দায়িত্বগ্রহণের ছয় মাসের মধ্যে বহুমুখী সংকটে পড়েছে বিএনপি সরকার। বিশেষ করে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে গ্যাসসহ জ্বালানি সংকট সরকারের বড় মাথাব্যথা। এ ছাড়া ফ্যাসিস্ট সরকারের রেখে যাওয়া আর্থিক সংকটও মোকাবিলা করতে হচ্ছে এ সরকারকে।
এর পাশাপাশি প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগপন্থি ও বিরোধী শিবিরের কর্মকর্তাদের অপতৎপরতা নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি করছে। অভিযোগ উঠেছে, এ চক্রটি সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম ও নিয়োগে অদৃশ্য বলয় তৈরি করে রেখেছে। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সরকারের নানা উদ্যোগ। অন্যদিকে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এদিকে এসব সুযোগসন্ধানী আমলাদের দাপটে কোণঠাসা যোগ্য ও ত্যাগীরা।
সম্প্রতি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে দীর্ঘ যানজটে রোগী অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যুর রোগী মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসনের কিছু কর্তাব্যক্তির নির্লিপ্ততা সরকারকে নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে। এমন পরিস্থিতি সরকারদলীয় এক সংসদ সদস্য রীতিমতো ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এ অভিযোগ করেছেন যে, প্রশাসনের একটি প্রভাবশালী অংশ এই সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও বলছেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের সময় রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে। প্রশাসনের গভীরেও স্বৈরাচারের দোসররা ঘাপটি মেরে আছে। এ ছাড়া রয়েছে সরকারবিরোধী অংশেরর তৎপরতাও। ফলে সরকার গঠন করে এসব প্রতিকূলতার মধ্যে পড়তে হয়েছে বিএনপিকে। আর সংকট এত গভীরে যে রাতারাতি এর থেকে পরিত্রাণ সম্ভব নয়। সরকারকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তা মোকাবিলা করতে হবে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার সে পথেই চলছে।
এদিকে সরকারের সামনে ঘোর অন্ধকার অপেক্ষা করছে মন্তব্য করেছেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন— ‘প্রশাসনের একটি প্রভাবশালী অংশ এই সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। এখনই যদি এই দায়িত্বজ্ঞানহীন চক্রটিকে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তবে সামনে আমাদের জন্য ঘোর অন্ধকার অপেক্ষা করছে।’
গত রোববার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা লিখেন। শাহাদাত হোসেন সেলিম লেখেন, ‘গত শুক্রবার রাত থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা থেকে নারায়ণগঞ্জের আষাড়িয়ারচর পর্যন্ত টানা ৩২ ঘণ্টার এক তীব্র যানজটে স্থবির হয়ে পড়ে পথঘাট। এতে সাধারণ যাত্রীরা এক অবর্ণনীয় ও সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হন। এই দীর্ঘ যানজটে অ্যাম্বুলেন্সে আটকা পড়ে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, আর সময়মতো পৌঁছাতে না পেরে অনেক প্রবাসী মিস করেন তাদের নির্ধারিত উড়োজাহাজ।’
এই দুর্ভোগের কারণ অনুসন্ধানে জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং হাইওয়ে পুলিশ ও সড়ক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভা করেন বলে জানান শাহাদাত হোসেন সেলিম।
তিনি বলেন, ‘হুইপ মহোদয়ের পাশে বসে পুরো মিটিংটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময় ও চরম হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করলাম— এত বড় একটি ঘটনা ও মানুষের অসীম দুর্ভোগের পরও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা বা দায়বদ্ধতা ছিল না।’
ফেসবুক পোস্টে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহি না থাকা উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন শাহাদত হোসেন সেলিম। তিনি লেখেন, ‘জনদুর্ভোগ সৃষ্টি ও চরম দায়িত্বহীনতার অপরাধে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কালবিলম্ব না করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।’
এর আগে গত আগস্টেও এক ফেসবুক পোস্টে শাহাদাত হোসেন সেলিম লিখেছিলেন, ‘প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনো পতিত স্বৈরাচারের দোসররা ওত পেতে বসে আছে। তারা সরকারের প্রতিটি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করছে। আমাদের সব প্রচেষ্টাকে স্থবির করে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।’
ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা সরকারকে ব্যর্থ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন। সরকারকে সতর্ক করতেই আমি বারবার বিষয়টি প্রকাশ্যে তুলে ধরছি। এখন সরকারের উচিত এসব অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা।’
এদিকে সরকার ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র বলছে, কিছু মন্ত্রীর অতিকথন এবং কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দূরত্ব মন্ত্রণালয়ের কাজে অস্বস্তি তৈরি করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মন্ত্রীকে উপেক্ষা করে প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনা কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েরর কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলেও সূত্র জানায়।
সুযোগ সন্ধানীদের দাপটে কোণঠাসা যোগ্যরা: আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনে বেশকিছু রদবদল হলেও, তাতে পরিস্থিতির পুরোপুরি উন্নতি হয়নি। বরং ফ্যাসিস্টের দোসর ও বিরোধীরা একটি বলয় তৈরি করে রেখেছে। এতে ১৭ বছর ধরে যারা বঞ্চিত ছিলেন, তারা এখনও কোণঠাসা হয়ে রয়েছেন।
এ ছাড়া বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রশাসনে ব্যাপক জামায়াতিকরণ করার অভিযোগ রয়েছে। এতে বর্তমানে প্রশাসনে জটিলতা তৈরি হয়ে। সরকারের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়নে নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারের ভাবমূর্তি। এদিকে প্রশাসনে ত্যাগীরা উপেক্ষিত থাকায় সরকার কাজের সুফল বঞ্চিত হচ্ছেন নাগরিকেরা।
কেকে/ এমএস