দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার। প্রয়োজনে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ও অন্যান্য নতুন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি করা হবে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক ব্যবহার এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে সূর্যরশ্মি, বাতাসের গতিবেগ, গৃহস্থালির বর্জ্য এবং পশুর মলমূত্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও সরকারের পরিকল্পনার নিয়ে কথা বলেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই ও পরিচ্ছন্ন বিকল্প জ্বালানির দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। জ্বালানি সংকট উত্তরণে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর মতে, ২০২৬ সালে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে সৌর এবং বায়ু বিদ্যুৎ কয়লা ও পারমাণবিক শক্তিকে ছাড়িয়ে অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎসে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে এখন সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ প্রাকৃতিক গ্যাসের তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী। ফলে সরকারকে বিষয়গুলোতে মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি খাতটিতে দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ করতে হবে।
বিকল্প জ্বালানি কী
কয়লা, খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের বাইরে সূর্যের আলো, বাতাসের গতি, পানির প্রবাহ, গৃহস্থালি বর্জ্য, পারমাণবিক শক্তি কিংবা মাটির গভীরে জমে থাকা তাপকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যেসব উৎস থেকে জ্বালানি ব্যবহার করা হয় তাই বিকল্প জ্বালানি। এগুলোর মধ্যে সূর্যরশ্মিকে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তর, উইন্ড মিল বা বায়ুকলের সাহায্যে বাতাসের গতিবেগকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, নদীর পানির স্রোত বা বাঁধের পানি ব্যবহার করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি, গৃহস্থালির বর্জ্য, পশুর মলমূত্র বা গাছের পাতা পচিয়ে তৈরি গ্যাস ও শক্তি এবং মাটির নিচের তাপকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদিত শক্তিকে বলা হয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি। আর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো পরমাণুর ফিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করাকে ধরা হয় অনবায়নযোগ্য কিন্তু পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানি হিসেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসগুলো কখনো শেষ হয়ে যায় না বরং প্রকৃতি থেকে বারবার তৈরি হয়। এসব উৎস ব্যবহার করলে পরিবেশের ক্ষতি কম হয় এবং যা সনাতন জ্বালানির বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। খনিজ জ্বালানি পোড়ালে প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায়, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানি অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের দাম প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে। কিন্তু বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমে ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়। কয়লা বা গ্যাস একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু সূর্য বা বাতাসের মতো প্রাকৃতিক উৎসগুলো চিরকাল থাকবে।
বাস্তবসম্মত বিকল্পগুলোতে জোর দিতে হবে
বাংলাদেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, নিজস্ব গ্যাস ফুরিয়ে আসায় দেশ বড় রকমের আমদানিনির্ভর সংকটে পড়েছে। বর্তমান সংকট কাটাতে অনতিবিলম্বে সৌরশক্তি, বায়োগ্যাস, বায়োমাস এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো বাস্তবসম্মত বিকল্পগুলোতে জোর দিতে হবে। বিকল্প জ্বালানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে প্রধান চারটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সেগুলো হলো- নীতিগত ধারাবাহিকতা, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, উন্নত প্রযুক্তির স্থানান্তর এবং দক্ষ জনবল তৈরি করা।
দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্বল বাংলাদেশ
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল ও ভুটান বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিবেশবান্ধব ও বিকল্প শক্তির ব্যবহারের দিক থেকে বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভুটানে উৎপাদিত বিদ্যুতের শতভাগ আসে বিকল্প উৎস, প্রধানত জলবিদ্যুৎ থেকে। নেপালে উৎপাদিত বিদ্যুতের ৯৯.৭০ শতাংশ আসে বিকল্প বা নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৫১.৫০ শতাংশ মেটানো হয় বিকল্প উৎস থেকে, যার মধ্যে জলবিদ্যুৎ, সৌরশক্তি ও বায়ুবিদ্যুৎ অন্তর্ভুক্ত। জলবিদ্যুৎ ও বায়ো-এনার্জি থেকে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ২৪ থেকে ২৮ শতাংশ আসে পাকিস্তানে।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান খুবই উদ্বেগজনক। বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে। জাতীয় চাহিদার বিপরীতে প্রকৃত সরবরাহের দিক থেকে বিকল্প জ্বালানি অবদান মাত্র ৩-৪ শতাংশ। যদিও বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি আহরণের সক্ষমতা অনেক বেশি।
২০ শতাংশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা
২০৩০ সালের মধ্যে মোট উৎপাদনের ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ বিকল্প উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি-২০২৫ এবং একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে সরকার। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অন্তত ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন হবে। এজন্য দেশে জমির স্বল্পতার পরিপ্রেক্ষিতে জমি-নির্ভর বড় প্রকল্পের চেয়ে অবকাঠামো ও অর্থায়নের বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিয়ে ৫টি প্রধান কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা করা হয়েছে শিল্পকারখানা ও সরকারি ভবনের ছাদ ব্যবহার করে ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু রুফটপ সোলার থেকেই ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের। এজন্য সব সরকারি অফিস, স্কুল, মাদ্রাসা এবং হাসপাতালের ছাদে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বিনামূল্যে সোলার প্যানেল বসানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা নিজস্ব খরচে সোলার প্যানেল বসাবেন এবং পরিচালনা করবেন। ভবন কর্তৃপক্ষ বা কারখানা মালিকরা সস্তায় সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, একটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে যুদ্ধ বা বৈশ্বিক সংকটের সময় অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণে জ্বালানি খাতে বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জ্বালানি উৎস নিয়ে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, এলএনজির নতুন উৎস এবং ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা নিয়েও কাজ চলছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভবনকে শতভাগ সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও স্থাপনায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, সরকারের নতুন উদ্যোগ চলমান জ্বালানি সংকট নিরসনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ঘোষিত প্রণোদনার যথাযথ ব্যবহার হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকেই কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।
সার্বিকভাবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকল্প জ্বালানি এখন আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় বা বিলাসিতা নয়, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ। ফলে সরকার ও তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে। বাংলাদেশকে বিকল্প জ্বালানির কথা ভাবতে হবে। জলবায়ু সংকটে আমাদের দেশ ধীরে ধীরে মহা বিপদের দিকে যাচ্ছে। জ্বালানি তেল নিয়ে চলছে হাহাকার। হাজার মাইল দূরে যুদ্ধ হয়, তার আঁচে আমাদের কলকারখানা-গাড়ি অচল হয়ে যায়। তাই আগামী দিনের জন্য বিকল্প ভাবতে হবে।