পার্বত্য জেলা বান্দরবানের প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও আধুনিক মিলনায়তন অরুণ সারকী টাউন হল বর্তমানে পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে সংস্কার না করায় সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই রাষ্ট্রীয় সম্পদটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বান্দরবানের বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী ও সংগঠক অরুণ সারকীর স্মৃতি রক্ষার্থে ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বাস্তবায়নে বান্দরবান সদরের জাদিপাড়া এলাকায় নির্মাণ করা হয় আধুনিক টাউন হলটি। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে উদ্বোধনের পর এটি পরিচালনার জন্য বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। উদ্বোধনের পর থেকে সরকারি-বেসরকারি সভা, সেমিনার, নাটক ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মিলিয়ে এটি ছিল শহরের প্রাণকেন্দ্র।
তবে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসের প্রলয়ঙ্করী এক বন্যায় পুরো মিলনায়তনটি পানিতে তলিয়ে যায়। বন্যার পানিতে ভবনের ভেতরের আসবাবপত্র, আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম, এয়ার কন্ডিশনার এবং মঞ্চের সাজসজ্জা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যা-পরবর্তী সময়ে ভবনটি আর ব্যবহার উপযোগী করা হয়নি।
এদিকে দীর্ঘদিন সংস্কার না করা এবং সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটি এখন পরিত্যক্ত ভবনে রূপান্তর হয়েছে। অনেক স্থানে ঝোপঝাড় ও আগাছায় ছেয়ে গেছে। দেয়ালে ফাটল ধরেছে এবং শ্যাওলা জমে এক ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতায় সরকারের কোটি টাকার এই স্থাপনাটি এখন পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় শিল্পী ও সংগঠকদের দাবি, দ্রুত অরুণ সারকী টাউন হলটি সংস্কার করে আগের মতো চালু করা হোক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় শুরু করা হোক।
চিত্রশিল্পী ও শিক্ষক আমিনুর রহমান প্রামাণিক বলেন, ‘বান্দরবানের অরুণ সারকী টাউন হলটি দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। সামান্য কিছু অর্থের জন্য এত বড় স্থাপনাটিকে ফেলে রাখার কোনো মানেই হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘একসময়ে বান্দরবানে এটি টাউন হল নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে এটি অরুণ সারকী টাউন হলে রূপান্তর হয় এবং আধুনিকায়ন করা হয়। আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়াতে সংশ্লিষ্টদের আরও দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন।’
বান্দরবান সরগম শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি ও সংগীতশিল্পী সবুজ দত্ত বাচ্চু বলেন, ‘২০২৩ সালের আগস্ট মাসের প্রলয়ঙ্করী এক বন্যায় মিলনায়তনটি পানিতে ঢুকেছে, আমরা শুনেছি। তবে যেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো মেরামত করে আবার পুরোদমে এই হলটি ব্যবহারের উপযোগী করা দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারিভাবে এত অর্থ এখানে বিনিয়োগ করা হয়েছে। সংস্কার করতে না পারায় প্রায় চার বছর এখানে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যাচ্ছে না। এর দায়ভার আমাদের সবাইকে নিতে হবে।’
সংগীতশিল্পী মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘অযত্নে পড়ে থাকা এই রাষ্ট্রীয় সম্পদটি দ্রুত সংস্কার করে পুনরায় চালু করে বান্দরবানের থমকে যাওয়া সাংস্কৃতিক ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়াতে সংশ্লিষ্টরা দ্রুত ব্যবস্থা নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রহমত আলী জানান, ‘বান্দরবানের প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও আধুনিক মিলনায়তন অরুণ সারকী টাউন হলটি এখন পরিত্যক্ত একটি ভবন। এই ভবনের সামনে-পেছনে বড় বড় ঘাস জন্মেছে। সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করায় এখানে এখন কোনো আয়োজন আমরা দেখি না।’
এদিকে অরুণ সারকী টাউন হলটির দায়িত্বে থাকা বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, দ্রুত সময়ে অরুণ সারকী টাউন হলটির সংস্কারকাজ বাস্তবায়ন করা হবে।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাম্যাচিং আরও জানান, ‘আমরা খুব অল্প দিন হলো বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি এবং ন্যস্ত বিভাগগুলোতে সদস্যদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছি। খুব দ্রুত বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য অরুণ সারকী টাউন হলটি পরিদর্শন করবেন। এর সংস্কারে কী করা প্রয়োজন, সেটি যাচাই করবেন।’
কেকে/এমএস