ছয় দফা দাবিতে রাজধানী ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম—রাজপথের প্রায় পুরোটা জুড়ে দিনভর দৃশ্যমান ছিল ১১ দলীয় ঐক্যের শক্তি প্রদর্শন। পথে পথে পথসভা, নেতাকর্মীদের মিছিল আর গাড়িবহর পেরিয়ে রাতে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে এসে শেষ হয় লংমার্চ। কিন্তু কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটলেও এর রাজনৈতিক অভিঘাত এখানেই শেষ হচ্ছে না। বরং লালদীঘি থেকে উচ্চারিত হয়েছে আরও কঠোর বার্তা— লংমার্চে বাধা এলে ছয় দফা এক দফায় পরিণত হবে।
সকাল ৭টায় ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্যদিয়ে শুরু হয় লংমার্চ। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা সেখানে বক্তব্য দেওয়ার পর গাড়িবহর নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা হন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড ও চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপাল, মীরসরাই এবং সীতাকুণ্ডসহ বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হয় পথসভা। এরপর রাতে নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন ঘণ্টা পর লংমার্চের মূল বহর চট্টগ্রাম নগরীতে প্রবেশ করে। রাত সোয়া ৮টার দিকে সিটি গেট হয়ে নেতাকর্মীরা নগরীতে ঢোকেন এবং লালদীঘি ময়দানের সমাপনী সমাবেশে যোগ দেন।
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামী দিনে দেশে যে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে, তার সঙ্গে ঈদের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণের যখনই প্রয়োজন হবে, আন্দোলনের ডাক তখনই আসবে। শনিবার রাতে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম।
লালদীঘির সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষের দেওয়া গণরায়কে অস্বীকার করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে এবং সেই গণআকাঙ্ক্ষা ও রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো বিরতি বা থামাথামি ছাড়াই লড়াই চালিয়ে যাওয়া হবে। একইসঙ্গে আন্দোলনের গতিকে রুদ্ধ করতে আসা যে কোনো ধরনের লোভ বা প্রলোভন সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এ সরকার জনগণকে কোনো স্বস্তি দিতে পারেনি। বর্তমানে দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট থাকলেও গ্রাহকদের নিয়মিত ভৌতিক বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। তেল ও জ্বালানির জন্য চতুর্দিকে হাহাকার চলছে। এছাড়া দলীয় আনুকূল্যে সন্ত্রাস ও রাহাজানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জনগণের ৭০ ভাগ জনগণের দেওয়ার রায় বাস্তবায়ন করতে হবে এবং আমরা আদায় করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এর আগে আমরা বিরতি দিব না, আমরা থামব না। এ লড়াই আমাদের চলবে এবং বাংলাদেশও ইনশাআল্লাহ বদলাবে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া সমস্যার সমাধান যদি আপনি করতে না পারেন, তবে সেটি প্রথমে সবার আগে জনগণের কাছে স্বীকার করুন। স্বীকার করুন যে, এ সমস্যার সমাধান আপনার একার পক্ষে সম্ভব নয়। স্বীকার করুন যে, আপনার কাছে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কোনো সঠিক পরিকল্পনা নেই। অবিলম্বে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসুন; বিরোধী দল সমর্থন না দিলে এই দেশ আপনার পক্ষে একা চালানো সম্ভব নয়- এই বাস্তবতা মেনে নিন।
তিনি বলেন, আমরা পতিত স্বৈরাচারকে ফিরে আসার কোনো পথ করে দিচ্ছি না, বরং আপনারাই সেই পথ করে দিচ্ছেন। কারণ জনগণকে আপনারা সমস্যার সমাধান দিতে পারছেন না এবং তাদের হক আপনারা আদায় করতে পারছেন না। এর ফলে জনগণ বিকল্প খুঁজছে এবং সেই বিকল্প শক্তি কারা, তা আজকের এই লংমার্চে বাংলাদেশের জনগণ দেখেছে। আমরা যেমন পতিত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আছি এবং পতিত স্বৈরাচার কোনোভাবেই দেশে ফেরত আসতে পারবে না, একইভাবে নতুন কোনো রাস্তা আমরা এই বাংলাদেশে হতে দেব না।
সভাপতির বক্তব্যে ড. কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, আমরা নিজেদের স্বার্থে নয়, দেশের মানুষের স্বার্থে রাজপথে এসেছি। আমরা একটি সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও সুশাসনের বাংলাদেশ গড়তে চাই, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে ১১ দলীয় জোট ছাড়া অন্য কারও পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। দেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েছে, ব্যাংকে কোনো টাকা নেই এবং প্রতিদিন নতুন নোট ছেপে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বর্তমান প্রশাসনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার আগে উনারা ছয় মাসের মধ্যে এক লাখ মানুষকে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় আসার পর উল্টো এক লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, ক্ষমতার মসনদে বসার পর বিএনপি জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে গাদ্দারি ও বিশ্বাসভঙ্গ করেছে। তারা দেশের সঙ্গে, ইতিহাসের সঙ্গে, দেড় সহস্র শহীদের রক্তের সঙ্গে গাদ্দারি করেছে। এখন মহান সংসদে দাঁড়িয়ে বিএনপির মুখপাত্রের মুখে শুনতে হয় যে তারা গণভোট মন থেকে বা আন্তরিকভাবে সংস্কার করার ঐকমত্য পোষণ করেনি। বরং শুধু নির্বাচন আদায় করাই ছিল বিএনপির আসল উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, চট্টগ্রামের এক নেতা বলেছিলেন নাকি লংমার্চের ব্যাপারে ছাড় দেয়া হবে না। পথে পথে যে জনসমুদ্র দেখেছি তাতে দেখেছি জনগণ আপনাদের ছাড় দেবে না। অবিলম্বে জুলাই সনদ মেনে জনদাবি পূরণ করতে হবে।
১১ দলীয় ঐক্যর দাবিগুলো হলো— গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বগতি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা। এর আগে সকালে ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লং মার্চ শুরু হয়। পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা, সংবর্ধনা ও অভিবাদন কর্মসূচির পর লংমার্চটি চট্টগ্রামের এসে পৌঁছায়।
এই কর্মসূচিতে বেশ কয়েকটি পথসভা হয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের কাচপুর ব্রিজসংলগ্ন ট্রাকস্ট্যান্ড, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল ও মীরসরাইয়ে। সর্বশেষ চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সমাপনী জনসভার মাধ্যমে লংমার্চ কর্মসূচি শেষ হয়।
গত ৬ আগস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে জোটের এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা থেকে চারটি বিভাগীয় শহরে ‘লংমার্চ’ ও মহাসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোটের শীর্ষ নেতা, জামায়াতে ইসলামীর ডা. আমির শফিকুর রহমান। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে (রেলপথে) লং মার্চ শেষে ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার কথা রয়েছে।
চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানের সমাপনী সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মামুনুল হক এবং এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদসহ জোটের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন। তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবি, সরকারের প্রতি সতর্কবার্তা এবং আন্দোলন দমনের চেষ্টা হলে আরও কঠোর কর্মসূচির প্রস্তুতির কথা। এ সময় মঞ্চে ১১ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
কেকে/এআই