প্রায় এক দশক আগে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে যুক্ত হয় নতুন ৩৬টি ওয়ার্ড। এতে বাড়ে দুই সিটি করপোরেশনের সীমানা। তবে এত বছরেও এসব এলাকায় এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি নাগরিক সেবা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের আওতায় যুক্ত হওয়ার পরও অনেক এলাকায় নাগরিক সুবিধা ঘাটতি রয়েছে। কোথাও প্রধান সড়ক হয়েছে, কিন্তু ভেতরের রাস্তা বেহাল। আবার রাস্তা হয়েছে, ড্রেন হয়নি। ফলে বর্ষা এলেই তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এর সঙ্গে রয়েছে পানি ও গ্যাসের সংকট, সড়কবাতির ঘাটতি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা।
যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছে— উন্নয়নকাজ হচ্ছে না, এমন নয়। বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণসহ অবকাঠামো উন্নয়নের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কোথাও কাজ শেষ হয়েছে। কোথাও চলছে। অন্যদিকে সবগুলো কাজ এককভাবে সিটি করপোরেশনের করারও সুযোগ নেই। এখানে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি ওয়াসা ও তিতাসসহ একাধিক সংস্থার অংশগ্রহণ রয়েছে। তাই চাইলেও সব সুবিধা এককভাবে সিটি করপোরেশন নিশ্চিত করতে পারে না।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত বেশ কিছু ওয়ার্ড সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে রাস্তাঘাট বেহাল। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়ও উঠে এসেছে নাগরিক সেবা ঘাটতির বিষয়টি। তাদের অভিযোগ, উন্নয়নের বড় অংশ এখনো প্রধান সড়ককেন্দ্রিক।
ডিএনসিসি ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম খোলা কাগজকে বলেন, ‘ঢাকা সিটির অংশ হয়েও ৫০ নম্বর ওয়ার্ড যেন ‘প্রদীপের নিচে অন্ধকার’। রাজধানীর এত কাছে থেকেও এ এলাকার মানুষের নাগরিক দুর্ভোগের শেষ নেই। রাস্তাঘাটের অবস্থা অত্যন্ত বেহাল। কিছু এলাকায় উন্নয়নকাজ শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করে মাসের পর মাস রাস্তা কেটে ফেলে রাখা হচ্ছে। যে রাস্তা তিন-ছয় মাসের মধ্যে সংস্কার হওয়ার কথা, সেটি অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর পড়ে আছে। এর ফলে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং জনদুর্ভোগ আরও বাড়ছে। বিশেষ করে ফরিদ মার্কেট থেকে উদয়ন স্কুল রোডটি দীর্ঘদিন ধরে কাটা অবস্থায় পড়ে আছে। পুরো বর্ষাকাল মানুষকে দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে এ রাস্তা ব্যবহার করতে হয়েছে’।
তিনি বলেন, ‘ড্রেনেজ ব্যবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল। জলাবদ্ধতার পাশাপাশি মশার উপদ্রবও এ এলাকার একটি বড় সমস্যা। বর্তমানে মশা তুলনামূলক কম থাকলেও শীতকালে এর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এ ছাড়া অবকাঠামোগত সমস্যার চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো কিশোর গ্যাং, মাদক ও চাঁদাবাজি। এসব কারণে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। কিশোর গ্যাং ও মাদকসংশ্লিষ্টদের আগ্রাসী কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন সময় মানুষের ওপর হামলার ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।’
নাগরিক সুবিধার দিক থেকেও ৫০ নম্বর ওয়ার্ড অনেক পিছিয়ে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পুরো ওয়ার্ডে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য কোনো খেলার মাঠ নেই। বয়স্কদের হাঁটাচলার জন্যও পর্যাপ্ত উন্মুক্ত জায়গা নেই। নেই সরকারি হাসপাতাল, নেই কমিউনিটি সেন্টার। অথচ এটি ঢাকা সিটিরই একটি অংশ।’
ঢাকা উত্তর সিটিতে নতুন যুক্ত হওয়া ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আব্দুর রহমান নাবিল খোলা কাগজকে বলেন, ‘৪৪, ৪৫ ও ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডে সাম্প্রতিক সময়ে রাস্তার কাজ হয়েছে। তবে ভেতরের অনেক শাখা সড়ক এখনো সংস্কার হয়নি। এ সময় তিনি স্থানীয় চামুরখান, পূর্বপাড়া, ব্যাপারী বাড়ি, দোবাদিয়া ও মাদারবাড়ীর বিভিন্ন সড়কের দুরবস্থার কথাও জানান। তার ভাষ্য, কোথাও রাস্তা হয়েছে, কিন্তু ড্রেন হয়নি। কোথাও ড্রেন হয়েছে, কিন্তু সংযোগ ঠিক নেই। আবার রাস্তা নির্মাণের পর অন্য কোনো সংস্থা এসে সেটি কেটে ফেলছে। ফলে একটি উন্নয়নকাজ শেষ হতে না হতেই শুরু হচ্ছে আরেকটি খোঁড়াখুঁড়ি।’
নতুন ওয়ার্ডগুলোর বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি জলাবদ্ধতা। প্রধান সড়ক উঁচু হওয়ার পর অনেক শাখা সড়ক তুলনামূলক নিচু হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজের কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরতে পারে না। সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক সড়কে পানি জমে যায়। ভারী বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। নাবিলের অভিযোগ, বৃষ্টির সময় কোনো কোনো এলাকায়ও হাঁটুপানি জমে যায়। এতে পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচলও কঠিন হয়ে পড়ে।
ডিএনসিসি ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নূর মুহাম্মদও তার এলাকায় (বাউনিয়া) বর্ষায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন। কোথাও কোথাও পানি জমে থাকার কারণে মানুষের হাঁটাচলাই কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের দখল, ভরাটের কারণে খালের পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ক্ষমতা কমে গিয়েছে।
