সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: গণতন্ত্রের জন্য সমঝোতার রাজনীতি করতে হবে : রাষ্ট্রপতি      দেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণ এক লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা      ডেঙ্গুতে আরও দুইজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৯৮৮      ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      নদীদখল ও দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর      গোপালগঞ্জে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীবাহী বাস খাদে, নিহত ৩      জ্বালানি সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
১০৫ পয়েন্ট দিয়ে মাদকের প্রবেশ, প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় কৌশল
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:১২ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতির যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। দেশের ১৮টি সীমান্ত জেলার ১০৫টি পয়েন্টকে মাদক প্রবেশের নিরাপদ রুট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখান দিয়ে অন্তত ২৭ ধরনের মাদক নানা কায়দায় দেশে ঢুকছে। শুধু সীমান্তপথই নয়, বন্দর, সমুদ্রপথ, আকাশপথ এমনকি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও মাদক প্রবেশের নতুন নতুন কৌশল তৈরি হচ্ছে। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট, মাদকপাচার আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; এটি একটি সংগঠিত, বহুমুখী ও ক্রমবর্ধমান জাতীয় সংকট।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের দুই কুখ্যাত রুট—গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টের—কেন্দ্রবিন্দুতে পড়েছে। ভারতের সঙ্গে চার হাজার কিলোমিটারের বেশি এবং মিয়ানমারের সঙ্গে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত অতিক্রম করে দেশে ঢুকছে ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের মতো মাদক। উদ্বেগের বিষয়, প্রবেশ করা মাদকের সিংহভাগই রাজধানী ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, যা প্রমাণ করে সমস্যাটি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

এই বৃহৎ চিত্রের একটি বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে, যা মিয়ানমার-সংলগ্ন দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় করিডরের অন্যতম সক্রিয় প্রবেশপথ। সেখানকার দুর্গম পাহাড় ও ছড়াপথ ব্যবহার করে প্রতি রাতে ইয়াবা ও বিদেশি মদের চালান দেশে ঢুকছে। আর তা বহন করছে স্থানীয় দরিদ্র ও বেকার যুবকদের একাংশ, সামান্য অর্থের বিনিময়ে। একটি উপজেলার এই চিত্রই বলে দেয়, দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ১০৫টি পয়েন্টে প্রকৃতপক্ষে কী পরিমাণ মানুষ ও অবকাঠামো এই কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও উদ্ধারের পরিসংখ্যানও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। গত প্রায় দেড় দশকে সাড়ে ৪৪ কোটির বেশি ইয়াবা ট্যাবলেট, হাজার হাজার কেজি হেরোইন ও গাঁজা, কোটির বেশি বোতল ফেনসিডিল এবং লক্ষাধিক মামলায় প্রায় ১৬ লাখ আসামি গ্রেপ্তারের তথ্য নিঃসন্দেহে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতার প্রমাণ। কিন্তু একই সঙ্গে এই বিশাল সংখ্যা এই প্রশ্নও তোলে—এত বড় পরিসরের অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও কেন মাদকের প্রবাহ বন্ধ হচ্ছে না, বরং প্রবেশপথ ও কৌশল দিন দিন বাড়ছে?

এর উত্তর নিহিত আছে কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে। প্রথমত, বহনকারী বা খুচরা কারবারি পর্যায়ে গ্রেপ্তার যত বেশিই হোক, মূল পৃষ্ঠপোষক ও নিয়ন্ত্রক চক্র—যাদের অনেকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ার অভিযোগ রয়েছে—তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা যাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাব দরিদ্র ও বেকার তরুণদের সহজেই এই কারবারের ঝুঁকিপূর্ণ অংশীদার বানিয়ে ফেলছে। তৃতীয়ত, দেশের অভ্যন্তরীণ বিতরণব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সীমান্ত পেরিয়ে আসা মাদক সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ এখনো তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

এই বাস্তবতা মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন অভিযানের বদলে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল প্রণয়ন জরুরি। চিহ্নিত ১০৫টি সীমান্ত পয়েন্টে আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত জনবল মোতায়েন করে বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব ও কোস্টগার্ডের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের একটি একীভূত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রস্তুত করা গডফাদার ও পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে।

সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে দরিদ্র ও বেকার তরুণদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও আয়বর্ধক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে তারা মাদক বহনের প্রলোভনে জড়িয়ে না পড়ে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যেসব সদস্য মাদক কারবারে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ যে মাদক পাচারের ঝুঁকিতে থাকবে, তা বদলানোর সুযোগ নেই। কিন্তু সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় কতটা কার্যকর ও সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তা সম্পূর্ণই নীতিনির্ধারক ও প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

কেকে/এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close