কাঁঠালের রাজধানী হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় মৌসুমে যে কাঁঠাল ১০ টাকাতেও বিক্রি হয়েছে, মৌসুম শেষে সেই কাঁঠালই উঠেছে হাজার টাকায়। সরবরাহ কমে যাওয়ায় শেষ মৌসুমের কাঁঠালের দাম এখন আকাশছোঁয়া। আকার ও জাতভেদে প্রতিটি কাঁঠাল বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত। বড় ও সুস্বাদু কোনো কোনো কাঁঠালের দাম হাঁকা হচ্ছে ১ হাজার টাকা। ফলে মৌসুমের শেষ সময়ে এসে কাঁঠাল যেন হয়ে উঠেছে ‘দামি ফল’।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) শ্রীপুরের বিখ্যাত বরমী বাজারে গিয়ে দেখা যায়, মৌসুমের মতো বাজারজুড়ে কাঁঠালের স্তূপ নেই। ফলের দোকান ও ভ্যানগুলোতে অল্প কিছু কাঁঠাল নিয়ে বসেছেন কয়েকজন বিক্রেতা। ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের পাশাপাশি জাতভেদেও রয়েছে দামের পার্থক্য। দাম জানতে গিয়ে অনেক ক্রেতাকেই অবাক হতে দেখা যায়।
বরমী বাজারে আটটি কাঁঠাল নিয়ে বসেছিলেন পাইকার বিল্লাল হোসেন। আকারভেদে তার কাঁঠালগুলোর দাম ২০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। বড় একটি কাঁঠাল দেখিয়ে তিনি বলেন, “এক হাজার টাকার এই কাঁঠাল মৌসুমে ১০ টাকাও ছিল। কিছু গাছে মৌসুমের শেষ দিকে কাঁঠাল ধরে। এগুলো আমরা বেশি দামে কিনে আনি। স্বাদও বেশি, তাই মানুষও বেশি দামে কিনে।”
একই বাজারে ১৫টি কাঁঠাল নিয়ে বসেছিলেন পেশাদার কাঁঠাল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী। তার কাঁঠালগুলোর দাম ২০০ থেকে ৮০০ টাকা। তিনি বলেন, “মৌসুমে গ্রামে গ্রামে প্রচুর কাঁঠাল পাওয়া যায়। তখন কম দামে কাঁঠাল সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও এখন গাছে ফল কম থাকায় কাঁঠাল সংগ্রহ করতেই বেশি টাকা খরচ হচ্ছে।”
মোহাম্মদ আলীর ভাষ্য, শেষ মৌসুমের কাঁঠালের স্বাদও তুলনামূলক ভালো। তাই দাম বেশি হলেও অনেক ক্রেতা আগ্রহ নিয়ে কিনছেন। তিনি বলেন, ‘বড় একটা কাঁঠালের দাম ১ হাজার টাকা। মিষ্টি বেশি, কোষ বড়, গন্ধও মধুর মতো।’
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মে থেকে জুলাই পর্যন্ত শ্রীপুরের বাজারগুলোতে কাঁঠালের ব্যাপক সরবরাহ থাকে। এ সময় গ্রামের গাছ থেকে প্রচুর কাঁঠাল বাজারে আসে। সরবরাহ বেশি থাকায় অনেক সময় কম দামেও কাঁঠাল বিক্রি হয়। তবে মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে কাঁঠালের সরবরাহ কমে যায়। এখন জৈনাবাজার, গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি, নয়নপুর, বরমী ও মাওনা চৌরাস্তার বাজারেও আগের মতো কাঁঠাল পাওয়া যাচ্ছে না।
জৈনাবাজারের পাইকার সাইফুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় বাজারে এখন কাঁঠালের সরবরাহ খুবই কম। দু-একটি কাঁঠাল পাওয়া গেলেও সৌখিন ক্রেতারা বেশি দাম দিয়ে কিনছেন। শেষ মৌসুমের কাঁঠাল ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় নিয়ে গেলে ভালো দাম পাওয়া যায়। এসব এলাকায় শেষ সময়ের কাঁঠালের আলাদা চাহিদা রয়েছে।
ফল ব্যবসায়ী ইসলাম উদ্দিন বলেন, সব জাতের কাঁঠাল একই সময়ে ধরে না। কিছু জাতের গাছে আগাম ফল আসে, আবার কিছু জাতের গাছে মৌসুমের শেষ দিকে কাঁঠাল ধরে। ফলে শেষ সময়ে সরবরাহ কম থাকায় এসব কাঁঠালের দাম বেড়ে যায়।
তার মতে, জাত বুঝে কাঁঠালের চারা রোপণ করতে পারলে কৃষকের লাভের সুযোগ বাড়তে পারে। আগাম ও শেষ মৌসুমের কাঁঠালের বাজারে চাহিদা থাকায় উৎপাদনের সময়ও কৃষকের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা বলেন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কিছু আগাম ও ১২ মাসি কাঁঠালের জাত উদ্ভাবন করেছে। জাত বুঝে চারা রোপণ করলে কৃষকেরা সারা বছর কাঁঠাল উৎপাদন করে ভালো দাম পেতে পারেন।
তিনি জানান, চলতি বছর শ্রীপুরে কাঁঠাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬০ মেট্রিক টন। গত বছরও প্রায় একই লক্ষ্যমাত্রা ছিল এবং তা অর্জিত হয়েছে।
মৌসুমে যে কাঁঠাল কখনো ১০ টাকাতেও বিক্রি হয়, সেই কাঁঠালই মৌসুমের শেষ প্রান্তে এসে হাজার টাকার ঘরে পৌঁছেছে। দামের এমন ব্যবধান এখন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েরই আলোচনার বিষয়। মৌসুমে কম দামে পাওয়া কাঁঠাল সংরক্ষণ করে বছরের শেষদিকে বাজারজাত করা গেলে একদিকে যেমন ভোক্তারা সারা বছর কাঁঠাল পেতে পারেন, অন্যদিকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরাও ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কাঁঠাল সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতাদের অনেকে।
কেকে/সাশ