শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬,
১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে যোগদানের ইচ্ছা, নজর রাখছে ভারত      বিনা খরচে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিচ্ছে মালয়েশিয়া      পৃথিবীর সব দেশকে সতর্ক করল ইরান      মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের তালিকায় যুক্ত হলো ৩৩৮ বাংলাদেশি এজেন্সি      ডেঙ্গুতে নতুন করে ৩৪২ জন হাসপাতালে      হামের উপসর্গে পাঁচ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১১৭০      মুদি পণ্যের বাজার অস্থিরতা, বাড়ছে তেল-চিনি-ময়দা-ডিমের দাম      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
নেপাল ও তিব্বতের বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশের কী শিক্ষা নেওয়ার আছে
আল শাহারিয়া
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬, ১১:০৮ এএম আপডেট: ২৯.০৮.২০২৬ ১১:২৯ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

নেপাল ও তিব্বতের সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক দুর্যোগ প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। সেখানে হিমবাহ ধসজনিত আকস্মিক ঢল, কাদা ও পাথরের মিশ্রিত তীব্র প্রবাহ নিমেষেই ভাসিয়ে নিয়েছে বহু জনপদ, বসতি, সেতু ও জাতীয় মহাসড়ক। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ ইউএসজিএস নিশ্চিত করেছে, ভূমিকম্প নয়, বর্ষার পানিতে সম্পৃক্ত পলির ওপর একটি হিমবাহখণ্ড ধসে পড়াই এর কারণ। সাধারণ প্লাবনের বাইরে গিয়ে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথরের সেই ধ্বংসাত্মক স্রোত বহু মানুষকে গৃহহীন করেছে এবং যোগাযোগব্যবস্থাকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।

যখন এটি লিখছি, মৃতের সংখ্যা কয়েকশো পার হয়েছে এবং নিখোঁজ সহস্রাধিক, তবে উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় এই সংখ্যা প্রতিদিনই বদলাচ্ছে। হিমালয়ের কোলে ঘটা এই মর্মান্তিক ঘটনা পার্শ্ববর্তী প্রতিটি দেশের জন্যই একটি সতর্কবার্তা। স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে, বাংলাদেশ কি পাহাড়ি এলাকার এমন আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি নিরাপদ?

এই প্রশ্নের উত্তরে কোনো অমূলক আতঙ্ক ছড়ানো যেমন অনুচিত, তেমনই আত্মতুষ্টিতে ভোগারও সুযোগ নেই। ভৌগোলিক গঠনের দিক থেকে বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চল নেপালের সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালার মতো নয়। তাই নেপালের ভূতাত্ত্বিক ঘটনার হুবহু পুনরাবৃত্তি বাংলাদেশের সমতলে ঘটার আশঙ্কা কম। তবে আমাদের পাহাড়ি অঞ্চলে যে তীব্র আকস্মিক ঢল, পাহাড়ধস এবং কাদা মিশ্রিত পানির প্রবাহ তৈরি হতে পারে না, এমন ধারণা একেবারেই ভিত্তিহীন। ভৌগোলিক কাঠামোর ভিন্নতা থাকলেও দুর্যোগ সৃষ্টির প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের জন্যও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং বিপজ্জনক।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ভূখণ্ড এই ঝুঁকির একেবারে সম্মুখভাগে রয়েছে। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের পাহাড়ি জনপদগুলো ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই অঞ্চলের পাহাড়গুলো মূলত নরম বেলেপাথর ও পলিমাটি দিয়ে গঠিত। পাহাড়ি ছড়া, ছোট নদী ও সংকীর্ণ উপত্যকাগুলোর মধ্য দিয়ে যখন দ্রুতগতিতে বৃষ্টির পানি নেমে আসে, তখন তা আশপাশের আলগা মাটি ও গাছপালা ভাসিয়ে নিয়ে আসে। সংকীর্ণ পাহাড়ি পথ দিয়ে সেই কর্দমাক্ত পানির স্রোত যখন তীব্র বেগে নিচের বসতিতে আছড়ে পড়ে, তখন তা বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে।

সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব। উষ্ণ বায়ুমণ্ডল তুলনামূলকভাবে বেশি জলীয়বাষ্প ধরে রাখতে পারে। এর ফলে স্বাভাবিক ধারাবাহিক বৃষ্টির বদলে খুব অল্প সময়ে চরম মাত্রার অতিবৃষ্টি বা ক্লাউডবার্স্ট সদৃশ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। অল্প সময়ে অস্বাভাবিক পরিমাণ বৃষ্টি হলে পাহাড়ের মাটি দ্রুত পানি শোষণ করে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। মাটির ধারণক্ষমতা শেষ হয়ে গেলে তার বাঁধন আলগা হয় এবং ভূমিধস ঘটে। জলবায়ু পরিবর্তন একক কোনো ঘটনার একমাত্র কারণ না হলেও এটি চরম বৃষ্টিপাতের তীব্রতা ও ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে।

