সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: গণতন্ত্রের জন্য সমঝোতার রাজনীতি করতে হবে : রাষ্ট্রপতি      দেশের মানুষের মাথাপিছু ঋণ এক লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা      ডেঙ্গুতে আরও দুইজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৯৮৮      ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      নদীদখল ও দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর      গোপালগঞ্জে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীবাহী বাস খাদে, নিহত ৩      জ্বালানি সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
খেলাপি ঋণ প্রায় ৩৩ শতাংশ : দায় কার?
রহমত উল্লাহ
প্রকাশ: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:১৬ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

একটি দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক কী হতে পারে? মূল্যস্ফীতি, ডলারের সংকট কিংবা বৈদেশিক ঋণের চাপ—এসব নিঃসন্দেহে বড় উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু যখন একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন সেটিকে শুধু অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা, সুশাসনের ঘাটতি এবং জবাবদিহির সংকটের প্রতিফলন।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে—অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি। ২০২৩ সালের শেষে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ছিল প্রায় ৯ শতাংশ, ২০২৪ সালের শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ দশমিক ২০ শতাংশে; ২০২৫ সালের শেষে হার প্রায় ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছায়। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের অনুপাত তিন গুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগের।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—এই বৃদ্ধি পুরোপুরি নতুন ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করার ফল নয়। এর একটি বড় অংশ হলো দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যার প্রকৃত চিত্র সামনে আসা। ঋণ শ্রেণিবিন্যাসের নিয়ম কঠোর হওয়ায় আগে যেসব ঋণকে খেলাপি হিসেবে দেখানো হচ্ছিল না, সেগুলোর একটি অংশ পরবর্তী সময়ে খেলাপি হিসেবে গণনায় এসেছে। বিষয়টি অনেকটা এমন—ময়লা ঘরে ছিল, শুধু এতদিন তা আলমারির পেছনে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল; ঘর পরিষ্কার করার সময় ময়লার পরিমাণ দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু শুধু হিসাবের নিয়ম পরিবর্তনকে দায়ী করে বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা শেষ করা যাবে না। কারণ প্রশ্ন হলো, ময়লা এতদিন জমল কেন?

২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এ হিসাবে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানে রয়েছে খেলাপি ঋণের হারে—যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনকেও পেছনে ফেলে। খেলাপি ঋণের এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি আমাদের আর্থিক ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অসংগতির একটি স্পষ্ট সংকেত।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ ৩৬ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা পরবর্তীতে কিছুটা কমে এলেও মোট পরিমাণ এখনো ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সংসদে প্রকাশিত শীর্ষ ২০ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম শীর্ষে রয়েছে। শীর্ষ ২০ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রকাশিত হয়েছে। শীর্ষ পাঁচ খেলাপির মধ্যে সবকটিই এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া বেক্সিমকো, কেয়া কসমেটিকস, সিকদার গ্রুপের চেমন ইসপাত, মাইশা গ্রুপ, রংধনু বিল্ডার্স, দেশবন্ধু সুগার মিলসসহ আরও কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠানও তালিকায় রয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই—ঋণখেলাপি দায়ী, কিন্তু তাকে এত বড় ঋণ দেওয়ার দায় কার?

একজন সাধারণ মানুষ ব্যাংক থেকে কয়েক লাখ টাকা ঋণ নিতে গেলেও তার আয়, সম্পদ, জামানত, ব্যবসা ও পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই করা হয়। কাগজপত্রে সামান্য ঘাটতি থাকলেও তার ঋণ আটকে যেতে পারে। কিস্তি পরিশোধে দেরি হলে তাকে নিয়মিত ফোন করা হয়, নোটিশ দেওয়া হয়, নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়। অথচ হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ যখন বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে যায়, তখন সেই ঋণের ঝুঁকি মূল্যায়ন কতটা কঠোরভাবে করা হয়েছিল—এ প্রশ্নের উত্তর আমরা খুব কমই পাই।

একটি ব্যাংক কোনো প্রতিষ্ঠানকে হাজার কোটি টাকা ঋণ দেবে, অথচ সেই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার প্রকৃতি, সম্পদের প্রকৃত মূল্য, ঋণের ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ পরিশোধ সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই করবে না—এটি মেনে নেওয়া কঠিন। যদি যাচাই করা হয়ে থাকে, তাহলে এত বিপুল ঋণ খেলাপি হলো কীভাবে? আর যদি যাচাই যথাযথভাবে না হয়ে থাকে, তাহলে দায় কি শুধু ঋণগ্রহীতার?

