রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: পশ্চিমবঙ্গকে গ্রেটার বাংলাদেশ বানানোর চেষ্টা চলছে : শুভেন্দু      বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে প্রাণ গেল ৪ জনের      জাভা সাগরে ২৪১ যাত্রী নিয়ে নিখোঁজ যাত্রীবাহী জাহাজ      এমবাপ্পে ঝড়ে রায়োকে উড়িয়ে বার্সার ঘাড়ে রিয়াল      ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনে জোর বিএনপির      হাম উপসর্গে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু, সর্বমোট প্রাণহানি ১০১৯      শেখ হাসিনা ছিলেন বিশ্বের সেরা অভিনেত্রী: স্পিকার      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
সমুদ্র আমাদের, সম্ভাবনাও আমাদের— তবু কেন অপূর্ণ ব্লু ইকোনমি?
রাকিবুল হাসান মুন্না
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

আন্তর্জাতিক আদালতের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এক বিশাল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) লাভ করে। এর আয়তন দেশের মূল ভূখণ্ডের প্রায় সমপরিমাণ।

বাংলাদেশের উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশাল জলরাশি এবং ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে থাকা সব প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। 

সমুদ্রসীমা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি, মৎস্য, বন্দর, পর্যটন এবং সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে বাংলাদেশের। এই ভৌগোলিক বিজয় বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করার কথা ছিল। কারণ সমুদ্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমির বাজারের আকার ৩ থেকে ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে। বিশাল এই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য, মৎস্য সম্পদ, সামুদ্রিক জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, নৌপরিবহন, বন্দর, সামুদ্রিক পর্যটনসহ বিভিন্ন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো- এক দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এই বিশাল বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা বর্তমানে মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশের মতো। যে সমুদ্রসীমা অর্জনকে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখা হয়েছিল, তার সুফল এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয়নি। বিশাল সমুদ্র সম্পদ সামনে থাকা সত্ত্বেও সেই সম্পদকে সঠিকভাবে চিহ্নিত, আহরণ, ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।

যেখানে ব্লু ইকোনমি জাতীয় জিডিপিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার কারিগর হতে পারত, সেখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নীতিগত সমন্বয়হীনতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এই অপার সম্ভাবনাকে একপ্রকার বন্দিদশায় আটকে রেখেছে। সমুদ্র সম্পদ নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, দীর্ঘসূত্রতা এবং সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন কাঠামোর অভাবও এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাই প্রশ্ন ওঠে— যে সমুদ্রসীমা অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সামনে এত বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে গিয়েছিল, সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না কেন? কেন বিপুল সামুদ্রিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো ব্লু ইকোনমির বৈশ্বিক বাজারে নগণ্য অংশীদার? 

বাংলাদেশে ব্লু ইকোনমি সফল না হওয়ার পেছনের মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি প্রকট ও হতাশাজনক প্রশাসনিক চিত্র ফুটে ওঠে। বর্তমানে আমাদের নীল অর্থনীতির কর্মকাণ্ড সরকারের প্রায় ২৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ফলে এটি নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা, দায়িত্বের ওভারল্যাপিং এবং কাজের দ্বৈততা একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। যদিও ২০১৭ সালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ব্লু ইকোনমি সেল গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ জনবল, নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন এবং জোরালো আইনি ক্ষমতার অভাবে এটি আজ একটি নামমাত্র দপ্তরে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বের যেসব দেশ ব্লু ইকোনমিতে অকল্পনীয় সাফল্য অর্জন করেছে, তারা তাদের সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি সুসংগঠিত ও সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। অনেক দেশেই পৃথক মন্ত্রণালয়, জাতীয় কর্তৃপক্ষ কিংবা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানের অধীনে সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নীতি বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু এই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে আমরা এখনো জানি না, আমাদের বিশাল সমুদ্রের ঠিক কোন ভৌগোলিক অবস্থানে কী পরিমাণ খনিজ বা প্রাণিজ সম্পদ রয়েছে।

