আজকের এই লেখায় আমি আগামী পাঁচ বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সরকারের করণীয় সম্পর্কে একটি পর্যায়ভিত্তিক রোডম্যাপ পাঠকের সামনে তুলে ধরছি। ১২ ফেব্রুয়ারী নিবার্চনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে তাঁর প্রথম বিশেষ বক্তৃতায় এআই দক্ষতাকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছিলেন। বিগত ৬ মাসের বেশি সময়ে বিভিন্ন সেক্টরে আইসিটি উন্নয়নে অনেক গ্রহনযোগ্য চলমান বা পরিবর্তনের পরিকল্পনার পাশাপাশি আমি মনে করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারকে কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার সময় এখনই। কিন্তু এখানে একটি বিশেষ কঠিন দিক রয়েছে, যা শুরুতেই বলে নেওয়া দরকার।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে প্রতি দুই থেকে তিন বছরে প্রযুক্তির প্রজন্ম বদলে যায়। সেই সাথে পরিবর্তনে আসে এর ব্যবহারের পরিধি। ফলে যে রোডম্যাপ আজকের প্রযুক্তিকে ধরে রচিত হবে, সেটি তিন বছর পরে অচল হয়ে পড়বে। অতএব আমাদের এমন একটি পরিকল্পনা দরকার যা নির্দিষ্ট কোনো একটি প্রযুক্তির ওপর নয়, বরং সক্ষমতার ও আমাদের ভবিষ্যতের চাহিদার ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে। এই কথাটি বোঝার জন্য প্রথমে আমাদের সংক্ষেপে দেখে নিতে হবে এআইয়ের প্রজন্মগুলো কীভাবে বদলেছে।
প্রথম প্রজন্মকে আমরা বলতে পারি ‘প্রেডিক্টিভ এআই’ বা পূর্বানুমানভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। যার কাজ হলো অতীতের তথ্য থেকে শিখে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নির্ণয় করা। উদাহরণস্বরূপ, বিগত বছরগুলোর বৃষ্টিপাত ও ফলনের তথ্য বিশ্লেষণ করে আগামী মৌসুমের ফলনের পূর্বাভাস দেওয়া, কিংবা এক্স-রে চিত্রে সন্দেহজনক অংশ চিহ্নিত করে চিকিৎসককে সতর্ক করা। দ্বিতীয় প্রজন্ম হলো ‘জেনারেটিভ এআই’, যার ভিত্তি হলো ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ (Large Language Models, সংক্ষেপে LLM) বা বৃহৎ ভাষা মডেল। যা বিপুল পরিমাণ লেখা থেকে ভাষার ধরনটি শিখে নিয়ে নতুন লেখা, ছবি বা কোড নির্মাণ করতে পারে।
এই প্রজন্মের একটি সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সরকারের নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই জানা দরকার। কারণ এআইয়ের জেনারেটিভ মডেল কখনো কখনো সম্পূর্ণ ভুল তথ্যকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে সত্যের মতো উপস্থাপন করে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘হ্যালুসিনেশন’ (Hallucination) বা মতিভ্রম। এবং এর কারণ হলো এই মডেলগুলো সত্যকে যাচাই করে না, বরং পরবর্তী শব্দটি কী হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি তা গণনা করে একটা মতামত তৈরি করে। এর বাইরে দ্রুত এগিয়ে আসছে ‘মাল্টিমোডাল এআই’ । যা একই সাথে লেখা, ছবি ও শব্দ বুঝতে পারে, ‘স্মল ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ (Small Language Model)। যা ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই সাধারণ মোবাইল ফোনে চলতে পারে, এবং ‘ফিজিক্যাল এআই’ যা এই বুদ্ধিমত্তাকে যন্ত্র ও রোবটের শরীরে স্থাপন করছে।
