দীর্ঘদিনের বেহাল সড়ক। কোথাও ছোট-বড় অসংখ্য খানাখন্দ, কোথাও আবার সৃষ্টি হয়েছে গভীর গর্ত। বৃষ্টির পানি জমে গর্তগুলো পরিণত হয় ছোট ছোট জলাধারে। প্রতিদিন এসব গর্ত এড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে পথচারী, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনকে। বারবার সংস্কারের দাবি উঠলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ ও দুর্ভোগ যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে স্থানীয়দের।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষায় না থেকে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন কিশোরগঞ্জ জেলা যুব অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হাসান আহমেদ রমজান। শ্রমিক ভাড়া করে দূরে দাঁড়িয়ে কাজ দেখার পরিবর্তে নিজেই হাতে তুলে নিয়েছেন বেলচা। প্রচণ্ড রোদের মধ্যেই মাটি-বালু নিয়ে সড়কের গর্ত ভরাটের কাজে নেমে পড়েছেন তিনি।
গতকাল বুধবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার মঠখোলা এলাকায় কটিয়াদী-টোক-কাপাসিয়া-গাজীপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পল্লী বিকাশ কেন্দ্র সংলগ্ন সানলাইট পিকেডেট স্কুলের সামনে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের অংশে ব্যক্তিগত অর্থায়নে শুরু করেন এই সংস্কারকাজ।
সরেজমিনে দেখা যায়, মাথার ওপর তীব্র রোদ। অথচ সেই রোদ উপেক্ষা করে হাতে বেলচা নিয়ে সড়কের গর্তে মাটি ও বালু ফেলছেন রমজান। কখনো নিজেই গর্ত পরিষ্কার করছেন, আবার কখনো বেলচা দিয়ে মাটি তুলে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে ফেলছেন। তাঁর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখতে আশপাশের মানুষও সেখানে জড়ো হন।
স্থানীয়রা জানান, গুরুত্বপূর্ণ এই আঞ্চলিক মহাসড়কটির বিভিন্ন অংশ দীর্ঘদিন ধরে খানাখন্দে ভরা। বৃষ্টির মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গর্তে পানি জমে যাওয়ায় কোনটি ছোট আর কোনটি বড় গর্ত—তা বোঝার উপায় থাকে না। বিশেষ করে রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কটিয়াদী সফরকে কেন্দ্র করে সড়কের কিছু অংশ তড়িঘড়ি করে সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সংস্কার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এক-দুই দফা বৃষ্টির পরই অনেক জায়গায় মাটি-বালু সরে গিয়ে আগের অবস্থায় ফিরে গেছে সড়ক। ফলে সাময়িক সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা জান্নাতুল কিবরিয়া বলেন, মঠখোলা থেকে কটিয়াদী পর্যন্ত সড়কের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ। কয়েক দফা সংস্কার করা হলেও কিছুদিন পর আবার গর্ত তৈরি হয়। বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের সামনের অংশ রাতে চলাচলের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁদের দাবি, বারবার সাময়িক সংস্কার না করে এবার যেন স্থায়ীভাবে সড়কটি সংস্কার করা হয়।
যাত্রী নজরুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হয়। সড়কের বড় বড় গর্তের কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দিনের বেলায় কোনোভাবে গর্ত এড়িয়ে চলা গেলেও রাতে তা বোঝা যায় না। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।
অটোরিকশাচালক জব্বার বলেন, গর্ত এড়িয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে যেমন গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি যাত্রীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সড়কটি দ্রুত স্থায়ীভাবে সংস্কার করা প্রয়োজন।
স্থানীয় এলাকায় বাসিন্দা আরিফুর ইসলাম সুজন বলেন, মঠখোলা থেকে কটিয়াদী হয়ে টোক, কাপাসিয়া ও গাজীপুরের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এই আঞ্চলিক মহাসড়ক। প্রতিদিন এ পথে বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল আশপাশের বহু এলাকার মানুষ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সড়কের বিভিন্ন অংশের বেহাল দশার কারণে দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে।
স্থানীয়দের দুর্ভোগ দেখে ব্যক্তিগত অর্থায়নে সড়ক সংস্কারে এগিয়ে আসা হাসান আহমেদ রমজান বলেন, “আমি এই এলাকারই একজন নাগরিক। মানুষের দুর্ভোগ নিজের চোখে দেখেছি। প্রতিদিন মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হয়। তাই শুধু অভিযোগ না করে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু করার চেষ্টা করেছি।”
তিনি বলেন, “আমি কোনো শ্রমিক নিয়ে এসে কাজটি করাচ্ছি না। নিজেই বেলচা হাতে নিয়ে যতটুকু সম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করছি। এটি হয়তো বড় কোনো কাজ নয়, কিন্তু মানুষের চলাচলে সামান্য স্বস্তি দিতে পারলেও আমি মনে করব আমার উদ্যোগ সফল হয়েছে।”
রমজান আরও বলেন, বিভিন্ন সময় সড়ক সংস্কার করা হলেও কাজগুলো দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। বিশেষ করে গত ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে যেসব জায়গায় দ্রুত সংস্কার করা হয়েছিল, সেগুলোর কিছু অংশ এক-দুই দফা বৃষ্টির পরই আবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে জনগণের অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না।
সড়ক সংস্কারকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, সড়কের সংস্কারকাজে কী ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে, বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ হয়েছে কি না এবং ওয়ার্ক অর্ডারে যে মান নির্ধারণ করা হয়েছিল, বাস্তবে তা অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা উচিত।
তিনি বলেন, “সড়ক শুধু মাটি-বালু দিয়ে ভরাট করলেই হবে না। কাজটি এমনভাবে করতে হবে, যাতে বৃষ্টি হলে আবার মাটি সরে গিয়ে গর্ত তৈরি না হয়। জনগণের টাকায় যে কাজ হয়, সেই কাজের মান নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।”
কেকে/ এমএস