একটি নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ সামুদ্রিক ডেটাবেজ না থাকায় নীতিনির্ধারকদের কাছেও প্রয়োজনীয় তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও। কোনো বিদেশি বা দেশীয় বিনিয়োগকারী একটি নতুন খাতে বিনিয়োগের আগে জানতে চান— কোথায় কী সম্পদ রয়েছে, তার পরিমাণ কত, আহরণের সম্ভাবনা কতটা, বিনিয়োগের ঝুঁকি কতটুকু এবং দীর্ঘমেয়াদে সেই বিনিয়োগ কতটা লাভজনক হতে পারে। 

বিশাল সমুদ্রসীমা অর্জনের পরও গভীর সমুদ্রের সম্পদ অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি বাংলাদেশ। বর্তমানে এ ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতা মূলত ‘আরভি মীন সন্ধানী’ নামের একটি সাধারণ গবেষণা জাহাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই জাহাজটি সর্বোচ্চ প্রায় ২০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত মৎস্য জরিপ পরিচালনা করতে পারে। বঙ্গোপসাগরের গভীর অঞ্চলে বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক খনিজ, জ্বালানি ও মৎস্য সম্পদের সম্ভাবনা অনুসন্ধানে এটি যথেষ্ট নয়।

অথচ সমুদ্রের তলদেশের সম্পদ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ, মৎস্য সম্পদের মজুত নির্ধারণ কিংবা খনিজ ও জ্বালানি সম্পদের সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য অত্যাধুনিক গবেষণা জাহাজের পাশাপাশি সোনার প্রযুক্তি, সমুদ্রতল জরিপের সরঞ্জাম, রিমোটলি অপারেটেড ভেহিকল, স্বয়ংক্রিয় ডুবোযান ও ড্রোনের মতো প্রযুক্তি অপরিহার্য।

এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা এখনো সীমিত। যদিও প্রয়োজনের সময় বিদেশি গবেষণা জাহাজের সহায়তা নেওয়া হয়। কিন্তু নিজস্ব সক্ষমতার বিকল্পে বিদেশি প্রযুক্তি ও গবেষণা সহযোগিতা সহায়ক হতে পারে না। কারণ সমুদ্র সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ, জরিপ, পরিবর্তন, পর্যবেক্ষণ ও ধারাবাহিক গবেষণা অপরিহার্য।

সাময়িকভাবে বিদেশি জাহাজের ওপর নির্ভর করলে এই ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীলতার ঝুঁকি তৈরি করে। গভীর সমুদ্রে মৎস্য সম্পদ কিংবা গ্যাস হাইড্রেট অনুসন্ধানের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন অন্তত ১,০০০ মিটারের বেশি গভীরতায় কাজ করতে সক্ষম অত্যাধুনিক গবেষণা জাহাজ ও ড্রোন প্রযুক্তি। তবে অবকাঠামোই শেষ কথা নয়; এর সঙ্গে সমুদ্রবিজ্ঞানী, ভূতত্ত্ববিদ, মৎস্যবিজ্ঞানী, সামুদ্রিক গবেষক, ডেটা বিশ্লেষক এবং আধুনিক সমুদ্র জরিপ প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলও গড়ে তুলতে হবে। 

এই প্রযুক্তিগত দীনতা আমাদের সমুদ্রের তলদেশ সম্পর্কে একপ্রকার অন্ধ করে রেখেছে। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে ১৭ থেকে ১০৩ টিসিএফ পর্যন্ত গ্যাস হাইড্রেট বা মিথেন গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত থাকার কথা জানা গেলেও তা এখনো কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। গ্যাস হাইড্রেটকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় জ্বালানি সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সম্ভাব্য মজুতের হিসাব থাকা আর সেই সম্পদ নিরাপদ ও অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলন করা এক বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক ভূতাত্ত্বিক ও ভূকম্পন জরিপ, সমুদ্রতলের গঠন সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য, উন্নত প্রযুক্তি এবং পরিবেশগত ঝুঁকির যথাযথ মূল্যায়ন করা জরুরি। এসব সক্ষমতার ঘাটতিই সম্ভাব্য মজুতকে বাস্তব অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের পথে বড় বাধা করে। 

এই সম্পদ নিরাপদ ও অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলন করা সম্ভব হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের প্রথম শর্তই হলো সমুদ্রতলের ভূতাত্ত্বিক গঠন ও সম্পদ সম্পর্কে নির্ভুল জ্ঞান অর্জন। 