তৃতীয় এবং বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুত অগ্রসরমান প্রজন্মটি হলো ‘এজেন্টিক এআই’। আর এখানে ছোট্ট করে এজেন্ট কি বলে রাখা উচিত, কারণ শব্দটি নিয়ে আমাদের দেশে যথেষ্ট বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সাধারণ চ্যাটবট যা আপনার কথা বুঝতে পারে এবং আপনার প্রশ্নের উত্তর দেয়, এখানেই তার কাজ শেষ। একটি এজেন্ট শুধু উত্তর দেয় না, বরং একটি লক্ষ্য গ্রহণ করে, সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর ধাপগুলো নিজে থেকে পরিকল্পনা করে। প্রয়োজনে বাইরের সফটওয়্যার বা তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করে, মাঝপথে ভুল হলে নিজের পরিকল্পনা সংশোধন করে এবং কাজটি সম্পন্ন করে ফলাফল জানায়। অর্থাৎ পার্থক্যটি উত্তর দেওয়া আর কাজ সম্পন্ন করার মধ্যে।
আপনি ধরুন, একজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নির্দেশ দিলেন যে এই মৌসুমে তাঁর এলাকার সম্ভাব্য রোগগুলির একটি পূর্বসতর্কতা প্রতিবেদন দরকার। একটি এজেন্ট আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহ করবে, মাঠপর্যায়ের রিপোর্ট পড়বে, পূর্ববর্তী বছরের সংক্রমণের ধরনের সাথে মিলিয়ে দেখবে এবং একটি খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করে কর্মকর্তার সামনে রাখবে। যাহোক, তো এখানেই ঝুঁকিটিও নিহিত, কারণ যে ব্যবস্থা নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে, তার ভুলের ফলাফলও অনেক বেশি গুরুতর হয়। এই কারণেই প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মানুষের অনুমোদনের ধাপ রাখা, অর্থাৎ ‘হিউম্যান ইন দ্য লুপ’ নীতিটি আজ একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হয়ে উঠেছে।
এই প্রসঙ্গে আমি একটি কারিগরি বিষয় সহজ করে বলতে চাই। যেটি না বুঝলে বাংলা ভাষায় এআইয়ের মূল সমস্যাটি ধরা পড়বে না। যেটি আমাদের রোডম্যাপের একটি বড় অংশকে ব্যাখ্যা করে। বৃহৎ ভাষা মডেল লেখাকে সরাসরি অক্ষর হিসেবে পড়ে না, বরং লেখাকে ছোট ছোট টুকরায় ভাগ করে নেয়, যাকে বলা হয় ‘টোকেন’ (Token)। আর ভাগ করার এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ‘টোকেনাইজেশন’। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রচলিত মডেলগুলো মূলত ইংরেজিসহ কিছু বহুল ব্যবহৃত ভাষার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, ফলে ইংরেজির একটি শব্দ যেখানে হয়তো একটি বা দুটি টোকেনে ধরা পড়ে, বাংলার একটি শব্দ সেখানে অনেক বেশি টোকেনে ভেঙে যায়। এর তিনটি সরাসরি ফল আছে: একই কাজ বাংলায় করতে বেশি খরচ পড়ে, মডেল একবারে কম পরিমাণ বাংলা লেখা বিবেচনায় নিতে পারে। এবং যুক্তাক্ষরসমৃদ্ধ বাংলার ক্ষেত্রে উত্তরের গুণমানও তুলনামূলকভাবে কমে যায়।
যাহোক, তো এই কারণেই আমি বলি যে, বাংলা ভাষার জন্য মানসম্মত ডেটা কর্পাস এবং বাংলার উপযোগী টোকেনাইজার তৈরি করা এই সময়ে কোনো গবেষণার বিলাসিতা নয়, এটি আমাদের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের একটি মৌলিক পূর্বশর্ত, যা আমাদের অতিদ্রুত শুরু করা দরকার।