প্রকৃতির এই চরম রূপের চেয়েও বড় বিপদ তৈরি করছে মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড। বছরের পর বছর ধরে নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বনাঞ্চল উজাড় করা এবং পাহাড়ের খাঁড়া ঢালে বসতি গড়ে তোলার প্রবণতা ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বিপজ্জনকভাবে ঘরবাড়ি তৈরি করা হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক ছড়া ও নালা দখল করে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে। এছাড়া সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণের সময় পাহাড়ের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করায় বৃষ্টির পানি আটকে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। সেই পানি যখন মাটির চাপ ভেঙে হঠাৎ নেমে আসে, তখন তা নিচে থাকা জনপদকে গুঁড়িয়ে দেয়। প্রকৃতির বিরূপ আচরণের সাথে মানুষের তৈরি দুর্বলতা যুক্ত হয়ে সাধারণ বৃষ্টিকে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপান্তর করছে।

নেপাল ও তিব্বতের সাম্প্রতিক দৃশ্য দেখার আগে বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসও আমাদের বারবার এই সতর্কবার্তা দিয়েছে। ২০০৭ ও ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধসের স্মৃতি আজও অমলিন। প্রতি বর্ষায় পাহাড়ি ঢল ও কাদার স্রোতে প্রাণহানি এবং সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে সম্ভাব্য বিপদের পদধ্বনি আমরা অতীতেও প্রত্যক্ষ করেছি।

আমাদের বর্তমান প্রস্তুতিতেও বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে “ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে” এমন সাধারণ পূর্বাভাস দেওয়া হলেও ঠিক কোন পাহাড়ি ঢালটি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে কিংবা কোন ছড়া দিয়ে আকস্মিক কাদার ঢল নামতে পারে, সেই সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যের ঘাটতি এখনো স্পষ্ট। বৃষ্টিপাতের নির্দিষ্ট পরিমাপ পর্যবেক্ষণ করে স্থানীয় পর্যায়ে ভূমিধসের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ কমিউনিটির কাছে দ্রুত মোবাইল মেসেজ বা সাইরেনের মাধ্যমে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার সমন্বিত ব্যবস্থা থাকা দরকার।

দেশে ভূতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানচিত্র বা হ্যাজার্ড ম্যাপ তৈরি করা হলেও নীতি নির্ধারণ ও মাঠপর্যায়ের নগর পরিকল্পনায় তার প্রয়োগ খুব কম। যেসব এলাকা পাহাড়ধসের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত, সেখানেও অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা নতুন বসতি স্থাপন বন্ধ করা যায়নি। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী প্রান্তিক মানুষদের স্থায়িভাবে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা আজও দৃশ্যমান নয়। গবেষণা ও মানচিত্র যদি নথিপত্রের ভেতরেই আটকে থাকে, তবে তা সাধারণ মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে না।

আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিতেও মৌলিক রূপান্তর প্রয়োজন। দুর্যোগ ঘটার পর উদ্ধার অভিযান চালানো, শুকনো খাবার বিতরণ ও সাময়িক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রচলিত ধারণায় আটকে থাকলে চলবে না। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের দিকে মনোযোগ দিয়ে একটি প্রতিরোধমূলক নীতি গ্রহণ করতে হবে। সঠিক ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত করা, পাহাড় কাটা কঠোর হাতে বন্ধ করা, আধুনিক পূর্বাভাস দেওয়া এবং টেকসই নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে বিপদ আসার আগেই জীবনহানির আশঙ্কা কমিয়ে আনা সম্ভব।

পাহাড় ও পরিবেশ নিয়ে আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। পাহাড়কে কেবল পর্যটন, আবাসন, রিসোর্ট কিংবা বাণিজ্যিক রাস্তা বানানোর খালি জায়গা মনে করার প্রবণতা মারাত্মক আত্মঘাতী। পাহাড়ের নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নষ্ট করে তথাকথিত উন্নয়ন অব্যাহত রাখলে তা দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনবে। উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশগত সুরক্ষার ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে সেই অবকাঠামো নিজেই ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

নেপাল ও তিব্বতের ঘটনা থেকে বাংলাদেশের জন্য প্রধান শিক্ষা হলো, চরম মাত্রার কোনো প্রাকৃতিক আচরণকে অসম্ভব ধরে বসে থাকার সুযোগ নেই। পাহাড়ি অঞ্চলে পানি নিষ্কাশনের সামান্য ব্যর্থতাও যে মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা অনুধাবন করতে হবে। একইসঙ্গে শুধু সাধারণ আবহাওয়া বার্তা নয়, বরং সম্ভাব্য প্রভাবভিত্তিক সতর্কবার্তা চালু করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে মানুষের বসতি নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের দাবি।

নেপাল ও তিব্বতের পাহাড় আমাদের পাহাড় নয়, তাদের নদী আমাদের নদী নয়। কিন্তু দুর্যোগের সংকেত চিনে আগে থেকেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে। নেপাল ও তিব্বতের মাড ফ্লাড এর মতো বিধ্বংসী ঘটনা বাংলাদেশে হবে কি না, সেই তাত্ত্বিক বিতর্কে সময় শেষ। আমাদের উচিত নিজেদের পাহাড়ি জনপদগুলো এমন চরম দুর্যোগ মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্নের বাস্তব সমাধান খোঁজা এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।

লেখক: কলামিস্ট

কেকে/এআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  নেপাল   আকস্মিক   বন্যায়  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close