গ্যাস হাইড্রেটের মতোই বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা ও বাস্তবতা অর্জনের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছের অস্তিত্বের কথা বলা হলেও বাংলাদেশের মৎস্যজীবীদের বড় অংশ এখনো সনাতন পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক মাছ ধরার নৌযান, উন্নত ফিশ-ফাইন্ডার ও সোনার প্রযুক্তি, গভীর সমুদ্রে দীর্ঘসময় অবস্থানের সক্ষমতা এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় গভীর অঞ্চলের বড় ও মূল্যবান মাছের উল্লেখযোগ্য অংশ আহরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে রপ্তানি আয়েও। বিশেষ করে হিমায়িত চিংড়ি ও মৎস্য রপ্তানির সাম্প্রতিক প্রবণতা উদ্বেগজনক।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, একসময় এ খাত থেকে বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলার আয় হলেও তা কমে বর্তমানে প্রায় ৩৫-৪০ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবস্থান ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ভেনামি চিংড়ি। উচ্চ ফলনশীল এই চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষে বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারতের তুলনায় প্রায় ১২ বছর পিছিয়ে রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে ভেনামি চাষের অনুমোদন ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে নীতিগত ধীরগতি দেশের চিংড়ি খাতকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিয়েছে। সরকারি পর্যায়ে পরীক্ষামূলক চাষের অনুমোদন দিতে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ এবং আমদানিকৃত ব্রুডস্টকের ওপর তুলনামূলক উচ্চ শুল্কও উৎপাদকদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। অবশ্য বাগদা ও গলদার নিজস্ব বাজারমূল্য ও চাহিদা রয়েছে। কিন্তু পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে উৎপাদনশীলতা, রোগনিয়ন্ত্রণ, জৈবনিরাপত্তা, মাননিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক চাষপ্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলানো জরুরি। শুধু ঐতিহ্যগত পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা কঠিন।

ব্লু ইকোনমির বিকাশে আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সামুদ্রিক পরিবেশের ক্রমবর্ধমান বিপর্যয় ও দূষণ। যে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বাংলাদেশ বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছে, সেই সমুদ্রই যদি প্লাস্টিক, শিল্পবর্জ্য, তেল ও অন্যান্য দূষকের চাপে ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে এর সম্পদকে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ টন প্লাস্টিক উৎপাদিত হয়। যার মধ্যে প্রায় ২ লাখ টন উপকূলীয় নদ-নদীর মাধ্যমে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে।

বিপুল এই প্লাস্টিক বর্জ্য সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। এর প্রভাবে শুধু সমুদ্রের দৃশ্যমান দূষণই বাড়ছে না; মাছ, কচ্ছপ, সামুদ্রিক পাখিসহ বিভিন্ন প্রাণীর জীবনচক্রও ব্যাহত হচ্ছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, প্লাস্টিক ভেঙে ক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্রগুলো দূষিত হলে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের উৎপাদনশীলতা ভবিষ্যতে কমে যেতে পারে।

অর্থাৎ একদিকে আমরা সমুদ্রের সম্পদ আহরণের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলছি, অন্যদিকে দূষণের মাধ্যমে সেই সম্পদের প্রাকৃতিক ভিত্তিই দুর্বল করে তুলছি। তাই ব্লু ইকোনমির পরিকল্পনায় সামুদ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বাইরের কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এগুলোই টেকসই সুনীল অর্থনীতির অন্যতম পূর্বশর্ত।

সামুদ্রিক দূষণের আরেকটি বড় উৎস শিল্পবর্জ্য। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্প দেশের ইস্পাত চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও পরিবেশগত মানদণ্ড ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। 

জাহাজ ভাঙার সময় তেল, বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ও ভারী ধাতু পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। সীসা, ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়ামের মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতুর অনিয়ন্ত্রিত নিঃসরণ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, মাটি ও পানির গুণমানের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করতে পারে। এখানে অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে পরিবেশগত নিরাপত্তার একটি মৌলিক ভারসাম্যের প্রশ্ন সামনে আসে। জাহাজভাঙা শিল্প দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে এটি যেমন সত্য, তেমনি পরিবেশের ক্ষতি করে অর্জিত প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না বরং যথাযথ পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত না করে এই শিল্পের সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক পর্যটনসহ অন্যান্য সমুদ্রনির্ভর অর্থনৈতিক খাতকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতা।