বহিঃবিশ্বে আমাদের বিভিন্ন এআই গবেষণা ও অন্যদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই দিকে ইঙ্গিত করে। চীন সম্প্রতি তার বিপুল বিনিয়োগ করে এই খাতে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। সিঙ্গাপুর জাতীয় এআই কৌশলের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভাষাগুলোর জন্য নিজস্ব ভাষায় এআইয়ের মডেল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। ভারত তার বহুভাষিক জনগোষ্ঠীর জন্য ভাষাপ্রযুক্তির জাতীয় কর্মসূচি এবং নিজস্ব গণনাশক্তি গড়ে তোলার পথে হাঁটছে। আর অস্ট্রেলিয়ায় আমি দেখছি দায়িত্বশীল এআই ও নিরীক্ষাযোগ্যতার প্রশ্নটিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে নীতিতে রূপ দেওয়া হচ্ছে। এই সবগুলো উদ্যোগের ভিতরে একটি সাধারণ মিলের সুর রয়েছে, আর তা হলো ‘সার্বভৌম এআই’ বা নিজের ভাষা, নিজের তথ্য এবং নিজের প্রয়োজনের ওপর দাঁড়ানো এআই সক্ষমতা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের জন্যও এটিই সঠিক পথ, কারণ আমদানি করা প্রযুক্তি সমাধান আমাদের সমস্যা বোঝে না বা বুঝবেও না কখনো।
এখন আমরা আসি আজকের লেখার মূল প্রসঙ্গে। এই ধরনের পরিকল্পনা তৈরি করতে হয় গভীর কারিগরি জ্ঞানের ভিত্তিতে, অথচ এআইয়ের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রে সর্বশেষ গবেষণালব্ধ জ্ঞান একটি মন্ত্রণালয়ের ভিতরে সব সময় থাকা সম্ভব নয়। পৃথিবীর কোনো দেশেই থাকে না, কিন্তু এই শূন্যস্থান পূরণ করে গবেষক ও পেশাজীবীদের সংগঠন। ঠিক এই প্রয়োজন থেকেই ২০২৬ সালের শুরুতে আমরা দেশে বিদেশে সবাই একসাথে বসে জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম এর যাত্রা শুরু করি। এখানে আইসিটি ব্যাবসায়ী, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তারা একসাথে কাজ করছে। বিএনপির আদর্শে বিশ্বাসী একটি অলাভজনক ও স্বেচ্ছাসেবী জাতীয়তাবাদী পেশাজীবী প্ল্যাটফর্ম এটি। প্রচলিত রাজনৈতিক সংগঠনের গতানুগতিক কাজের সীমা ছাড়িয়ে আমরা চারটি দায়িত্বকে ফোরামের মূল কাজ হিসেবে দেখি। আর তা হলো: জাতীয়তাবাদী সরকারের কাজে তথ্য-ভিত্তিক ইন্টেলিজেন্স সহায়তা ও গবেষণা, নীতি-সংলাপ, পেশাজীবীদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষের কাছে আইসিটি জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া।
আমি মনে করি, এই চারটি কাজের লক্ষ্য একটিই, জাতীয় উন্নয়ন, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও প্রযুক্তির প্রয়োগ এর মাধম্যে জনকল্যাণ। বিদেশে অনেক অ্যাডভান্সড আইসিটি বা এআই ইনোভেশন প্রতিনিয়ত হয়ে চলছে এবং অনেক স্বেচ্ছাসেবী জাতীয়তাবাদী পেশাজীবী এক্সপার্টস বহিঃবিশ্বে বসে আছে, যারা দেশকে সহায়তা করতে প্রস্তুত। আর এক্ষেত্রে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বহিঃবিশ্বের এক্সপার্টদের দেশে নিয়ে উপযুক্ত পদায়ন করার কথা সবার জানা। ২০২৬ সালের বিএনপির সরকারের জন্য এই আইসিটি এক্সপার্টসগুলো কিভাবে দেশের মানুষের জন্য কাজে আসবে তা নিয়ে বর্তমানে জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম কাজ করছে। যাহোক, এই ফোরামের পক্ষ থেকে আমরা আগামী পাঁচ বছরের জন্য যে রোডম্যাপটি প্রস্তাব করছি, তাকে আমি তিনটি পর্যায়ে সাজাতে চাই। এবং প্রতিটি পর্যায়ের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে চাই।
