কারও হাতে চিকিৎসার প্রেসক্রিপশন, কারও হাতে জমির কাগজ। কেউ এসেছেন স্বজনের নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে, কেউ আবার মাসের পর মাস বেতন না পাওয়ার কষ্ট নিয়ে। কারও প্রয়োজন সরকারি ভাতা, কারও দরকার মাথা গোঁজার ঠাঁই। নানা সমস্যা ও প্রত্যাশা নিয়ে প্রতি বুধবার গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির হচ্ছেন জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ।
তাদের কথা শুনছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া। অভিযোগ শুনে অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। আবার কোনো কোনো অসহায় মানুষের চিকিৎসা বা জরুরি প্রয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেওয়া হচ্ছে আর্থিক সহায়তা।
জেলা প্রশাসনের এ গণশুনানিতে উঠে আসছে গাজীপুরের মানুষের জীবনের নানা বাস্তব চিত্র। একই সঙ্গে সামনে আসছে সরকারি সেবা পেতে মানুষের ভোগান্তি, দারিদ্র্য, পারিবারিক বিরোধ, চিকিৎসাব্যয়ের চাপ, জমিসংক্রান্ত জটিলতা এবং শ্রমিকদের বেতন না পাওয়ার মতো সমস্যাও।
তবে গণশুনানির এ উদ্যোগের কার্যকারিতা শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়। একটি অভিযোগের পরবর্তী অগ্রগতি, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পদক্ষেপ এবং শেষ পর্যন্ত সমস্যাটির নিষ্পত্তি হয়েছে কি না—এ সব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
পোশাক শ্রমিক সানিয়া আক্তার এসেছিলেন তার পঙ্গু বাবার চিকিৎসার জন্য সহায়তা চাইতে। পরিবারের সীমিত আয়ে বাবার চিকিৎসার ব্যয় বহন করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল।
গণশুনানিতে বিষয়টি তুলে ধরার পর জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে তাকে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসার বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়।
একইভাবে টঙ্গীর অসহায় বৃদ্ধা সামসুন্নাহার ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য সহায়তা চাইতে আসেন। তার চিকিৎসার জন্যও তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
এ ধরনের ঘটনা দেখিয়ে দেয়, অসুস্থতা শুধু শারীরিক সংকট নয়—নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য তা অনেক সময় আর্থিক বিপর্যয়ও ডেকে আনে। সরকারি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও সঠিক জায়গায় আবেদন করার পথ অনেকের কাছেই সহজ নয়।
স্বামী মারা যাওয়ার পর ভাসুর ও আত্মীয়দের সঙ্গে বিরোধে গৃহহীন ও নানা সমস্যার মুখে পড়ার অভিযোগ নিয়ে গণশুনানিতে আসেন হালিমা আক্তার।
কথা বলার সময় তার চোখের পানি দেখে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন জেলা প্রশাসক। পরে সমস্যাটি দেখার জন্য সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) দায়িত্ব দেওয়া হয়।
জমি ও বসতভিটা নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক নির্দেশই যথেষ্ট নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য নেওয়া এবং আইন অনুযায়ী সমাধান—সবগুলো ধাপ শেষ করতে হয়। ফলে গণশুনানিতে নির্দেশ দেওয়ার পর সেটির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
গণশুনানিতে ব্যক্তিগত সমস্যা ছাড়াও জনস্বার্থের বিভিন্ন বিষয় উঠে আসছে। জমি অধিগ্রহণের বিল, মাতৃত্বকালীন ভাতা, কারখানার বকেয়া বেতন, সড়ক সংস্কার, নতুন ভূমি অফিস স্থাপন এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মতো বিষয়ও রয়েছে অভিযোগের তালিকায়।
এ সব অভিযোগের কোনটি জেলা প্রশাসনের সরাসরি এখতিয়ারভুক্ত, আবার কোনোটি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়। ফলে গণশুনানিতে অভিযোগ গ্রহণের পাশাপাশি কোন অভিযোগ কোন দপ্তরে পাঠানো হলো এবং তার পরবর্তী অগ্রগতি কী—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় সরকার নানা ধরনের ভাতা দিয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচনে ভুল, তথ্যের ঘাটতি কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কেউ কেউ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করেন।