আমার দৃষ্টিতে, অবশ্যই ঋণগ্রহীতার দায় সবচেয়ে আগে। যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ঋণ নেয়, তার প্রধান দায়িত্ব হলো তা যথাসময়ে পরিশোধ করা। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এখানেই রাষ্ট্র ও ব্যাংক ব্যবস্থার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং বড় ঋণখেলাপির ক্ষেত্রে ব্যাংকের দায় আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ ব্যাংক শুধু টাকা দেয় না; সে ঝুঁকি গ্রহণ করে, ঝুঁকি মূল্যায়ন করে এবং সেই ঝুঁকির ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ঋণ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় যদি অনিয়ম থাকে, যথাযথ যাচাই না থাকে কিংবা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ থাকে, তাহলে শুধু ঋণগ্রহীতাকে দায়ী করে মূল সমস্যাকে আড়াল করা হয়।

বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু ‘ঋণ ফেরত না দেওয়া’ নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি হওয়া, যেখানে বড় ঋণগ্রহীতারা ঋণ পরিশোধ না করেও দীর্ঘ সময় সুবিধা পেতে পারেন। ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ, বারবার সময় বাড়ানো, দুর্বল আদায় ব্যবস্থা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপ—এসব যদি কোনো ঋণগ্রহীতাকে নিয়মের বাইরে সুবিধা দেয়, তাহলে সেটি শুধু ব্যাংকের ক্ষতি নয়; পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার ওপর আঘাত।

রাজনৈতিক প্রভাব, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণ, দুর্বল তদারকি, ব্যবসায়িক মন্দা এবং চলমান শক্তি সংকট—এসবের পাশাপাশি সুশাসনের ঘাটতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, জাল আর্থিক বিবরণী এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের প্রতি নীতিগত নমনীয়তা এই সংকটের প্রধান চালিকাশক্তি।

একজন সাধারণ আমানতকারী ব্যাংকে তার টাকা রাখেন একটি বিশ্বাস নিয়ে। তিনি বিশ্বাস করেন, তার সঞ্চয়ের অর্থ নিরাপদ এবং ব্যাংক সেই অর্থ দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করবে। কিন্তু সেই আমানতের টাকা যখন বড় ঋণ হিসেবে দেওয়া হয় এবং তা ফেরত আসে না, তখন ক্ষতির প্রভাব শেষ পর্যন্ত আমানতকারীর ওপরও পড়ে।

ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়, নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া কঠিন হয়, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা বাড়ে এবং অর্থনীতিতে আস্থার সংকট তৈরি হয়। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, এই ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ঘাড়ে এসে পড়তে পারে। তাই খেলাপি ঋণকে শুধু ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

একজন ব্যবসায়ী ১০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসায় ব্যর্থ হলে তার দায় থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একই সঙ্গে জানতে হবে, ব্যাংক কেন তাকে ১০০ কোটি টাকা ঋণ দিল? ঋণ দেওয়ার আগে তার সক্ষমতা কি যাচাই করা হয়েছিল? ঋণের অর্থ কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, তা কি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল? ব্যবসা ঝুঁকিতে পড়ার পর ব্যাংক কত দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছিল?

একই সঙ্গে প্রকৃত ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করার মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। একজন প্রকৃত উদ্যোক্তা ব্যবসায়িক বিপর্যয়ের কারণে সাময়িকভাবে সমস্যায় পড়তেই পারেন। কারণ একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে পারেন—তার সঞ্চয়ের টাকা নিরাপদ, ঋণগ্রহীতা জবাবদিহির বাইরে নন এবং ক্ষমতাবান হলেও কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন।

লেখক: কলামিস্ট

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close