নাগরিক দুর্ভোগের আরেকটি বড় কারণ সড়কবাতির সংকট। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক সড়কে পর্যাপ্ত আলো নেই। কোথাও পুরোনো বাতি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। কোথাও নতুন এলইডি বাতি বসানো হলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলোও অচল হয়ে যায়। স্থানীয়দের কেউ কেউ অন্ধকার সড়ককে কেন্দ্র করে চুরি, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকির কথা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া ডিএসসিসি আওতাধীন ডেমরা থানার স্থানীয় বাসিন্দা সালেহ আহমেদ খোলা কাগজকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরও আমরা এখনো অনেক মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আমার বাড়ির সামনে বামুন পশ্চিমপাড়ায় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ ফুট রাস্তা এখনো কাঁচা। বর্ষা এলে রাস্তাটি পানিতে ডুবে যায়, চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এত বছরেও রাস্তাটি পাকা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘ডেমরা থানার অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য ওয়ার্ডের সামগ্রিক চিত্রও খুব একটা ভালো নয়। আগে যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলোর বাইরে নতুন করে তেমন উন্নয়ন হয়নি। কোথাও সড়কবাতি বসানো হয়েছে, কিছু বিচ্ছিন্ন কাজ হয়েছে; কিন্তু রাস্তা, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধার যথাযথ উন্নতি হয়নি।’
সালেহের অভিযোগ, বাড়ির আশপাশের ড্রেন ময়লা-আবর্জনায় ভরে যায়। অনেক সময় রাস্তা ও ড্রেন দীর্ঘদিন পরিষ্কার করা হয় না। এ ছাড়া বৃষ্টি হলে এলাকার অনেক রাস্তার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। বামুন দক্ষিণপাড়া থেকে থানার দিকের রাস্তাসহ আশপাশের বেশ কিছু রাস্তা ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। আগে ইটের সলিং করা রাস্তার অনেক অংশও নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ আশপাশের আবাসিক এলাকাগুলোতে অনেক উন্নয়ন হলেও আমাদের এলাকার রাস্তাঘাট এখনো ঠিক হয়নি।
ডিএসসিসি ৬২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ওমর ফারুক খোলা কাগজকে বলেন, ‘এ এলাকায় রাস্তাঘাটের অবস্থা মোটামুটি ভালো। তবে বৃষ্টি হলে বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়। খালের সঙ্গে সংযুক্ত ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার ও তদারকি না করায় পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়। তিন-চার দিন পরপর ময়লা নেওয়া হয়। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে সড়কবাতি থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয় এবং অনেক সময় বাতিগুলো বন্ধ থাকে।’
এ প্রসঙ্গে কথা হলে নগর-পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান খোলা কাগজকে বলেন, ‘এসব এলাকা আগে ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে ছিল। পরে সিটি করপোরেশনের আওতায় যুক্ত হয়েছে। কিন্তু গত প্রায় দুই বছর ধরে সেখানে নির্বাচিত কাউন্সিলর নেই। ফলে জরুরি কিছু কাজ হলেও সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা ব্যাহত হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এ কারণে যত দ্রুত সম্ভব সিটি করপোরেশন নির্বাচন হওয়া উচিত। নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলে এলাকার মানুষ তাদের কাছে গিয়ে সমস্যার কথা বলতে পারে। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধিরও এলাকার মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে, কারণ তাকে ভোট নিতে হয়। ফলে তিনি চান তার এলাকার কাজ হোক এবং মেয়রসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে এলাকার বিষয়গুলো দেখভাল করতে পারেন।’
বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নকাজে নির্বাচিত কাউন্সিলরদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কোনো এলাকায় বিভিন্ন সংস্থা যখন টেন্ডার করে কাজ করে, তখন সেখানে নির্বাচিত কাউন্সিলর থাকলে স্থানীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলো সমাধানে ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকে। নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় আরও বেশি সমস্যা হচ্ছে।’
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে (ডিএসসিসি) কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পাশাপাশি নাগরিকদের দৈনন্দিন সেবা দ্রুত নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছেন ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ডিএসসিসি অনেকটা অবহেলিত ও অকার্যকর অবস্থায় ছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম অগ্রাধিকার ছিল প্রতিষ্ঠানটিকে সক্রিয় ও কার্যকর করা। একই সঙ্গে মশার উপদ্রব, ড্রেনেজ সমস্যা, জলাবদ্ধতা ও সড়কবাতিসহ বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা কমিয়ে আনতে কাজ করা হচ্ছে।
নগরবাসীর অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসক বলেন, নাগরিকদের সরাসরি অভিযোগ শোনার জন্য এলাকাভিত্তিক গণশুনানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন কার্যালয়েও নাগরিকেরা সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারেন। পাশাপাশি একটি অ্যাপ চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে নগরের বিভিন্ন সমস্যার কথা দ্রুত জানানো যায়। গণমাধ্যমে কোনো সমস্যা উঠে এলে তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। তবে সব অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা সম্ভব হয় না।
মশা নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, মশা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, তবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে পরিবেশের ক্ষতি হয় এমনভাবে কীটনাশক ব্যবহার করা যাবে না। কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ঢাকাকে একটি আধুনিক, দুর্গন্ধমুক্ত পরিষ্কার নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি জানান, সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নাগরিক সমাজকেও নগর পরিষ্কারের দায়িত্ব নিতে হবে।
কেকে/এআই