মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা নাইক্ষ্যংছড়ি মাদক পাচারের অন্যতম রুট। দুর্গম পাহাড়, ঘন জঙ্গল, ছড়া ও সীমান্তের অপ্রচলিত পথ ব্যবহার করে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে দেদার ঢুকছে ইয়াবা, বিদেশি মদসহ বিভিন্ন চোরাই পণ্য। দিনের আলোয় অনেকটা নীরব থাকলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয় পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেয় বহনকারী, দালাল ও পাহারাদাররা। সুযোগ বুঝে গভীর রাতে মাদকের চালান ঢুকে পড়ে দেশের অভ্যন্তরে। সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী; বিশেষ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অভিযানে একের পর এক ইয়াবার বড় বড় চালান জব্দ করা হয়েছে।
সীমান্তঘেঁষা একাধিক এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম, সোনাইছড়ি, ফুলতলী, জারুলিয়াছড়ি ও আশপাশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মাদক পাচারের একাধিক রুট সক্রিয় রয়েছে। এসব রুটের কয়েকটিতে নিয়মিত ইয়াবা ও বিদেশি মদের চালান আসে। এরপর স্থানীয় পরিবহনব্যবস্থা ও বিভিন্ন গোপন রুট ব্যবহার করে চালান চলে যায় কক্সবাজারসহ দেশের অন্যান্য এলাকায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে গত আগস্ট মাসেই নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ বার্মিজ ইয়াবা জব্দ হয়েছে। বিভিন্ন সময়ের অভিযানে লাখ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু ১০ আগস্ট ঘুমধুম সীমান্তের নয়াপাড়া এলাকায় অভিযানে একটি বিদেশি অস্ত্র, পাঁচ রাউন্ড গুলি ও ২ লাখ ৪৬ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। এর আগে-পরে আরও কয়েকটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
লাখ লাখ ইয়াবা উদ্ধার, আটকও অনেক :
গত ৪ আগস্ট ফুলতলী বিওপির সদস্যরা মাদকবিরোধী অভিযানে এক ব্যক্তিকে আটক করেন। তার কাছ থেকে ৯০ পিস বার্মিজ ইয়াবা, এক লিটার বাংলা মদ ও ইয়াবা সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। ৫ আগস্ট রাতে জারুলিয়াছড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৮৯ হাজার ৯১৬ পিস বার্মিজ ইয়াবা উদ্ধার করে ১১ বিজিবি। এর আনুমানিক মূল্য ২ কোটি ৬৯ লাখ ৭৪ হাজার ৮০০ টাকা। ৬ আগস্ট সীমান্তের বাইশফাঁড়ি বিওপির বিশেষ টহলদল মালিকবিহীন অবস্থায় উদ্ধার করে আরও ৭ হাজার ২৮৬ পিস ইয়াবা। ৯ আগস্ট ফুলতলী সীমান্তের ৪৭ ও ৪৮ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছাকাছি চেলির টাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ও অন্যান্য সামগ্রীসহ দুই চোরাকারবারিকে আটক করা হয়।
১০ আগস্ট ঘুমধুম বিওপির নয়াপাড়া সীমান্ত এলাকায় উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি অস্ত্র, পাঁচ রাউন্ড গুলি ও ২ লাখ ৪৬ হাজার পিস বার্মিজ ইয়াবা। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা যায়নি। ১১ আগস্ট নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়ন সদর থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে আম্মাজান কমিউনিটি সেন্টারসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইজিবাইকসহ ৩০ হাজার ১০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে বিজিবি। এ সময় চালক ও বহনকারীরা পালিয়ে যায়। একই দিন রাতে বাইশারীতে ১০০ পিস ইয়াবাসহ এক যুবককে আটক করে পুলিশ। ওই রাতেই ঘুমধুম সীমান্তের ৩২ নম্বর পিলারের কাছাকাছি অভিযান চালিয়ে ৩৯ হাজার ৯২৪ পিস ইয়াবাসহ দুই রোহিঙ্গা যুবককে আটক করে বিজিবি।
১৫ আগস্ট সীমান্তে বিশেষ অভিযান চালিয়ে মালিকবিহীন অবস্থায় ২ লাখ ১০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ১১ বিজিবি। ১৬ আগস্ট রাতে ঘুমধুম সীমান্তে আরও ২ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ৩৪ বিজিবি। এর আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। ২০ আগস্ট ফুলতলী বিওপির দায়িত্বপূর্ণ শিলেরঝিড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪৯ হাজার ৯৮২ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ১১ বিজিবি। এর পরদিন রাতেও নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়নের বিশেষ টহলদল অভিযান চালিয়ে ১০ হাজার ১৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। ২৪ আগস্ট ঘুমধুম সীমান্তের ৩৯ নম্বর পিলার থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হাঙ্গরঘোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে অভিযান চালিয়ে ২০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ৩৪ বিজিবি।