গণশুনানিতে এ ধরনের অভিযোগ এলে সমাজসেবা অধিদপ্তর, মহিলা ও শিশু বিষয়ক দপ্তর, প্রতিবন্ধী কল্যাণ ট্রাস্ট এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, গণশুনানিতে আবেদন করার পর প্রকৃত উপকারভোগীর হাতে সহায়তা পৌঁছাতে কত সময় লাগছে এবং কতটি আবেদন শেষ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হচ্ছে। এ সব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ হলে গণশুনানির কার্যকারিতা আরও স্পষ্ট হবে।
গণশুনানিতে একজন জেলা প্রশাসক সরাসরি মানুষের কথা শুনছেন—এটি মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু একটি অভিযোগের ক্ষেত্রে ‘ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ’ দেওয়ার পর সেটির বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি জমি অধিগ্রহণের টাকা পাওয়ার জন্য আবেদন করলেন। শুনানিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। এরপর আবেদনটি কোন পর্যায়ে গেল, কবে নিষ্পত্তি হলো, আবেদনকারী টাকা পেলেন কি না—এ সব তথ্য জানা না গেলে পুরো প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা কঠিন।
একইভাবে চিকিৎসা সহায়তার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা পরবর্তী অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। বকেয়া বেতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া নয়, শ্রমিক প্রকৃতপক্ষে বেতন পেলেন কি না—সেটিও ফলোআপের বিষয়।
জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘মানুষের সমস্যা শুনে তার পক্ষে যতটুকু সম্ভব, সেগুলোর সমাধানের চেষ্টা করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য একটাই—একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ তার নিজের অধিকার বুঝে পাবে।’
প্রশাসনিক কাঠামোয় সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকার একজন অসহায় মানুষ কোন দপ্তরে যাবেন, কার কাছে আবেদন করবেন কিংবা তার সমস্যাটি কোন আইনের আওতায় পড়ে—তা অনেক সময় জানা থাকে না।
সেই জায়গায় জেলা প্রশাসকের গণশুনানি সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করছে। একজন নাগরিক তার সমস্যা নিয়ে জেলা প্রশাসকের সামনে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও মানুষের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হচ্ছেন।
গণশুনানিতে উঠে আসা অভিযোগগুলো তাই শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এগুলো জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রা ও সরকারি সেবা পাওয়ার বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে।
গণশুনানির মাধ্যমে কতজন মানুষ অভিযোগ করেছেন—এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের কতজনের সমস্যা সমাধান হয়েছে।
এ জন্য নিয়মিতভাবে যদি মোট অভিযোগের সংখ্যা, তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তি হওয়া অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো অভিযোগ, অপেক্ষমাণ আবেদন এবং সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি হওয়া অভিযোগের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়, তাহলে জনগণের কাছে গণশুনানির কার্যকারিতা আরও স্বচ্ছ হবে।
একই সঙ্গে মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পুরোনো অভিযোগগুলোর ফলোআপ করলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সমস্যাগুলোও চিহ্নিত করা সম্ভব।
গাজীপুরে প্রতি বুধবারের গণশুনানি ইতিমধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য অভিযোগ জানানোর একটি সরাসরি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এখন এর কার্যকারিতার পরবর্তী ধাপ হতে পারে—শুধু মানুষের কথা শোনা নয়, অভিযোগের শেষ পরিণতি পর্যন্ত নজর রাখা।
কারণ একজন অসহায় মানুষ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে স্বস্তি নিয়ে ফিরবেন তখনই, যখন তার হাতে শুধু একটি নির্দেশনার কাগজ নয়, বাস্তবে সমস্যার সমাধান পৌঁছাবে।
কেকে/এআই