রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২২ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      নদীদখল ও দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর      গোপালগঞ্জে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীবাহী বাস খাদে, নিহত ৩      জ্বালানি সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ      কিছু রাজনৈতিক দল বিভ্রান্তির মাধ্যমে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে : প্রধানমন্ত্রী      বাসায় গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে এমন কার্ড চাইলেন আসিফ মাহমুদ      নিউইয়র্ক সফরে ট্রাম্প-তারেক রহমানের বৈঠকের সম্ভাবনা      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ভেলোরের প্রতিটি হোটেল যেন একেকটি হাসপাতাল
মো. নেজাম উদ্দিন, চেন্নাই থেকে ফিরে
প্রকাশ: রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৫৩ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের ভেলোর শহরটি মূলত বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা, সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বিখ্যাত। দক্ষিণ ভারতের এই প্রাচীন শহরটিকে ‘কেল্লার শহর’ বা চিকিৎসার কেন্দ্রও বলেন অনেকে। ভেলোরের বিশ্বজোড়া খ্যাতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো এখানকার ক্রিস্টান মেমোরিয়াল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল (সিএমসি)। এটি ভারতের অন্যতম সেরা এবং বিশ্বখ্যাত একটি অলাভজনক চিকিৎসাকেন্দ্র, যেখানে জটিল রোগের সাশ্রয়ী মূল্যে আধুনিক চিকিৎসা করা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যসহ বিশ্বের বহু দেশ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে চিকিৎসার জন্য আসেন।

ভারতের তামিলনাড়ুর চেন্নাই সংলগ্ন ভেলোর শহরে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত খ্রিষ্টান মেডিকেল কলেজ (সিএমসি) হাসপাতালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল আবাসিক হোটেল ব্যবসা। প্রতিদিন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ এখানে চিকিৎসার জন্য আসেন। তবে পর্যাপ্ত হাসপাতাল বেড ও নিজস্ব আবাসন ব্যবস্থার অভাবে বাধ্য হয়ে রোগীদের উঠতে হয় আশপাশের বাণিজ্যিক হোটেলগুলোতে। ফলে ভেলোরের অলিগলির আবাসিক হোটেলগুলো যেন একেকটি ‘হাসপাতালে’ পরিণত হয়েছে। সংক্রামক ও জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের সঙ্গে একই ফ্লোর বা ভবনে সাধারণ ও সুস্থ ব্যক্তিদের অবস্থান করতে হওয়ায় বাড়ছে তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সংক্রমণ আতঙ্ক।

হোটেলের হাসপাতাল

ভেলোর শহরের মেইন রোড এবং আশপাশের হোটেলগুলোতে প্রতিদিনের চিত্র একই। হোটেল বোম্বে গেস্ট হাউস এবং বিমল রেসিডেন্সির মতো আবাসিক ভবনগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি রুমেই ক্যানসার বা অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীরা অবস্থান করছেন।

সাধারণের আতঙ্ক

ঢাকা থেকে ডায়াবেটিসের প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে আসা সাইদুর হোটেল বোম্বে গেস্ট হাউসের ৩০৪ নম্বর রুমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, ‘একটু নিরাপত্তার আশায় হোটেলে উঠেছিলাম, কিন্তু এসে দেখি পুরো চার তলা ভবনজুড়েই জটিল রোগীরা অবস্থান করছেন। এটি হোটেল নাকি হাসপাতাল বোঝা কঠিন।’

মানসিক চাপ ও অস্বস্তি

কক্সবাজার থেকে আসা আরেক রোগী কবির একই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখানে চিকিৎসা নিতে এসে মনে হচ্ছে উল্টো আরও রোগ সঙ্গে করে দেশে নিয়ে ফিরতে হবে। প্রতিটি ফ্লোরে ক্যানসারসহ মারাত্মক জটিল সব রোগী থাকায় সুস্থভাবে থাকার কোনো পরিবেশ নেই।’

হোটেল মালিকদের বক্তব্য ও প্রস্তাব

হোটেল বোম্বে গেস্ট হাউসের মালিক এরশাদ উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের অস্বস্তির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আসলেই অত্যন্ত জটিল। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো মুমূর্ষু বা জটিল রোগীকে আমরা ফেরত দিতে পারি না, হাসপাতালে জায়গা না পেলে তারা কোথায় যাবেন? তবে এর ফলে সুস্থ মানুষদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর একটা বড় ঝুঁকি থেকে যায়।’

