শিল্পে গ্যাস সংকটের প্রভাব এবার সরাসরি পড়ছে ব্যাংক খাতেও। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কোথাও উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকে নেমে এসেছে, আবার কোথাও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রেখে শ্রমিক-কর্মচারীদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। এতে শিল্প উদ্যোক্তাদের আয় ও নগদ প্রবাহ কমে যাওয়ায় ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন করে খেলাপি ঋণ বাড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যাংকার ও খাতসংশ্লিষ্টরা।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে কারখানায় উৎপাদন কমলেও তাদের নির্ধারিত ব্যয় কমছে না। শ্রমিকদের মজুরি, বিদ্যুৎ বিল, সার্ভিস চার্জ, ব্যাংক ঋণের সুদসহ বিভিন্ন পরিচালন ব্যয় নিয়মিতই পরিশোধ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিক্রি ও আয় কমেছে। ফলে ব্যবসার স্বাভাবিক নগদ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় অনেক উদ্যোক্তা চাইলেও ব্যাংক ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে পারছেন না।
শিল্প খাতের এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের বক্তব্যে। তিনি বলেছেন, “আগামী দুই বছর গ্যাস ও বিদ্যুতের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না। এমন পরিস্থিতির আশঙ্কা থেকেই তিনি তার মালিকানাধীন একটি পার্টিকেল বোর্ড মিল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আগে জ্বালানি সংকটের কারণে তার মালিকানাধীন পাঁচটি স্পিনিং মিলও বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় কারখানা উৎপাদন বন্ধ থাকলেও স্থায়ী ব্যয় কমছে না। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন, কারখানার বিভিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন বন্ধ রেখে এসব ব্যয় বহন করা উদ্যোক্তাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।”
শওকত আজিজ রাসেল আরও বলেছেন, “টিকে থাকার জন্য এখন অবশিষ্ট কারখানাগুলো একীভূত করে সীমিত পরিসরে ব্যবসা পরিচালনার কথা ভাবছেন। অর্থাৎ নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বদলে উদ্যোক্তাদের বড় অংশ এখন বিদ্যমান ব্যবসা কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়, সেই হিসাব করছেন।”
শিল্প মালিকরা বলছেন, শিল্প খাতের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ কোনো উদ্যোক্তা যখন উৎপাদন সম্প্রসারণের বদলে কারখানা গুটিয়ে আনা বা একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকে না। কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহন, ব্যাংক, বীমা, শ্রমবাজারসহ পুরো শিল্প সরবরাহ ও অর্থায়ন ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ে।
ব্যাংক খাতে এর প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হতে পারে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের অর্থ দিয়ে কারখানা, যন্ত্রপাতি ও চলতি মূলধন পরিচালনা করে। উৎপাদন বন্ধ বা কমে গেলে সেই বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় আসে না। ফলে চলতি মূলধনের ঘাটতি তৈরি হয় এবং ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে চাপ বাড়ে।
রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক, সিরামিক, ইস্পাতসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলোও সংকটে পড়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকে নেমে এসেছে। কোথাও আবার উৎপাদন বন্ধ রেখে শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার মতো ক্ষতি হচ্ছে। আয় কমে গেলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সময়মতো মজুরি, সার্ভিস চার্জ ও ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমছে এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে।
ব্যাংক খাতে এর প্রভাব আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন ও বিক্রি কমে গেলে প্রথমে নগদ প্রবাহে চাপ তৈরি হয়। এরপর কিস্তি পরিশোধে বিলম্ব হয় এবং পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ঋণ শ্রেণিকরণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছে। মাত্র ১ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট পরিশোধের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্তে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগও রাখা হয়েছে।
তবে শিল্পোদ্যোক্তাদের একটি অংশের জন্য এই সুবিধাও এখন খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না। কারণ ঋণ পুনঃতফসিল করতে ন্যূনতম যে নগদ অর্থ প্রয়োজন, উৎপাদন বন্ধ বা কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের হাতে সেটিও নেই। ফলে কাগজে-কলমে পুনঃতফসিলের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তারা তা গ্রহণ করতে পারছেন না।
উদ্যোক্তারা বলছেন, কারখানা সচল না থাকলে শুধু ঋণ পুনঃতফসিল করে সমস্যার সমাধান হবে না। ঋণের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি করতে হলে আগে উৎপাদন স্বাভাবিক করতে হবে। এজন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি
।
এদিকে কোনো কোনো উদ্যোক্তা যখন একাধিক কারখানা বন্ধ করে অবশিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো একীভূত করার কথা ভাবছেন, তখন শিল্প খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান সক্ষমতা কমিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার প্রবণতা বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের গতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি।
কারখানা বন্ধ হলে শুধু উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক আয় কমে না, ব্যাংকের ঋণও ঝুঁকিতে পড়ে। একইসঙ্গে কাঁচামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পাওনা, পরিবহন খাতের বিল, বিমা প্রিমিয়াম এবং শ্রমিকদের আয়েও প্রভাব পড়ে। ফলে একটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো অর্থনৈতিক চক্রে ছড়িয়ে পড়ে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে যে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে, তার মধ্যে জ্বালানি সংকটের কারণে সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনে ফেরাতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।
একইসঙ্গে প্রকৃত অর্থে অচল প্রতিষ্ঠান এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ সব ধরনের ঋণখেলাপিকে একইভাবে বিবেচনা করলে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, শিল্পের জ্বালানি সংকটকে শুধু উৎপাদন খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতাও সরাসরি জড়িত। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হলে ব্যাংকের ঋণের বিপরীতে আয় সৃষ্টি হবে না। এতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমবে এবং ব্যাংকের সম্পদের মান আরও দুর্বল হওয়ার ঝুঁঁকি তৈরি হবে।
তাই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করাও জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে কারখানাগুলোকে উৎপাদনে ফেরানো না গেলে ক্ষতির পরিধি আরও বাড়বে। তখন সংকট শুধু শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এর বড় ধরনের অভিঘাত পড়তে পারে ব্যাংকিং ব্যবস্থায়ও।
বিপুল খেলাপি ঋণের বোঝা বহন করা ব্যাংক খাতে নতুন করে এ চাপ তৈরি হলে সামগ্রিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।ৎ
কেকে/সাশ