রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি নিউরোলজি ও নিউরোসার্জারি চিকিৎসাকেন্দ্র ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে রাজধানীসহ সারা দেশ থেকে বহু রোগী আসেন। হাসপাতালটির বহির্বিভাগে স্বল্প মূল্যেই চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন সাধারণ মানুষ। তবে হাসপাতলটিতে ভর্তি হতে চাইলে সহজেই সিট মেলে না। এর জন্য শয্যা সংকটকেই দায়ী করেছেন হাসপাতালসংশ্লিষ্টরা।
যদিও সম্প্রতি হাসপাতালটির শয্যা সংখ্যা ১০০০-এ উন্নীত করা হয়েছে। তবে জনবল সংকটে সে সুবিধা পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। এতে ভোগান্তি বেড়েছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের।
এদিকে রোগীরা অভিযোগ করছেন, মন্ত্রী, এমপি বা প্রভাবশালীদের অনুমোদন ছাড়া এখানে সহজে সিট পাওয়া যায় না। এ ছাড়া হাসপাতালের বহির্বিভাগের রোগীরা ঠিক মতো সরকারি ওষুধও পান না। এসব অনিয়মের কারণে অনেক কর্মচারী তাদের চাকরিও হারিয়েছেন।
মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড, স্ট্রোক এবং স্নায়ুতন্ত্রের যাবতীয় জটিল রোগের উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসা অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে প্রদান করা হয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে।
চাঁদপুর থেকে আসা রোগী রিমার অভিযোগ, এ হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা হয় বলে এ হাসপপাতালে এসেছি। এর আগেও এখানকার চিকিৎসকদের পরামর্শে আমার আরেকটি স্নায়বিক রোগ সেরেছে। এবারও ডাক্তাররা ওষুধের প্রেশক্রিপশন দিয়েছন, কিন্তু সরকারি ওষুধ পাইনি।
শুধু রিমা নয়, একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন বহির্বিভাগের অনেক রোগী।
স্ট্রোক ও বিভিন্ন জটিল স্নায়ুবিক রোগে আক্রান্ত রোগীরা অভিযোগ করেছেন, এমপি, মন্ত্রী বা প্রভাবশালীদের অনুমোদন ছাড়া এখানে সহজে সিট পাওয়া যায় না। একজন সাধারণ মানুষ সিট পেয়েছেন— এটা খুবই ব্যতিক্রমী বিরল ঘটনা। শয্যা খালি না থাকায় অনেক সময় গুরুতর রোগীকেও ভর্তি করা সম্ভব হয় না।
কিশোরগঞ্জের গ্রামীণ এলাকা থেকে আসা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নুরুল্লাহ তার বৃদ্ধ বাবা আশরাফ উদ্দিনকে ভর্তি না নেওয়ার বিষয়ে বলেন, আমি গরিব মানুষ। বাবার চিকিৎসা করাতে করাতে গিয়ে নিঃস্ব। আমার বাবার মাথায় টিউমার, তিনি কথা বলতে পারছেন না। এমনকি ঠিকমতো শ্বাসও নিতে পারছেন না। এরপরও আমার বাবাকে সিট না থাকার কারণে ভর্তি করা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু কর্মকর্তাও জানান, এমপি, মন্ত্রী বা প্রভাবশালীদের অনুমোদন ছাড়া এখানে সহজে সিট পাওয়া যায় না।