একই রাতে বাইশারীতে মাদকবিরোধী অভিযানে ২১৫ পিস ইয়াবা, ১০ পুরিয়া গাঁজা ও মাদক বিক্রির ৪ হাজার ৯৫০ টাকাসহ মো. রুহুল আমিন (৩৮) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৮ আগস্ট রাতে ঘুমধুম ইউনিয়নের মন্ডলপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১০ হাজার পিস বার্মিজ ইয়াবাসহ এক এফডিএমএন সদস্যকে আটক করে বিজিবি।
সর্বশেষ একই মাসে জারুলিয়াছড়ি এলাকায় মাটির নিচে বিশেষ কৌশলে রাখা ১ লাখ পিস বার্মিজ ইয়াবা উদ্ধার করে র্যাব-১৫। এ ঘটনায় জাহাঙ্গীর আলম (৪২) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১০ সীমান্ত পয়েন্টে রাতের তৎপরতা :
স্থানীয়দের ভাষ্য, নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তের দুর্গম এলাকাগুলোই পাচারকারীদের বড় ভরসা। সীমান্তের অন্তত ৭-১০টি পয়েন্টকে ব্যবহার করা হচ্ছে মাদক পাচারের রুট হিসেবে। এসব পয়েন্টের কোনোটি পাহাড়ি ছড়া, কোনোটি ঘন জঙ্গল আবার কোনোটি লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন। সীমান্ত সূত্রের দাবি, দিনের বেলায় মিয়ানমারের অভ্যন্তরে মাদকের চালান নিয়ে দর-কষাকষি হয়। পরে রাত গভীর হলে নির্ধারিত পয়েন্ট দিয়ে চালান পার করা হয়। ওপার থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের পর বহনকারীরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছায়। সেখান থেকে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে মাদক চলে যায় বিভিন্ন গন্তব্যে।
দেড় শতাধিক কারবারি, বহনকারী কয়েক হাজার :
সীমান্তবর্তী ঘুমধুম, কচ্ছপিয়া ও গর্জনিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় দেড় শতাধিক সক্রিয় মাদক কারবারি রয়েছে। এসব কারবারির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগী হিসেবে কাজ করছে বিপুলসংখ্যক বহনকারী। স্থানীয়দের ভাষ্য, পাহাড়ি পথ সম্পর্কে ভালো ধারণা রয়েছে—এমন দরিদ্র ও বেকার যুবকদের একটি অংশকে অল্প টাকার বিনিময়ে বহনকারী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কেউ পাহাড়ের ভেতর থেকে চালান নিয়ে আসে, কেউ নির্দিষ্ট স্থানে তা পৌঁছে দেয়, আবার কেউ পরিবহন ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে। ফলে মাদক পাচারের এই চক্র শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা তৈরি করছে না, স্থানীয় তরুণদের একটি অংশকেও ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধচক্রে জড়িয়ে ফেলছে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ :
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় কিছু মাদক কারবারি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা আবারও একই কাজে জড়িয়ে পড়ে।
গডফাদারদের নিয়ন্ত্রণে কারবার :
সোনাইছড়ি সীমান্তের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে মাদক কারবার পরিচালিত হচ্ছে বলে তারা শুনেছেন। বিভিন্ন সময়ে ছোটখাটো কারবারিদের আটক করা হলেও মূল নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না হওয়ায় পাচার বন্ধ হচ্ছে না।
নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়নের (১১ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ফয়জুল কবির বলেন, ‘সীমান্তে মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। মাদক ও চোরাচালান বন্ধে আমরা প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ‘বর্তমান সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী মাদক, চাঁদাবাজি ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে থানা পুলিশ তৎপর।’
কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের (৩৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এসএম খায়রুল আলম বলেন, ‘সীমান্তে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। এ কারণে কোটি কোটি টাকার মাদক জব্দ করা সম্ভব হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সীমান্তে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
কেকে/এমএ