বিশ্ববাজারে এখন শুধু পণ্যের দাম বা মানই প্রতিযোগিতার নির্ধারক নয়; পণ্যটি কোথায় থেকে এসেছে, কীভাবে উৎপাদিত হয়েছে এবং পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশগত মানদণ্ড কতটা অনুসরণ করা হয়েছে—এসব বিষয়ও ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত বিশ্বের বাজারগুলোতে পরিবেশগত নিরাপত্তা, ট্রেসেবিলিটি ও টেকসই উৎপাদনের ওপর জোর বাড়ছে।

বিষয়টি বাংলাদেশের মৎস্য রপ্তানি খাতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের প্রত্যাশা এখন শুধু নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; তারা উৎপাদন ও সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়ায় টেকসইতার নিশ্চয়তাও চায়। সমুদ্র ও উপকূলীয় পরিবেশ দূষিত হলে মাছের স্বাস্থ্য, উৎপাদন নিরাপত্তা ও পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এর প্রভাব একটি চালান বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশের সামুদ্রিক পণ্যের সামগ্রিক গ্রহণযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। 

২০১৪ সালের শ্যালা নদীতে তেল নিঃসরণের ভয়াবহ ঘটনাও বাংলাদেশের সামুদ্রিক ও উপকূলীয় পরিবেশের ভঙ্গুরতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। এ ধরনের দুর্ঘটনা স্পষ্ট করে যে, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক অঞ্চলে শিল্প, নৌপরিবহন ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনা মোকাবিলা, তেল দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জরুরি প্রতিক্রিয়া এবং পরিবেশগত নজরদারির সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। কারণ একটি বড় পরিবেশগত বিপর্যয় অল্প সময়ের মধ্যেই বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক সম্পদ ও স্থানীয় মানুষের জীবিকাকে বিপন্ন করতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, পরিবেশগত ক্ষতির প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। কোনো নদীর পানি দূষিত হওয়া কিংবা ম্যানগ্রোভ বন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রভাব হয়তো সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির হিসাবে ধরা পড়ে না; কিন্তু সময়ের সঙ্গে মাছের প্রজনন কমে যাওয়া, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, উপকূলীয় সুরক্ষা দুর্বল হওয়া, পর্যটনের আকর্ষণ কমে যাওয়া এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার মধ্য দিয়ে সেই ক্ষতির মাত্রা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থাৎ পরিবেশের ওপর আজকের অবহেলার মূল্য ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি হিসেবে পরিশোধ করতে হতে পারে। তাই সুনীল অর্থনীতির সম্প্রসারণে পরিবেশগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা এখনো অনেকটা গবেষণার ফাইলেই আটকে আছে। উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ু বিদ্যুৎ এবং জোয়ার-ভাটা ও সমুদ্রের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা থাকলেও তা বাস্তব উৎপাদনে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা ইরেনা’-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকায় অন্তত ৫ গিগাওয়াট পর্যন্ত বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতার চাপ কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা সম্ভব। বিশেষ করে উপকূল ও সমুদ্রসংলগ্ন এলাকায় বাতাসের গতি ও ধারাবাহিকতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে উইন্ড ফার্ম স্থাপন করা গেলে জাতীয় গ্রিডে এটি নতুন বিদ্যুৎ সংযোজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু সম্ভাবনা চিহ্নিত হওয়ার পরও বড় আকারের বিনিয়োগ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, গ্রিড সংযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এখনো কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারেনি। অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে সমুদ্র আমাদের সামনে যে সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, সেটি এখনো মূলত সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়ে গেছে; সেটিকে বাস্তব উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের গতি সেই তুলনায় অনেক ধীর।

অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশের সমুদ্রে তেল-গ্যাস ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের অনুসন্ধানে আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘসূত্রতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষি, বিনিয়োগের শর্ত নির্ধারণ, নীতিমালার অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে সমুদ্রের অধিকাংশ ব্লক এখনো পর্যাপ্তভাবে অনুসন্ধানের আওতায় আসেনি।

তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের এই ধীরগতি আমদানি-নির্ভরতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের সম্ভাব্য নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ ব্যবহারের সুযোগও পিছিয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, পরিবহন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সরাসরি সম্পর্কিত। পাশাপাশি সমুদ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ব্লু ইকোনমির অন্যতম পূর্বশর্ত। জলদস্যুতা, অবৈধ মাছ ধরা, চোরাচালান এবং সমুদ্রপথে সংঘটিত বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের কারিগরি সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা, সামুদ্রিক রাডার, স্যাটেলাইটভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, দ্রুতগামী টহলযান ও প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত অভিযানও আরও জোরদার করতে হবে। কারণ নিরাপদ সমুদ্র নিশ্চিত করা না গেলে সেখানে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, মৎস্য আহরণ কিংবা পর্যটনের টেকসই বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। তবে অবকাঠামো ও নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ করতে হবে মানবসম্পদে।

সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের জন্য সমুদ্রবিজ্ঞান, সামুদ্রিক প্রকৌশল, মৎস্যবিজ্ঞান, সামুদ্রিক আইন, নৌপরিবহন, সামুদ্রিক পরিবেশ, জ্বালানি প্রযুক্তি এবং সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণের মতো ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনবল তৈরি করা জরুরি। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির মতো বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণায় সরকারি অর্থায়ন বাড়ানো এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত বৃত্তি ও গবেষণা অনুদানের ব্যবস্থা করতে হবে। 

একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌথ গবেষণা ও জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা অবকাঠামো কিংবা নীতিগত উদ্যোগ— কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। সমুদ্রকে ঘিরে একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে গবেষণা ও শিক্ষাকে জাতীয় সামুদ্রিক কৌশলের কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত করার বিকল্প নেই।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনার তালা খুলতে সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং আমূল প্রশাসনিক সংস্কার। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মাধ্যমে এত বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সমুদ্রের মৎস্য, জ্বালানি, খনিজ, নৌপরিবহন, পর্যটন, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও গবেষণা— প্রতিটি খাত পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। অথচ এসব খাতের দায়িত্ব যখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে ছড়িয়ে থাকে, তখন সমন্বয়ের ঘাটতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

এই বাস্তবতায় অবিলম্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ও স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় ব্লু ইকোনমি কর্তৃপক্ষ অথবা পূর্ণাঙ্গ সুনীল অর্থনীতি মন্ত্রণালয় গঠনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে শুধু নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এর সাথে নীতি প্রণয়ন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, গবেষণা, বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি সামুদ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়নের কার্যকর ক্ষমতা থাকতে হবে।

একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তিতে এর কার্যক্রমের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। গভীর সমুদ্রে মৎস্য ও খনিজ সম্পদের অনুসন্ধানেও বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আধুনিক গবেষণা জাহাজ ক্রয়, গভীর সমুদ্র জরিপের প্রযুক্তি উন্নয়ন, সামুদ্রিক ডেটাবেজ তৈরি এবং দক্ষ গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ গড়ে তোলাকে জাতীয় বিনিয়োগের অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে সমুদ্র ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ করে ব্লু কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগানোর পথও খুঁজতে হবে।

বাংলাদেশের ম্যানগ্রোভ বন, উপকূলীয় জলাভূমি ও অন্যান্য সামুদ্রিক-উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রকে জলবায়ু অর্থনীতির সম্ভাবনাময় সম্পদ হিসেবেও দেখতে হবে। উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাই বঙ্গোপসাগরকে আর শুধু মানচিত্রের নীল অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে দেখতে হবে অর্থনীতি, জ্বালানি, খাদ্য, পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ ভাণ্ডার হিসেবে। সমুদ্রের এই ডাক আমাদের শুনতেই হবে।

কারণ ইতিহাস শুধু কোনো দেশের অর্জিত সম্পদের হিসাব রাখে না; সেই সম্পদ কতটা দূরদর্শিতা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছিল তারও হিসাব রাখে। আজ আমরা যদি এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সেই ব্যর্থতার দায় এড়ানো কঠিন হবে। আর যদি এখনই সাহসী, সমন্বিত ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তাহলে বঙ্গোপসাগরের এই নীল জলরাশিই হতে পারে বাংলাদেশের আগামী দিনের সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

লেখক, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।


কেকে/সাশ 




আরও সংবাদ   বিষয়:  ব্লু ইকোনমি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close