একই অভিযোগ করেছেন উত্তরা থেকে আসা রোগী আব্দস সালাম (৬০)। তার স্ত্রী নাসিদা জানান, হাসপাতাল থেকে বিভিন্ন পরীক্ষ-নিরীক্ষা দেওয়া হলেও এখনো আমাদের সিট দেওয়া হয়নি। এদিকে আমার স্বামীর শরীরের নীচের অংশ অবশ হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. নুরুজ্জামান খান বলেন, আমরা আমাদের হাসপালে সবচেয়ে ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চাই। এ কারণে সিট না থাকলে অন্য হাসপাতালে রেফার করি। যদি সরকার বিভাগ পর্যায়ে আরও উন্নত মানের স্নায়বিক রোগ নিরাময় কেন্দ্র চালু করে, তাহলে সংকট কমবে। এটা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। ধীরে ধীরে এসব সমস্যার সমাধান হবে। এ ছাড়া রোগীদের সেবার জন্য হাসপাতালের বেড ৫০০ থেকে ১০০০ করা হচ্ছে। আমরা মূল আমাদের সেবার মান কমাতে চাই না। এ কারণে বরাদ্দ সিটেরি অতিরিক্ত রোগী ভর্তি করি না।
বহির্বিভাগের রোগীরা ঠিকমতো সরকারি ওষুধ পাচ্ছেন না কেন? এ বিষয়ে হাসপাতালটির পরিচালক বলেন, আমরা প্রায় কোটি টাকার ওষুধ কিনছি। সরকারি বরাদ্দ বেড়েছে। কিন্তু, এরপরও অনেক রোগী অভিযোগ করেছেন যে তারা সরকারি ওষুধ পাচ্ছে না। কারণ, বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ এ হাসপাতালে আসেন। অনেক সময় সাপ্লাই থাকে না।
রোগীর স্বজনরা জানিয়েছেন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে অনেক ক্ষেত্রে রোগীর স্বজনদের থাকতে দেওয়া হয় না। এ সমস্যা ও অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালটির সহযোগী পরিচালক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা সংক্রমণের আশঙ্কায় রোগীর স্বজনদের হাসপাতালে অবস্থান করতে দেই না। তবে কিছু ক্ষেত্রে দেওয়া হয়। হাসপাতালের সিটের সংকটের বিষয়ে আমি বলব— আমরা চিকিৎসার গুণগত মান নিশ্চিত করতে চাই। এ কারণে বরাদ্দ সিটের বাইরে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি করা হয় না। এ ছাড়া হাসপাতালে জনবল সংকট আছে। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
হাসপাতালে সরকারি ওষুধ না পাওয়া এবং দালাল ও প্রতারক চক্রের বিষয়ে তিনি বলেন, অন্য সব সরকারি হাসপাতালের তুলনায় এখানে দালাল ও প্রতারক চক্র নেই বললেই চলে। আমরা অসংখ্য কর্মকর্তাকে দুর্নীতির অভিযোগের কারণে বরখাস্ত করেছি। এ কারণে এখানে অনিয়ম কম। আমরা অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ওষুধ দেই। কোনো রোগী যদি এ সুবিধা না পান, তবে সুনির্দষ্টভাবে অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এখনো কেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে ১০০০ বেডের সেবা চালু করা গেল না? এ প্রশ্নের জবাবে হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে ১০০০ বেডের সেবা এখনো চালু করা যায়নি জনবল সংকটের কারণে। এমনিতে ওটি ও আউটডোর চালু করা হয়েছে। ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য কর্মকর্তা নিয়োগ হলে রোগীদের কষ্ট কমবে। আমাদের হাসপাতালে বেড বেড়েছে, কিন্তু জনবল এখনো বাড়েনি।
তবে হাসপাতালটির সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে আবাসিক সার্জন ডা. বশির আহমেদ খান বলেন, আমাদের হাসপাতালে প্রায় সব ধরনের স্নায়বিক রোগের চিকিৎসা হয়। এসব রোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের সার্জারিও হয়। যদিও সিটের সংকট আছে, তবু যেসব রোগী ভর্তি হয় তাদের ৮০-৯০ শতাংশ ভালো হয়। এখানকার বেশির ভাগ রোগীই বয়স্ক। তবে তাদের প্রতি আমরা বেশি মনোযোগ দেই। কারণ বয়স্ক রোগীরা সত্যি অনেক অসহায় অবস্থায় এখানে আসেন।
কেকে/ এমএস