প্রথম পর্যায়, অর্থাৎ প্রথম বছরের কাজ হলো ভিত্তি স্থাপন, এবং এখানে সবচেয়ে জরুরি কাজটি সবচেয়ে কম আকর্ষণীয়: একটি জাতীয় এআই সক্ষমতা নিরীক্ষা। যা হতে হবে বহিঃবিশ্বে প্রচলিত সঠিক স্ট্যান্ডার্ডে। কোন মন্ত্রণালয়ের হাতে কী ধরনের তথ্য আছে, সেই তথ্য কী অবস্থায় সংরক্ষিত আছে, কোন দপ্তরে প্রযুক্তিগত দক্ষতা কতটুকু, এবং কোন সেবায় এআই প্রয়োগের সুযোগ সবচেয়ে বেশি। এসবের একটি সৎ ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই দাঁড়াতে পারে না। এর সাথে এই মাসেই ফোরামের ভিতরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক সেবা নিয়ে পাঁচটি খাতভিত্তিক কর্মপরিষদ গঠন করা হবে।
দেশে ও প্রবাসে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি এআই গবেষক ও পেশাজীবীদের একটি বিশেষজ্ঞ তালিকা তৈরি করা হবে, যাতে প্রয়োজনের সময় সরকার দ্রুত পরামর্শ পেতে পারে, ঝুঁকিভিত্তিক জাতীয় এআই নীতির একটি খসড়া কাঠামো প্রস্তুত করা হবে। এবং বাংলা ডেটা কর্পাস নির্মাণের কাজটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথভাবে শুরু করা হবে। এই ঝুঁকিভিত্তিক কাঠামোর মূল কথাটি সহজ। একটি সরকারি চিঠির খসড়া তৈরিতে এআই ব্যবহারের ঝুঁকি কম, কিন্তু কে ভাতা পাবেন, কোন রোগীর অগ্রাধিকার বেশি, অথবা কার ঋণ আবেদন মঞ্জুর হবে, এসব সিদ্ধান্তে এআইয়ের ভূমিকা অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকির। আর উচ্চ ঝুঁকির প্রতিটি প্রয়োগে মানুষের চূড়ান্ত অনুমোদন, সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করার সক্ষমতা এবং নাগরিকের আপিলের অধিকার বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
দ্বিতীয় পর্যায়, অর্থাৎ দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরের কাজ হলো নির্মাণ। এই সময়ে বাংলার উপযোগী টোকেনাইজার এবং আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে সূক্ষ্মভাবে প্রশিক্ষিত ছোট আকারের ভাষা মডেল তৈরির কাজ এগিয়ে নিতে হবে, যা কম খরচে দেশের ভিতরেই চালানো সম্ভব হবে। আমি এখানে বিশেষভাবে জোর দিতে চাই কণ্ঠস্বর প্রযুক্তির ওপর। কারণ আমাদের বিপুল সংখ্যক মানুষ লিখতে অভ্যস্ত নন, কিন্তু বলতে পারেন। আর একজন কৃষক বা একজন গৃহিণী যখন নিজের আঞ্চলিক ভাষায় প্রশ্ন করে উত্তর পাবেন, তখনই এআই প্রকৃত অর্থে গণমানুষের প্রযুক্তি হয়ে উঠবে।
আর সেজন্য আঞ্চলিক উপভাষার কণ্ঠস্বর সংগ্রহের কাজটিও এই পর্যায়ে করতে হবে। আমি এখানে বিশেষভাবে নারীদের কথা বলতে চাই। কারণ পুরুষের তুলনায় নারীর হাতে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন পৌঁছেছে কম। বিশেষত গ্রামাঞ্চলে; ফলে কণ্ঠস্বরভিত্তিক ও সহজ বাংলার ব্যবস্থাই নারী সমাজের জন্য এই প্রযুক্তির দরজা খুলে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। আর ঘরে বসে আয়ের সুযোগ তৈরি হলে পরিবারে নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও বাড়ে। একই সময়ে গড়ে তুলতে হবে একটি মূল্যায়ন ভাষায় এআই গবেষণাগার, যেখানে কোনো এআই ব্যবস্থাকে সরকারি সেবায় বসানোর আগে বাংলা ভাষায় ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তার নির্ভুলতা পরীক্ষা করে দেখা হবে।
কারণ বিদেশি মানদণ্ডে ভালো ফল করা একটি এআই মডেল আমাদের প্রেক্ষাপটে ভালো কাজ করবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এর পাশাপাশি সরকারি ক্রয়ের কারিগরি মানদণ্ড চূড়ান্ত করা দরকার। যেখানে স্পষ্ট থাকবে যে এআই মডেলটি কোন তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত, এসম্পর্কিত আমাদের নাগরিকের তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে এবং চুক্তি শেষ হলে সেই তথ্যের মালিকানা কার থাকবে।
