বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি তেলের সংকট হবে না : বিপিসি      দ্বিপক্ষীয় সফর ও ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত      গণতন্ত্রকে রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ : রাষ্ট্রপতি      ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় সাতজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৫৯৩      আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তেই বিশ্বকাপে যায়নি বাংলাদেশ : তদন্ত কমিটি      আসিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ মনগড়া নয়, অর্থ উদ্ধারে প্রয়োজনে বিদেশে চিঠি      হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয় শিশুর প্রাণহানি      
দেশজুড়ে
মৃত মামলায় আটকে আছে ডিআরটিসির টেন্ডার
জামালুদ্দিন হাওলাদার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৩৭ এএম

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্যনিয়ন্ত্রকের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভাগীয় খাদ্য পরিবহন ঠিকাদার (ডিআরটিসি) তালিকাভুক্তি ও নিয়োগে টেন্ডার এলেই মামলা, মামলা হলেই আটকে যায় নতুন ঠিকাদার নিয়োগ। আর সে সুযোগে বছরের পর বছর বহাল থাকছেন মেয়াদোত্তীর্ণ পুরোনো ঠিকাদাররা। 

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম বিভাগীয় খাদ্য পরিবহন খাতে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ বারবার থামিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে পুরোনো মামলা ও মেয়াদোত্তীর্ণ বিতর্কিত ঠিকাদার সংঘবব্ধ হয়ে কাজ করছে। টাইম পিটিশন ও কালক্ষেপণে সহযোগিতা করছেন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্যনিয়ন্ত্রকের দপ্তরের বেশকিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী। যারা নিজেরাও নামে-বেনামে স্বজনদের নামে করছেন ঠিকাদারি ব্যবসা।

অভিযোগ রয়েছে, মামলা সচল রাখা ও আইনি লড়াইয়ের ব্যয় মেটানোর কথা বলে পুরোনো ও বিতর্কিত ঠিকাদারদের কাছ থেকে ‘মামলার খরচ’ হিসেবে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় খাদ্য পরিবহন ঠিকাদার সমিতির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে এ অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তালিকাভুক্ত ৪৫৭ ঠিকাদারের মেয়াদ ২০১৯ সালের জুনে শেষ হয়ে যায়। নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের কথা থাকলেও তা হয়নি। বরং মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া ওই তালিকাই কার্যত বছরের পর বছর বহাল রয়েছে। এ সুযোগে সরকারি খাদ্য পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি খাতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে পুরোনো ঠিকাদাররাই কাজ ভাগিয়ে নিচ্ছেন। 

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নতুন করে দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হলেই মামলা, স্থগিতাদেশ ও আইনি জটিলতাকে সামনে এনে প্রক্রিয়া থামিয়ে দিচ্ছে সেই ৪৫৭ ঠিকাদার চক্র। 

নওফেলের ডিও লেটারে যুবলীগের ১৭ ক্যাডার ঠিকাদার

চট্টগ্রাম আরসিফুডের দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের সুপারিশে (ডিও লেটারে) চট্টগ্রাম ডিআরটিসির ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ পান আওয়ামী লীগ-যুবলীগের ২৭ নেতাকর্মী। নওফেলের সুপারিশে চট্টগ্রামের তৎকালীন আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান কোনো কাগজপত্র ছাড়াই চট্টগ্রাম ডিআরটিসির ঠিকাদারি লাইসেন্স তালিকাভুক্ত করে ফ্যাসিবাদের দোসরদের কাজ দেন।
 
চট্টগ্রাম আরসিফুডের দপ্তরের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, শুধু নওফেলের সুপারিশেই নয়, ২০১৮-২০১৯ ও ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে একইভাবে সাবেক ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদীয় দলের হুইপ শামসুল হক চৌধুরী, চট্টগ্রাম ১০ সংসদীয় আসনের সাবেক এমপি এম এ লতিফ ও সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরের দেওয়া তালিকা থেকে ১০-১৫ জন করে মোট ৪৫৭ জনকে দলীয় পরিচয়ে ডিআরটিসির ঠিকাদারি লাইসেন্স তালিকাভুক্ত করে কাজ দেওয়া হয়। 

সেই ঠিকাদাররা এখনো চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে সরকারের আঞ্চলিক খাদ্য পরিবহনের কাজ সংঘবদ্ধভাবে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। যদিও দুবছর অন্তর পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যাচাইপূর্বক নতুন ঠিকাদার তালিকাভুক্ত এবং কাজ (নিয়োগ) দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে দীর্ঘ ছয় অর্থবছর গত হতে চললেও সরকারের প্রকিউরমেন্ট বিধির কিছুই মানেনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক।

