বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ইরানে ফের যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, পাল্টা জবাব তেহরানের      বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসার স্থগিতাদেশ তুলে নিল যুক্তরাষ্ট্র      তারেক রহমানের সাথে শিগগিরই সাক্ষাতের প্রত্যাশা ট্রাম্পের      ‘বোয়িং আপনাকে হতাশ করবে না’, তারেক রহমানকে ট্রাম্পের চিঠি      বহুদলীয় গণতন্ত্রই নয়, সংসদীয় গণতন্ত্রও বিএনপির হাত ধরে এসেছে : প্রধানমন্ত্রী      হামে শিশুমৃত্যু হাজার ছুঁই ছুঁই      হামের উপসর্গে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১২৩১      
খোলাকাগজ স্পেশাল
গ্যাস-বিদ্যুতে অচলাবস্থা
সমন্বয়ের অভাবে বাড়ছে সংকট
রবিউল ইসলাম
প্রকাশ: বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:১৪ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

সমন্বিত পদক্ষেপের অভাবে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি, সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও জনজীবনে।

বিদ্যুৎ সংকটে সারা দেশের কল-কারখানায় উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কায় রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের দাবিতে বিক্ষোভও হচ্ছে। গরমে দুর্ভোগ বাড়ছে রোগী, শিশু ও বয়স্কদের। রাজধানীর তুলনামূলক নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাওয়া এলাকাগুলোতেও দিনে তিন থেকে চারবার এবং অনেক এলাকায় পাঁচ থেকে ছয়বার পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট মোকাবিলায় দ্রুত স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। নীতি-নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা, পেট্রোবাংলা ও বিপিসির মতো প্রতিষ্ঠানে আমলানির্ভরতা কমিয়ে দক্ষ প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানো জরুরি। একইসঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সোলার প্যানেলের ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং এর ব্যাটারি আমদানি শুল্কমুক্ত করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া ভোলার কূপের গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানো, জ্বালানি আমদানির অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়ের কেন্দ্রগুলোও সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালু রাখতে হবে।

সংকটের প্রকৃত চিত্র প্রকাশের দাবি : বিশেষজ্ঞদের মতে, কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানির অভাবে বন্ধ, কোনটি অর্থসংকটে উৎপাদন কমাচ্ছে, কোথায় গ্যাসের ঘাটতি এবং কোন কেন্দ্র চালাতে কত ব্যয় হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তাদের মতে, বিদ্যুৎ খাতকে শুধু নতুন কেন্দ্র নির্মাণের দৃষ্টিতে দেখলে হবে না। দেশে মোট উৎপাদন সক্ষমতা কত, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রয়োজনের সময়ে কতটা বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যভাবে ও সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করা যাচ্ছে।

জ্বালানি সংকটের মূল কারণ : দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রধান কারণ গ্যাস সরবরাহের স্বল্পতা। তবে এটি হঠাৎ তৈরি হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত আওয়ামী লীগ সরকার নিজস্ব উৎসে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে দেশকে ক্রমেই আমদানিনির্ভর করে তুলেছিল। ২০১১-১২ সাল থেকেই পেট্রোবাংলা গ্যাস আমদানিনির্ভর পরিকল্পনা গ্রহণ করে আসায় নিজস্ব উৎস দুর্বল হয়ে পড়ে।

বর্তমান সরকার গত ছয় মাসে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের সংকটকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে পেয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনা, ইরান যুদ্ধ এবং অতীত সরকারের ভুল নীতিকে সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের অনেকে অতীতের নীতির পাশাপাশি বর্তমান সরকারের ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন।

চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম : স্বাভাবিক সময়ে দেশে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার মেগাওয়াট। তবে চলতি বছরের দাবদাহে তা বেড়ে ১৬ থেকে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াটে উঠেছে। এর বিপরীতে প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি থাকছে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

দেশে আমদানি ও ক্যাপটিভ মিলিয়ে ৩৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে এর পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও উৎপাদন কম : দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৮ হাজার ৪২৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে।

পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বন্ধ থাকায় দুই কেন্দ্র থেকে অন্তত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। মাতারবাড়ীর একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় উৎপাদন ৫৫০ থেকে ৫৮০ মেগাওয়াটের মধ্যে রয়েছে। পায়রাও অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে। রামপাল ও পটুয়াখালীর আরএনপিএল কেন্দ্রে কয়লার মজুত কম থাকায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বড়পুকুরিয়ার একটি ইউনিটও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এসএস পাওয়ার প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করলেও অন্য কেন্দ্রগুলোর ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না। ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র থেকেও পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ আমদানি করা যাচ্ছে না। পিক আওয়ারেও সেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।

শিল্প উৎপাদনে বড় ধাক্কা : গ্যাস সংকটে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক ও ইস্পাত কারখানার উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানায় ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট দিয়েও উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের নিশ্চয়তা না থাকায় নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও কারখানা স্থাপনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান গতকাল বলেছেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে। মফস্বলে চাপ কমাতে ঢাকাতেও লোডশেডিং বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণ, সঞ্চালন ও গ্রিডের সীমাবদ্ধতা এবং দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদার সম্মিলিত প্রভাবেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন : বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, যে সংকট ঘনীভূত হতে যাচ্ছে, তা মোকাবিলায় সরকারের যথেষ্ট হোমওয়ার্ক ছিল না—এটি মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ পুরো জ্বালানি খাতকে বিদেশনির্ভর করে গড়ে তুলেছিল, যা সংকটের বড় কারণ। এর সঙ্গে ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট এবং সাম্প্রতিক এলএনজি টার্মিনালের সমস্যাও যুক্ত হয়েছে। চাহিদার তুলনায় এসব টার্মিনালের সক্ষমতাও কম। এগুলো সংকটের দৃশ্যমান কারণ হলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের প্রাক-প্রস্তুতিতেও ঘাটতি ছিল।

সমন্বিত পদক্ষেপের তাগিদ : সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের দ্রুততম সমাধানের একটি পথ হচ্ছে দেশে থাকা সোলার প্যানেলের ব্যাটারি আমদানি শুল্কমুক্ত করা। এতে তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা সমাধান মিলতে পারে। পাশাপাশি গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, কারণ এটি সবচেয়ে সাশ্রয়ী জ্বালানি। 

তিনি বলেন, সংকট কাটাতে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সক্রিয় করার পাশাপাশি ছোট কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলোও চালু করতে হবে। পুরো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে অতীতেরও একটি দীর্ঘ প্রেক্ষাপট রয়েছে।

শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন আরও বলেন, নীতি-নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পেট্রোবাংলা ও বিপিসির মতো প্রতিষ্ঠানে আমলানির্ভরতা কমিয়ে বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকৌশলীরা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো দেখলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনেক সময় তা বাধাগ্রস্ত হয়। শীর্ষ পদে দায়িত্ব পাওয়া আমলাদের বিষয়টি বুঝতে সময় চলে যায়, আবার বদলি হয়ে যাওয়ায় ধারাবাহিকতাও থাকে না। এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের রাখা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  গ্যাস-বিদ্যুতে অচলাবস্থা   সমন্বয়   সংকট  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close