এই একই পর্যায়ে শুরু করতে হবে খাতভিত্তিক পাইলট প্রকল্পগুলো, এবং এখানে আমি সবচেয়ে বেশি জোর দিতে চাই শিক্ষার উপর। আমি মনে করি, বড় আকারের অবকাঠামোর জন্য অপেক্ষা না করে প্রতিটি নির্বাচিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষেই ‘এআই লার্নিং কর্নার’ গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রয়োজনে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি ব্যাকআপসহ, যেখানে ইন্টারনেট না থাকলেও ছোট আকারের মডেল অফলাইনে কাজ করবে। এখানে আমাদের লক্ষ্য আমাদের তরুণ প্রজন্ম ও শিশুদেরকে কেবল প্রযুক্তি ব্যবহার শেখানো নয়, বরং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তার চিন্তা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান, গবেষণা ও নিজে শেখার সক্ষমতা তৈরি করা, যা হবে তাদের বয়সের উপরে নির্ভর করে।
তবে এখানে সবচেয়ে জরুরি সিদ্ধান্তটি প্রযুক্তির নয়, দর্শনের: এআই যেন শিশুর হয়ে কাজটি করে না দেয়। বরং শিশুকে কাজটি বুঝতে সাহায্য করে; কোনো শিক্ষার্থী অঙ্ক করতে না পারলে এআই সরাসরি উত্তর বলে দেবে না। বরং ধাপে ধাপে সমাধানের পদ্ধতিটি বুঝিয়ে দেবে।
যাহোক, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এআই মানুষের বিকল্প নয়, এটি একটা সহায়ক টুল মাত্র। এবং এই কথাটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যত আগে প্রতিষ্ঠিত হবে ততই মঙ্গল। শিক্ষার্থীদের প্রকল্পের বিষয় হবে তার নিজের গ্রাম, যেমন আমাদের গ্রামের প্রধান ফসল কি, কিংবা পানির ব্যবস্থাপনার প্রধান সমস্যা কি, আর এসবের সমাধানে শুরু হতে পারে শিক্ষক প্রশিক্ষণ দিয়ে। প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে দুই থেকে তিনজন শিক্ষককে ‘এআই ফর টিচার্স’ প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। যেখানে তাঁরা পাঠ পরিকল্পনা, অনুশীলনী ও প্রশ্নপত্র তৈরি এবং শিক্ষার্থীর সক্ষমতা ও বয়স অনুযায়ী আলাদা আলাদা শেখার উপকরণ প্রস্তুত করার পাশাপাশি এআইয়ের দেওয়া ভুল তথ্য শনাক্ত করাও শিখবে। যাহোক, একই কাঠামোয় স্বাস্থ্যে প্রতিরোধমূলক পরামর্শ, কৃষিতে নিজের ভাষায় বাজারদর ও সারের পরামর্শ, এবং দুর্যোগে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতা নিয়ে পাইলট প্রকল্প চালানো সম্ভব।
তৃতীয় পর্যায়, অর্থাৎ চতুর্থ ও পঞ্চম বছরের কাজ হলো বিস্তার ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। এই সময়ে সফল পাইলট প্রকল্পগুলোকে জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। একটি জাতীয় এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সীমিত হলেও নিজস্ব গণনাশক্তি গড়ে তোলার কাজে হাত দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি সেবায় এজেন্টিক ব্যবস্থার প্রয়োগ শুরু করা যেতে পারে, তবে অবশ্যই প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মানুষের অনুমোদনের ধাপ রেখে। এর সাথে অত্যন্ত জরুরী একটি কাজ হলো ডিপফেক ও ভুয়া তথ্য মোকাবিলার জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা।
জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একজন মানুষের চেহারা ও কণ্ঠস্বর নকল করে বিশ্বাসযোগ্য ভিডিও তৈরি করা যায়। যার শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছেন নারী ও কিশোরীরা। আর নির্বাচনের সময় অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশে জিয়া সাইবার ফোর্সের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি যে, ভুয়া তথ্য মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে অথচ সংশোধন পৌঁছায় অনেক ধীরে। এর মোকাবিলায় দরকার তিন স্তরের কাজ, প্রযুক্তিগত স্তরে বিষয়বস্তুর উৎস যাচাইয়ের ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে দ্রুত সত্যতা যাচাইয়ের সক্ষমতা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগত স্তরে নাগরিকের নিজের বিচারবুদ্ধি। সর্বশেষে, পঞ্চম বছর থেকে ফোরাম একটি বার্ষিক জাতীয় এআই পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রকাশ করতে চায়। যেখানে কী অর্জিত হলো এবং কী হলো না তা খোলাখুলি লেখা থাকবে।
এখন আসুন একটি স্বাভাবিক ও ন্যায্য প্রশ্নের মুখোমুখি হই। অনেকেই বলবেন, বাংলাদেশে পরিকল্পনার অভাব কখনো ছিল না, অভাব ছিল বাস্তবায়নের। তাহলে এই রোডম্যাপও কি কাগজেই থেকে যাবে না? আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি পরিকল্পনা কাগজে থেকে যায় তখনই, যখন তার লক্ষ্যগুলো অস্পষ্ট এবং কেউ তার হিসাব চায় না। ঠিক এই কারণেই আমরা প্রতিটি পর্যায়ের জন্য যাচাইযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণের কথা বলছি। প্রতিটি বড় সরকারি এআই প্রকল্পের জন্য অনুমোদনের আগে একটি স্বাধীন কারিগরি পর্যালোচনা প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশের কথা বলছি। এবং ফোরামের বার্ষিক পর্যালোচনায় ব্যর্থতাগুলোও লিপিবদ্ধ করার কথা বলছি। একটি পেশাজীবী ফোরাম এই কাজটি তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষভাবে করতে পারে, কারণ এখানে কোনো ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক স্বার্থ কাজ করে না।
আরেকটি আশঙ্কার কথাও প্রায়ই শোনা যায় যে, এআইয়ের কারণে মানুষের কাজ কমে যাবে এবং শিক্ষক বা চিকিৎসকের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তি সাধারণত কাজ কমায় না, কাজের ধরন বদলে দেয় এবং কাজের মানকে উন্নত করে। এআই একটি শিশুর সাথে বসে তার চোখের ভাষা পড়তে পারে না, একজন রোগীর হাত ধরে তাকে ভরসা দিতে পারে না, এবং একটি সমাজের নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না; এগুলো মানুষেরই কাজ থেকে যাবে। বরং এই রোডম্যাপ বাস্তবায়িত হলে একগুচ্ছ নতুন পেশা তৈরি হবে।
যেমন এআই সলুশন আর্কিটেক্ট, মডেল মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ, এআই নিরীক্ষক, বাংলা ভাষার ডেটা অ্যানোটেটর, এমএলঅপস ইঞ্জিনিয়ার এবং এআই নীতি ও নৈতিকতা বিশ্লেষক। এসব পদের নাম আজ থেকে দশ বছর আগে বাংলাদেশে কেউ উচ্চারণও করত না। বিএনপির ৩১ দফার ৩০তম দফায় তরুণদের প্রযুক্তি দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান নিয়ে যে অঙ্গীকার রয়েছে, আমার বিবেচনায় এই খাতটিই তার সবচেয়ে বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র। পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম এই নতুন পেশাগুলোর জন্য প্রশিক্ষণ কারিকুলাম ও সনদায়নের কাজে ভূমিকা রাখতে এবং সরকারকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা দিতে চায়।