ব্যাংক ডকুমেন্ট, আয়কর ও ট্রেড লাইসেন্স জালিয়াতি

অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিবাদ আওয়ামী সরকারের মন্ত্রী-এমপি কোটায় তালিকাভুক্ত হয়ে কাজ নেওয়া এসব ঠিকাদারের দলীয় ব্যানার ছাড়া সংশ্লিষ্ট কাজে কোনো যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা কিছুই ছিল না। অভিজ্ঞতা সনদ, ব্যাংককিং লেনদেন ও আর্থি সচ্ছলতা সনদ—সবই ছিল জালিয়াতি করে তৈরি। সাধারণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর বদলে গেছে অনেক কিছু। কিন্তু চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের কিছুই বদলায়নি।

ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের সময় ঠিকাদার নিয়োগ বাধাগ্রস্ত করার নেপথ্যে ছিলেন তিন রাঘববোয়াল। এর মধ্যে মূল ভূমিকায় ছিলেন—চট্টগ্রাম ডিআরটিসি ঠিকাদার সমিতির সাবেক সভাপতি ও যুবলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মাহমুদুল হক, সমিতির নেতা ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক এবং সমিতির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের ব্যক্তিগত সহকারী যুবলীগ নেতা ওসমান গণি। ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের ওই তিন নেতার সিন্ডিকেট দখলে নেয় বিএনপি নেতা পরিচয়ে এস এম আবু মনছুরসহ অন্তত ১০ জনের একটি সিন্ডিকেট।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ২০২২ সালের জুলাইয়ে ঢাকার আদালতে দায়েরকৃত মামলাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, নতুন ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ ঠেকাতেই একজন বহিরাগত ব্যক্তিকে বাদী করে মামলাটি করা হয়। মামলার পর নতুন ঠিকাদার নিয়োগ কার্যক্রমে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আসে। এরপর কেটে গেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর; কিন্তু মামলাটির নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে একটি অস্থায়ী আইনি বাধাই যেন কার্যত দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। 

একই সময় নারায়ণগঞ্জে করা আরেকটি মামলার স্থগিতাদেশ বাতিল হলেও চট্টগ্রাম বিভাগের খাদ্য পরিবহন ব্যবস্থায় তার কোনো দৃশ্যমান প্রভাব পড়েনি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—একটি মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কি অনির্দিষ্টকাল মেয়াদোত্তীর্ণ ঠিকাদারদের দিয়েই সরকারি খাদ্য পরিবহন চালানো যায়?

মামলা ঘিরে ‘খরচ’ আদায়ের অভিযোগ

জানা গেছে, নতুন ঠিকাদার নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দপ্তর। এ উদ্যোগের খবর জানার পরই ফের মামলা মামলা চালানো ও আরসিফুডের দপ্তর ম্যানেজ করার নামে ৪৫৭ ঠিকাদাররের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। টাকা আদায়ে রয়েছে যুবলীগ ও যুবদল পরিচয়ে কয়েকজনের একটি সিন্ডিকেট। 

দরপত্র ছাড়াই বছরের পর বছর কাজ

সচেতন ব্যবসায়ীরা জানান, খাদ্য পরিবহন একটি নিয়মিত সরকারি সেবা। সেখানে নির্দিষ্ট সময় পরপর দরপত্র আহ্বান করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ঠিকাদার বাছাইয়ের সুযোগ থাকার কথা। এতে একদিকে সরকারের ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা থাকে, অন্যদিকে যোগ্য ও দক্ষ পরিবহন ঠিকাদার নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু চট্টগ্রামে মেয়াদোত্তীর্ণ পুরোনো তালিকা দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকায় সেই প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

পুরোনো ঠিকাদারদের বহাল রাখার নেপথ্যে শুধু ঠিকাদারদের একটি অংশ নয়, খাদ্য বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বিভিন্ন মহলের সঙ্গে ঠিকাদারচক্রের যোগাযোগ থাকার অভিযোগও রয়েছে। 

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও একই ঠিকাদার তালিকা কীভাবে এত দীর্ঘসময় কার্যকর থাকছে? নতুন দরপত্রের উদ্যোগ কেন বারবার আইনি জটিলতায় আটকে যাচ্ছে? আদালতের মামলার পাশাপাশি প্রশাসনিকভাবে বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না? 

সেই মামলার দোহাই আরসিফুডের

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জিএম ফারুক হোসেন পাটওয়ারী বলেন, চট্টগ্রাম ডিআরটিসির ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে দুটি মামলা ছিল। তার মধ্যে একটি মামলা খারিজ হয়ে গেছে। অপর মামলাটিও দ্রুত নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করছি। মামলা শেষ হলেই নতুন ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  মৃত মামলা   ডিআরটিসি   টেন্ডার   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close