী শিক্ষক (আইসিটি) রহিমা খানম ও সহকারী গ্রন্থাগারিক মমতাজ বেগম লোকমান হোসেনের হয়রানির শিকার হয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করে চলছেন।
লোকমান হোসেন তার স্কুল জীবনের সহপাঠী কুদরত-ই-খোদাকে বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী নিয়োগ দিয়ে নানা ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি করছেন। ২০১৫ সালে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার সময় ম্যানেজিং কমিটিতে তার পক্ষের বিভিন্ন ক্যাটাগরির সদস্য মনোনয়ন ফরম ক্রয়ের সময় জামানত বাবদ ৪৫ হাজার টাকার ভুয়া রশিদ ও এ টাকা ব্যয়ের ভুয়া ভাউচার জমা দিয়ে তা পাশ করিয়েছেন।
তাছাড়া ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর সর্বশেষ তার নিয়মিত কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাব থেকে ১৭ নভেম্বর ও ১৯ নভেম্বর তার ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের যৌথ স্বাক্ষরে যথাক্রমে ৭৮ হাজার ও দেড় লাখ টাকা উঠানোর এবং সেই টাকা খরচের আগের তারিখ যুক্ত ভাউচার দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তার বিভিন্ন মেয়াদে বিদ্যালয়ের কোন অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটি গঠন না করে তার একক ক্ষমতায় আর্থিক আয়-ব্যয় সম্পন্ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সভাপতির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে শিক্ষক, কমিটির সদস্য ও এলাকাবাসী বিভিন্ন সময়ে আবেদন দিলেও লোকমান হোসেন তার ক্ষমতার প্রভাবে সব ধামাচাপা দিয়েছেন বলেও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত মো. লোকমান হোসেনের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাদিকবার কল করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কেকে/এআই