যাহোক, পুরো রোডম্যাপটিকে আমি একটি ছবির মধ্যে দাঁড় করাতে চাই। গাইবান্ধার ফুলছড়ির কোনো এক গ্রামের একজন কৃষকের কথা ভাবুন, যিনি লিখতে বিশেষ অভ্যস্ত নন। কিন্তু নিজের মোবাইলে আঞ্চলিক বাংলায় প্রশ্ন করে জেনে নিচ্ছেন কোন সারটি এই মাটিতে দরকার এবং সপ্তাহখানেক পরে বৃষ্টির সম্ভাবনা কতটুকু। আর সেই একই বাড়ির শিশুটি বিদ্যালয়ের ‘এআই লার্নিং কর্নারে’ বসে সহজ বাংলায় প্রশ্ন করছে, আমাদের গ্রামের পানির প্রধান সমস্যা কী এবং তার সম্ভাব্য সমাধান কী হতে পারে। আর এআই তাকে উত্তরটি বলে দিচ্ছে না। বরং কীভাবে উত্তরটি খুঁজে বের করা যায় তা শিখিয়ে দিচ্ছে। এই দুটি দৃশ্য যখন একসাথে ঘটবে, তখনই বুঝব রোডম্যাপটি কাজ করেছে। কারণ প্রযুক্তির সাফল্য মাপা হয় রাজধানীর সম্মেলনকক্ষে নয়, প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনে।
আর্তনির্ভরশীল জাতি গঠনের স্থপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আশির দশকেই অনুধাবন করেছিলেন যে, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তি নেই। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি পরিকল্পিতভাবে জনশক্তি প্রশিক্ষণ ও রপ্তানির পথ খুলে দিয়েছিলেন। যার ফলে লাখো বাংলাদেশী বিদেশে কাজের সুযোগ পেয়েছিলেন এবং যেজন্য আজও প্রবাসী আয় আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে টিকে আছে।
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে সেই একই দর্শনের নতুন রূপ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জ্ঞান ও দক্ষতা; আর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে যে ধারাবাহিকতা এগিয়ে এসেছে, আজ মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্রত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ এবং গ্লোবাল আউটসোর্সিং এ উদ্যোক্তা হওয়ার উৎসহমূলক কর্মপরিকল্পনায় তা একটি সুসংহত রূপ পেয়েছে।
পরিশেষে বলতে চাই, বিএনপি মানেই বাংলাদেশের মা, মাটি, মানুষের সাথে সম্পর্কিত একটি অত্যাধুনিক রাজনৈতিক সংগঠন। দেশের মানুষ বিশ্বাস করে বিএনপি মানেই বাংলাদেশের আপামর জনগণ। বাংলাদেশের মানবসম্পদ ও সমাজে মানুষের সুরক্ষার জন্য প্রণীত ৩১ দফা কোনো অলীক স্বপ্ন নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ, আর এখানে জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরামের কাজ হলো, সেই রোডম্যাপের আইসিটি প্রযুক্তি অধ্যায়টিকে কারিগরিভাবে নির্ভুল ও বাস্তবায়নযোগ্য করে তোলা।
আমাদের লক্ষ্য একটি প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর, টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে অন্যের তৈরি সমাধানের জন্য অপেক্ষা করবে না, বরং নিজের ভাষায় ও নিজের প্রয়োজনে নিজের সমাধান তৈরি করে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। পরবর্তীতে এই রোডম্যাপের প্রতিটি পর্যায় নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করব বলে আশা রাখছি। ধন্যবাদ সবাইকে।
লেখক: প্রফেসর অফ বিজনেস এনালিটিক্স অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড এআই
নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া
ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহিঃবিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য।
কেকে/ এমএস