দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক দিকে মোড় নিচ্ছে। গতকাল সর্বোচ্চ প্রায় দুই হাজার সাতশ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, আর তার আগের দিন বাস্তবে লোডশেডিং হয়েছে সাড়ে তিন হাজার ছয়শ মেগাওয়াটেরও বেশি। দেশের ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬২টির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, যার মধ্যে ২০টি একেবারেই বন্ধ ছিল। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা এ সংকট আর কোনো সাময়িক বিপত্তি নয়; এটি এখন কাঠামোগত সংকটের রূপ নিয়েছে, যার আঘাত সরাসরি গিয়ে পড়ছে দেশের অর্থনীতির ওপর। ঘন ঘন ও অনিয়মিত লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশের শিল্প খাত।
বিদ্যুৎ-নির্ভর কলকারখানাগুলোকে হয় বিকল্প জ্বালানিতে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে, নয়তো উৎপাদন সাময়িক বন্ধ রাখতে হচ্ছে। জেনারেটর চালানোর বাড়তি খরচ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে সরবরাহে বিলম্ব এবং ক্রয়াদেশ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি— এই তিন মিলিয়ে রপ্তানিমুখী শিল্প ইতোমধ্যে চাপে পড়েছে। গ্যাসের তীব্র সংকটে যেসব কারখানা প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তাদের অবস্থা আরও নাজুক। শিল্প খাতে সরবরাহ বাড়াতে গিয়ে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস কমাতে হয়েছে, যা প্রমাণ করে সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা কতটা সীমিত পর্যায়ে নেমে এসেছে।
শিল্প খাতের বাইরে সাধারণ মানুষ ও ছোট ব্যবসায়ীদের ওপরও চাপ বাড়ছে। গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবারকে বাড়তি খরচ করে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে বা বিদ্যুৎ-চালিত চুলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, আবার সেই বিদ্যুৎও থাকছে না নির্দিষ্ট সময়ে। ছোট দোকান, কর্মশালা ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো লোডশেডিংয়ের কারণে দৈনিক আয়ে ক্ষতির শিকার হচ্ছে, যার সামষ্টিক প্রভাব সহজে চোখে না পড়লেও তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাকে ক্ষয় করছে।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ও তার অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে— জ্বালানি না থাকার কারণে। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি, আমদানি করা কয়লা ও এলএনজি সরবরাহে বিলম্ব এবং টার্মিনালে দুর্ঘটনাজনিত বিভ্রাট— এসবই দেখিয়ে দেয় যে জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে বারবার সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তা আমলে না নিলে সংকট বারবার ফিরে আসবে। জ্বালানি আমদানিতে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সরাসরি ক্রয়ের নামে বাড়তি ব্যয় ও ঝুঁকি এড়ানো যায়। এলএনজি টার্মিনাল ও অবকাঠামো নির্মাণে অভিজ্ঞ ও প্রমাণিত সক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনাজনিত সরবরাহ বিভ্রাট এড়ানো যায়।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে পাওনা-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করে তেলচালিত কেন্দ্রগুলোর প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা কাজে লাগাতে হবে। শিল্প ও রপ্তানিমুখী কারখানার জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক ও পূর্বাভাসযোগ্য বিদ্যুৎ-সূচি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উৎপাদন পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা কমে। স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জোরদার করতে হবে, যাতে আমদানিনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমে। জ্বালানি খাতে ব্যবস্থাপনাগত জবাবদিহি বাড়াতে স্বাধীন পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে অনিয়ম ও অপচয় চিহ্নিত করতে হবে।
লোডশেডিং এখন আর কেবল জনদুর্ভোগের বিষয় নয়; এটি দেশের প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত হানছে। সাময়িক প্যাচওয়ার্ক সমাধান দিয়ে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই বেহাল পরিস্থিতি থেকে মুক্তি মিলবে না। এই সহজ সত্যটি আমাদের নীতিনির্ধারকরা যত দ্রুত মেনে নিবেন, দেশের অর্থনীতির জন্য ততই মঙ্গল হবে।
কেকে/এআই