রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২২ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: গণতন্ত্রের জন্য সমঝোতার রাজনীতি করতে হবে : রাষ্ট্রপতি      দেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণ এক লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা      ডেঙ্গুতে আরও দুইজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৯৮৮      ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      নদীদখল ও দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর      গোপালগঞ্জে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীবাহী বাস খাদে, নিহত ৩      জ্বালানি সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে শুধু রাজনীতিবিদ নয়—চাই প্রকৌশলী, স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদের দক্ষ নেতৃত্ব
প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম
প্রকাশ: রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৩২ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

বাংলাদেশের নগরায়ণ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে নগর উন্নয়ন আর কেবল নতুন রাস্তা, ভবন কিংবা আবাসিক এলাকা নির্মাণের বিষয় নয়। একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে ভূমি ব্যবহার, নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো, পরিবহন, পরিবেশ, পানি নিষ্কাশন, নির্মাণ নিরাপত্তা, জনসংখ্যার চাপ ও ভবিষ্যৎ নগর সম্প্রসারণ—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হয়। রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ওপর তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব ন্যস্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত শুধু আজকের শহরকে প্রভাবিত করে না; অনেক সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশকের নগরজীবন ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে। 

এই বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে—উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান বিবেচনা কী হওয়া উচিত? ব্যক্তির রাজ‣নতিক পরিচয় নয়; বরং তাঁর যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট কাজের গভীর জ্ঞান কি বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত নয়?  

নেতৃত্বে যোগ্যতার গুরুত্ব কেন এত বেশি :

একজন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে প্রতিদিন ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, মহাপরিকল্পনা, অবকাঠামোর সক্ষমতা, যানবাহন চলাচল, জলাবদ্ধতা, পরিবেশের ভারসাম্য, ভবনের নিরাপত্তা, নগর সম্প্রসারণ ও ভবিষ্যৎ জনসংখ্যার চাপের মতো জটিল বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একটি ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব হয়তো আজ দৃশ্যমান হবে না। কিন্তু সেই ভুলের বোঝা একটি শহরকে বহু বছর, কখনো কখনো কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত বহন করতে হতে পারে। একটি অপরিকল্পিত সড়ক, ভুল ভূমি ব্যবহার, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত আবাসিক সম্প্রসারণ কিংবা দুর্বল নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতে একটি শহরের জন্য বড় ধরনের সংকট ক্সতরি করতে পারে। তাই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্ব কেবল একটি প্রশাসনিক পদ নয়; এটি একটি নগর ও প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দায়িত্ব। 

রাজনীতিবিদ বনাম প্রকৌশলী—বিষয়টি এমন নয় :

এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা দরকার—এটি কোনোভাবেই রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে অবস্থান নয় কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অস্বীকার করার প্রশ্নও নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একজন রাজনীতিবিদ অত্যন্ত দক্ষ, সৎ ও সফল প্রশাসক হতে পারেন—এটি যেমন সত্য, তেমনি একজন প্রকৌশলী, স্থপতি বা নগর পরিকল্পনাবিদও যথাযথ নেতৃত্ব, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও সততার মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারেন। অতএব, প্রশ্নটি হওয়া উচিত না—রাজনীতিবিদ না প্রকৌশলী? প্রশ্নটি হওয়া উচিত—যে পদের দায়িত্ব যেরকম, সেই পদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা কার রয়েছে? এই দৃষ্টিভঙ্গিই হতে পারে একটি আধুনিক, দক্ষ ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিচয়। 

কারিগরি প্রতিষ্ঠানে কারিগরি নেতৃত্বের সুযোগ কেন নয় :

উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মূল কাজের সঙ্গে প্রকৌশল, স্থাপত্য, নগর পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়ন সরাসরি সম্পৃক্ত। বাংলাদেশে অসংখ্য মেধাবী প্রকৌশলী, স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ রয়েছেন, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে বৃহৎ অবকাঠামো, নগর উন্নয়ন, নির্মাণ, পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক কাজে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প পরিচালনা করেছেন, বৃহৎ নগর অবকাঠামো বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করেছেন এবং জটিল কারিগরি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাহলে তাঁদের মধ্য থেকে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও নেতৃত্বের সক্ষমতার ভিত্তিতে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ কেন থাকবে না? এটি কোনো পেশাজীবী গোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধার দাবি নয়। এটি যোগ্যতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি। 

নিয়োগে আসুক স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা :

উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি বিবেচনা করা যেতে পারে—সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা; নগর পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জ্ঞান; প্রকৌশল ও অবকাঠামো উন্নয়নের বাস্তব অভিজ্ঞতা; বৃহৎ প্রকল্প পরিচালনার সক্ষমতা; প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের দক্ষতা; জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা; সততা ও ক্সনতিকতার প্রমাণিত রেকর্ড; সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা; স্বার্থের সংঘাত থেকে মুক্ত থাকার নিশ্চয়তা; দীর্ঘমেয়াদি নগর উন্নয়নের সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি। এ ধরনের একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকলে রাজনৈতিক পরিচয় কোনো প্রতিবন্ধকতা হবে না, আবার পেশাগত যোগ্যতাও উপেক্ষিত হবে না। 

উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জনগণের প্রতিষ্ঠান :

আমাদের মনে রাখতে হবে—উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান। এর প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের জমি, বাড়ি, ব্যবসায়, নিরাপত্তা, চলাচল, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রা জড়িত। একজন নাগরিক তাঁর জীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটি বাড়ি তৈরি করেন। একজন উদ্যোক্তা তাঁর সম্পদ বিনিয়োগ করে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। একটি পরিবার প্রজন্মের স্বপ্ন নিয়ে একটি শহরে বসতি স্থাপন করে। তাই নগর উন্নয়নের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু নথি বা নকশা থাকে না—থাকে মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ। এই কারণেই নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত দক্ষতা, সততা ও জনস্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার। 

একটি নীতিই হতে পারে আমাদের পথনির্দেশ :

আমাদের এখন এমন একটি নীতি প্রতিষ্ঠার কথা ভাবতে হবে—যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব যত বেশি কারিগরি, সেই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও কারিগরি জ্ঞান, পেশাগত যোগ্যতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে তত বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এই নীতি কাউকে বাদ দেওয়ার নীতি নয়। বরং এটি যোগ্য মানুষকে সুযোগ দেওয়ার নীতি।এটি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অস্বীকার করার নীতি নয়। বরং এটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি অনুযায়ী সঠিক নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার নীতি। 

শহরের ভবিষ্যৎ কোনো পরীক্ষাগার নয় :

একটি শহর এক দিনে তৈরি হয় না। একটি শহরের সড়ক, ভবন, পানি নিষ্কাশন, পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা ও জনসেবার অবকাঠামো বহু বছর ধরে গড়ে ওঠে। একবার ভুল পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পরে সেটি সংশোধন করতে বিপুল অর্থ, সময় ও জনসম্পদ ব্যয় হয়। তাই নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি। আজকের সিদ্ধান্ত যেন আগামী প্রজন্মের জন্য সমস্যা তৈরি না করে—এই চিন্তাই হওয়া উচিত নগর উন্নয়নের মূল দর্শন। 

এখন সময় যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার :

বাংলাদেশের প্রকৌশলী, স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদরা শুধু নকশা তৈরি করেন না। তাঁরা সেতু নির্মাণ করেন, সড়ক পরিকল্পনা করেন, ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, নগর অবকাঠামো পরিকল্পনা করেন এবং দেশের উন্নয়নের বাস্তব ভিত্তি নির্মাণ করেন। তাই তাঁদের পেশাগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রের বৃহত্তর উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সময় এসেছে। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে যোগ্য প্রকৌশলী, স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সুযোগ দেওয়া হলে তা কোনো একটি পেশার বিজয় হবে না। এটি হবে যোগ্যতার বিজয়। এটি হবে পেশাদারিত্বের বিজয়। এটি হবে জনস্বার্থের বিজয় এবং শেষ পর্যন্ত এটি হবে একটি সুন্দর, নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশের বিজয়। 

রাজনীতি থাকবে তার নিজস্ব মর্যাদার জায়গায়। পেশাদারিত্ব থাকবে তার নিজস্ব শক্তির জায়গায়। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব কাজের ধরন অনুযায়ী সর্বোত্তম নেতৃত্ব পাবে—এটাই হওয়া উচিত আমাদের প্রত্যাশা। সুতরাং সরকারের প্রতি একটি ইতিবাচক, গঠনমূলক ও সময়োপযোগী আহ্বান হতে পারে—উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে তাঁর পেশাগত যোগ্যতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা, সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক। কারণ—একটি শহর শুধু ইট, বালু ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি হয় না; একটি শহর তৈরি হয় সঠিক পরিকল্পনা, সঠিক নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা দিয়ে। শহরের ভবিষ্যৎ আমাদের হাতে—তাই নেতৃত্বও হোক যোগ্য হাতে। 

লেখক : রেজিস্ট্রার্ড প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার
লাইফ ফেলো সদস্য, আইইবি

কেকে/এমএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ   রাজনীতিবিদ নয়   প্রকৌশলী   স্থপতি   নগর পরিকল্পনাবিদ   দক্ষ নেতৃত্ব  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close