নীলফামারী সদর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রকৃত শিক্ষার্থীর চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী দেখিয়ে সরকারি বরাদ্দ বাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদ্যালয়ে এমন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আইপিইএমআইএস সফটওয়্যারের তথ্য অনুযায়ী, নীলফামারী সদরের ২০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। তবে কয়েকটি বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় প্রান্তিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও আইপিইএমআইএসের তথ্য পর্যালোচনায় বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো বিদ্যালয়ে বাস্তবে শিক্ষার্থী কম থাকলেও হাজিরা খাতায় ভুয়া নাম যুক্ত করে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীর সংখ্যার ভিত্তিতে দেওয়া স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (স্লিপ) বরাদ্দও বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ ও একাধিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় প্রান্তিক পরীক্ষার খাতা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আইপিইএমআইএসে দেখানো শিক্ষার্থীর তুলনায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কোথাও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কম।
শিক্ষকদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিভিন্ন এলাকায় বেসরকারি বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেন গড়ে ওঠায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে। তাদের দাবি, প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যা দেখালে স্লিপের বরাদ্দ কমে যাবে।
বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় বরাদ্দের অর্থ প্রয়োজন হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি দেখানো হয়। এ বিষয়ে উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিস অবগত বলেও তারা দাবি করেন।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার আটটি ক্লাস্টারের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি দেখিয়ে স্লিপের বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় শিক্ষার্থীপ্রতি ১৫ টাকা এবং দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ছাপানোর জন্য শিক্ষার্থীপ্রতি ১৩ টাকা হারে মোট প্রায় ৬ লাখ ১৬ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
একাধিক স্থানীয় ছাপাখানার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান বাজারদরে প্রশ্নপত্র ছাপাতে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ হওয়ার কথা। ফলে বাকি অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী প্রশ্নপত্র যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা পরিচালনার জন্য উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠনের কথা থাকলেও তা না করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাছিজুল আলম মন্ডল নিজেই প্রশ্নপত্র ছাপানোর ব্যয় পরিচালনা করেছেন।
এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে নিয়মনীতি না মানার অভিযোগও রয়েছে। এর আগে অনিয়মের অভিযোগে তাঁকে লঘুদণ্ড দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিদ্যালয়ভিত্তিক চিত্র
রামগঞ্জ ক্লাস্টারের ৩৪ নম্বর শালমারা গোড়কপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আইপিইএমআইএসে শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ৬১ জন। তবে দ্বিতীয় প্রান্তিক পরীক্ষার উপস্থিতির খাতা পর্যালোচনায় ৪০ জনের কম শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ। অর্থাৎ আইপিইএমআইএসের তথ্যের তুলনায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী প্রায় ৩২ শতাংশ কম।
চওড়া বড়গাছা ক্লাস্টারের কিসামত দলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আইপিইএমআইএসে শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ৯৩ জন। স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়ে প্রকৃত শিক্ষার্থী পাঁচ থেকে সাতজনের বেশি নেই। এমনকি স্থানীয় একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নতুন বাজার ক্লাস্টারের ইটাখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আইপিইএমআইএসে শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ৭৫ জন। তবে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি প্রায় ৫০ শতাংশ কম বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
একই ক্লাস্টারের কালিদাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আইপিইএমআইএসে শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ৬৮ জন। অথচ দ্বিতীয় প্রান্তিক পরীক্ষার খাতা পর্যালোচনায় মাত্র ২০ জন শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকেও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এদিকে নীলফামারী জেলায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের সুপারিশে নতুন করে ৫৮টি কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ে পাঠদানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নীলফামারী সদর উপজেলায় রয়েছে ২১টি। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন নতুন বেসরকারি বিদ্যালয় অনুমোদনের কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী কমার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করেন, বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য পাওয়া স্লিপের টাকা থেকেও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কমিশন দিতে হয়। ফলে বরাদ্দের বাকি টাকা দিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিবাদ করলে প্রশাসনিক হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখানো হয় বলেও অভিযোগ তাঁদের।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাছিজুল আলম মন্ডল বলেন, আইপিইএমআইএসের তথ্যের সঙ্গে বাস্তব শিক্ষার্থীর মিল না থাকলে এর দায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের। পরীক্ষা পরিচালনা কমিটি ও প্রশ্নপত্র ছাপানোর জন্য কোটেশন করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, “প্রশ্নপত্র বা পরীক্ষা পরিচালনার বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এ দায়িত্ব উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার। আইপিইএমআইএসে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি ব্র্যাক স্কুল, কেজি স্কুল ও ইবতেদায়ী মাদ্রাসার তথ্যও থাকে।”
সংশ্লিষ্টরা প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যা, আইপিইএমআইএসে দেওয়া তথ্য এবং সরকারি বরাদ্দের হিসাব যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের প্রশ্ন, যেসব বিদ্যালয়ে বাস্তবে শিক্ষার্থী কম, সেখানে কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী বাড়িয়ে সরকারি অর্থ বরাদ্দ নেওয়া হচ্ছে কি না এবং হয়ে থাকলে এর সুবিধাভোগী কারা।
অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হলে নীলফামারী সদরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যা এবং সরকারি বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেকে/সাশ