পৃথক জোন বা ফ্লোর ব্যবস্থার প্রচলন

হোটেলগুলোতে জটিল রোগী এবং সাধারণ বা সুস্থ অতিথিদের জন্য আলাদা ফ্লোর বা জোন নির্দিষ্ট করা।

হাসপাতালের আবাসন বৃদ্ধি

সিএমসি কর্তৃপক্ষ যদি নিজস্ব আবাসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে রোগীদের ভেতরেই থাকার ব্যবস্থা করে, তবে সাধারণ হোটেলগুলোর ওপর এই চাপ কমে যাবে।

ভ্রমণকারী ও রোগীদের বিড়ম্বনা :

কাজের প্রয়োজনে নিয়মিত ভেলোরে আসা কলকাতার ব্যবসায়ী আনোয়ার জানান, ব্যবসায়িক কাজে এসে হোটেলে উঠলে মনে হয় কোনো হাসপাতালের ওয়ার্ডে আছি। সুস্থ মানুষের পক্ষে এমন পরিবেশে থাকা মানসিকভাবেও কষ্টের।

অন্যদিকে, বিমল রেসিডেন্সিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি রোগী ডলি জানান, সিএমসি হাসপাতালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীদের জন্য স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থা থাকা জরুরি। সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় সুস্থ ও অসুস্থ মানুষের এই মিশ্রণ সবার জন্যই এক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা না থাকা এবং আবাসিক হোটেলগুলোতে নির্দিষ্ট কোনো স্বাস্থ্যবিধি নীতি না মানায় ভেলোরে চিকিৎসা নিতে যাওয়া সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনরা প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন। ভেলোর শহরের এই পরিবেশগত ও প্রশাসনিক সংকট দূর করতে সিএমসি কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। 

বাংলাদেশের বিভিন্ন সচেতন মহল মনে করছে রোগী আর সুস্থ মানুষ যদি পাশাপাশি থাকে তবে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. আশিকুর রহমান এ বিষয়ে খোলা কাগজকে বলেন, ‘অনেক রোগ আছে ছোঁয়াচে। তাদের সুস্থ মানুষ থেকে দূরে রাখা আবশ্যিক। কিন্তু আপনার কথামতো যদি হোটেল কক্ষে রাখা হয় এবং ওই রোগী যাওয়ার পর রুমটি যদি স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পরিষ্কার করা না হয় জীবানু থেকে যায় যা পরে আসা যিনি ওই রুমে থাকবেন সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’

কেন এত ক্যানসার রোগী ভারত যাচ্ছেন— এ প্রশ্নের জবাবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যেসব রোগী ভারতে যায়, তারা পুরাতন এবং ক্রনিক ডিজিসে আক্রান্ত। যদিও দেশে অনেক ভালো হাসপাতাল তৈরি হয়েছে, তবুও অনেক ক্যানসার রোগী বিদেশে যাচ্ছেন। মূলত, চটকদার বিজ্ঞাপন এবং দালালরাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া অনেক রোগী বিদেশ মানেই ভালো চিকিৎসা হয় বলে মনে করেন, তারাও ভারত যাচ্ছেন।’ 

মুশতাক হোসেন আরও বলেন, ‘দেশে স্বাস্থ্যখাতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে বিদেশে রোগী যাওয়ার প্রবণতা কমবে। তবে এটা মনে রাখতে হবে যে বিদেশ থেকে অনেক রোগী বাংলাদেশেও আসছেন, তারা সুস্থ হয়ে দেশেও ফিরে গেছেন। তবে রোগীর যদি মনে হয়— বিদেশ মানেই ভালো চিকিৎসা হবে, তবে তাকে আমরা বাধা দিতে পারি না। ক্যানসার কোনো সংক্রামক রোগ নয়। তবে অন্য কোনো সংক্রামক ব্যাধি আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে থাকলে, ক্যানসার রোগীরাও সংক্রমিত হতে পারেন।’

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  ভেলোরের হোটেল   সিএমসি হাসপাতাল   ভেলোরে চিকিৎসা   রোগী সংক্রমণঝুঁকি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close