জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে দেশে বেড়ে চলছে খাদ্যপণ্যের দাম। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নীরবেই বেড়ে চলছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব না মেলাতে পেরে ভাঙতে হচ্ছে সঞ্চয়।
তবে শুধু বাংলাদেশ-ই নয়, আগস্টে বিশ্ববাজারেই খাদ্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, ২০২২ সালের নভেম্বরের পর গত আগস্টেই খাদ্যপণ্যের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
পোলাওর চালের দাম দ্বিগুণ :
মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে পোলাওর চালের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। পোলাওর চাল কিনতেই কেজিতে গুনতে হচ্ছে ২০০ থেকে ২৩০ টাকা। দাম বাড়ার এই ধাক্কায় শুধু পরিবার নয়, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন।
বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ার পর থেকেই বাজারে সরবরাহ কমে দাম বেড়েছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের আরেক অংশের অভিযোগ, বড় মিল ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ধান-চাল মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।
আবার রপ্তানিকারকদের দাবি, উৎপাদন ও চাহিদার তুলনায় দেশে সুগন্ধি চালের পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত রয়েছে। তাই অল্প পরিমাণ রপ্তানির কারণে এমন সংকট হওয়ার কথা নয়। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেটজাত পোলাওর চাল ২১০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি এবং খোলা চাল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগেও কোনো কোনো প্যাকেটজাত পোলাওর চাল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা ও খোলা পোলাওর চাল ১১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পাইকারি বাজারেও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। এক মাস আগে ভালো মানের চিনিগুঁড়া চালের ৫০ কেজির বস্তা ৭ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা ৯ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ এক মাসেই বেড়েছে ২ হাজার টাকা।
বেড়েছে বোতলজাত সয়াবিনের দাম :
বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়াতে ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এত দিন বোতলজাত প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৯৯ টাকা। এখন নতুন দাম হয়েছে ২০৪ টাকা।
এর আগে সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানার মালিকেরা বৈঠক করেন।
বাণিজ্যসচিব আতাউর রহমান খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। এসব কারণ দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল আরও বেশি (লিটারে ১০ টাকা) দাম বাড়ানোর। তিনি বলেন, বাজারে বর্তমানে ভোজ্যতেলের কোনো সংকট নেই। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। সম্প্রতি বেড়েছে চিনির দাম। নতুন করে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোয় মূল্যস্ফীতিতে এর প্রভাব পড়বে কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যসচিব বলেন, ‘কিছুটা প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে।’
চড়া মাছ-ডিমের দাম :
এদিকে রাজধানীর কাঁচাবাজারে সবজির দাম কিছুটা কমলেও চড়া রয়েছে মাছ ও ডিমের বাজার। রুই, কই, শিংসহ নদীর মাছ কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। ইলিশের দাম স্বাভাবিক থাকলেও চাষের চিংড়ির দাম কমেছে।
মুরগির বাজার স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে বেড়েছে ডিমের দাম। প্রতি ডজনে ১০ টাকা বেড়ে লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা এবং সাদা ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা।
বৈশ্বিক পরিস্থিতি :
গত ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় এফএও। সংস্থার খাদ্য মূল্যসূচক অনুযায়ী, আগস্টে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৩৩.৩ পয়েন্টে। জুলাইয়ের সংশোধিত ১৩০.৮ পয়েন্টের তুলনায় এটি বেশি।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপে তীব্র দাবদাহ ও খরা, সম্ভাব্য এল নিনোর প্রভাব এবং ইউক্রেন-ইরান যুদ্ধের কারণে বাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এসব কারণে কৃষিপণ্যের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের দামও তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেন, ‘খাদ্যপণ্যের এই মূল্যবৃদ্ধি বাজারে ঝুঁকি ফিরে আসার একটি সতর্কবার্তা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যাঘাতের কারণে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে।’
আগস্টে খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, চিনি, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের দাম বেড়েছে। ইউরোপের প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ভুট্টা ও বিট থেকে চিনি উৎপাদন এবং গবাদিপশু পালনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। একইসঙ্গে সম্ভাব্য এল নিনোর প্রভাবে এশিয়ায় পাম তেল ও চিনি উৎপাদন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাড়ে চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দুই দেশ থেকে শস্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সার সরবরাহও সংকটে পড়েছে।
খাদ্যপণ্যের মধ্যে আগস্টে খাদ্যশস্যের মূল্যসূচক আগের মাসের তুলনায় ২.২% বেড়েছে। এতে সূচকটি ২০২৪ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভোজ্যতেলের মূল্যসূচক বেড়েছে ০.৬%, যা ২০২২ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ। অন্যদিকে চিনির মূল্যসূচক ১১.৯% বেড়ে ২০২৫ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
এদিকে পৃথক এক প্রতিবেদনে এফএও জানিয়েছে, ২০২৬ সালের বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনের পূর্বাভাস জুলাইয়ের হিসাব থেকে ৩.৪ মিলিয়ন টন কমিয়ে ২.৯৮০ বিলিয়ন টন করা হয়েছে। নতুন এ পূর্বাভাস ২০২৫ সালের তুলনায় ২% কম। এটি ২০১৮ সালের পর বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনে সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতন।
কেকে/ এমএস