রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১২ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● হামের উপসর্গে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩৪১      ● জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে : মন্ত্রী টুকু      ● সায়েন্সল্যাবে ঢাকা কলেজ-আইডিয়াল কলেজ শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ      ● দখলবাজিতে ব্যস্ত নেতারা, ভাবমূর্তি সংকটে সরকার      ● জাতিসংঘ সফর শেষে ঢাকায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ● এক হাজার ৪৯৮ পর্যটন আকর্ষণ নিয়ে জাতীয় মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে : রাষ্ট্রপতি      ● হাম উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু      
দেশজুড়ে
গ্রামবাংলার মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিতে আজও অমলিন তুলসী
সনৎ চক্রবর্ত্তী, ফরিদপুর
প্রকাশ: রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:২৯ পিএম আপডেট: ২৭.০৯.২০২৬ ৩:৩২ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

তুলসীর পাতা এক ভেষজ ঔষধ—গ্রামবাংলার মানুষের কাছে এমন বিশ্বাসের শিকড় বহু গভীরে। সর্দি-কাশি কিংবা ঠান্ডাজনিত সমস্যায় ঘরোয়া ব্যবহারের পাশাপাশি আয়ুর্বেদিক ও লোকজ চিকিৎসায় যুগ যুগ ধরে তুলসীর পাতার ব্যবহার হয়ে আসছে।

সময় বদলেছে, চিকিৎসাব্যবস্থা আধুনিক হয়েছে। গ্রামে-গঞ্জে বেড়েছে হাসপাতাল ও ওষুধের দোকান; তবু বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা তুলসীগাছটির প্রতি মানুষের মমতা যেন আজও ফুরোয়নি।

তুলসীর বৈজ্ঞানিক নাম Ocimum tenuiflorum L.। এটি Lamiaceae বা পুদিনা পরিবারের একটি সুগন্ধি ভেষজ উদ্ভিদ। বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে Ocimum sanctum L. নামটিও তুলসীর সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলাদেশে তুলসী একটি পরিচিত ঔষধি উদ্ভিদ এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি চাষ করা হয়।

সর্দি-কাশিতে গ্রামীণ ঘরোয়া ব্যবহারে তুলসী

ফরিদপুরসহ বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক পরিবারে তুলসীপাতার ঘরোয়া ব্যবহার দেখা যায়। বিশেষ করে সর্দি, কাশি ও ঠান্ডাজনিত সমস্যায় তুলসীর পাতার রস বা পাতার তৈরি পানীয় ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। কোথাও তুলসীপাতার সঙ্গে মধু মেশানো হয়, আবার কোথাও পাতাগুলো পানিতে ফুটিয়ে পান করা হয়।

বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদবিষয়ক তথ্যভাণ্ডারে তুলসীর পাতার ঐতিহ্যগত ব্যবহারের মধ্যে কাশি, সর্দি, ক্যাটারহ, ব্রঙ্কাইটিসসহ কিছু শারীরিক সমস্যার কথা উল্লেখ রয়েছে। দক্ষিণ বাংলাদেশের লোকজ চিকিৎসা নিয়েও প্রকাশিত গবেষণায় Ocimum tenuiflorum বা তুলসীপাতার সঙ্গে কাশি ও সর্দির ঐতিহ্যগত ব্যবহারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এ সব ব্যবহার মূলত ঐতিহ্যগত বা ভেষজ চিকিৎসার অংশ। কোনো নির্দিষ্ট রোগ সারানোর নিশ্চয়তা হিসেবে এগুলোকে দেখা ঠিক নয়।

কোন সমস্যায় কখন তুলসী ব্যবহার করা হয়?

গ্রাম বাংলায় সাধারণত সর্দি, হালকা কাশি, ঠান্ডাজনিত অস্বস্তি বা গলা খুসখুসের মতো উপসর্গে তুলসীপাতা ঘরোয়া উপায়ে ব্যবহার করা হয়। কেউ পাতার চা বা পানিতে ফুটিয়ে তৈরি পানীয় পান করেন, আবার কেউ তুলসীপাতার রস ব্যবহার করেন।

তবে তুলসীকে রোগের মূল চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার না করে উপসর্গের ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত ঘরোয়া ভেষজ হিসেবে বিবেচনা করাই নিরাপদ। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা জ্বর, শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, রক্তসহ কাশি কিংবা গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে শুধু তুলসীর ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

শিশু, গর্ভবতী নারী, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা নিয়মিত ওষুধ সেবনকারীদের ক্ষেত্রেও ভেষজ উপাদান নিয়মিত বা বেশি পরিমাণে ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

আয়ুর্বেদে তুলসীর দীর্ঘ পথচলা

তুলসী শুধু গ্রামীণ ঘরোয়া চিকিৎসার একটি উদ্ভিদ নয়; ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন আয়ুর্বেদিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ব্যবস্থায় তুলসী ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

আয়ুর্বেদিক ঐতিহ্যে তুলসীর পাতা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যায় ব্যবহারের কথা উল্লেখ রয়েছে। এর সুগন্ধি পাতা ও উদ্ভিদে বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান রয়েছে, যা আধুনিক গবেষণাতেও তুলসীকে আগ্রহের বিষয় করে তুলেছে।

তবে গবেষণাগারে কোনো উপাদানের সম্ভাব্য কার্যকারিতা পাওয়া এবং মানুষের কোনো নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসায় তার নিশ্চিত উপকার প্রমাণিত হওয়া—দুটি ভিন্ন বিষয়। তাই তুলসীর ভেষজ ব্যবহার নিয়ে অতিরিক্ত দাবি না করে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার সঙ্গে বিষয়টিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

উঠোনে তুলসী, ঘরে শান্তির আবহ

গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক হিন্দু পরিবারের বাড়ির উঠোনে কিংবা বারান্দার পাশে দেখা যায় তুলসীমঞ্চ। ছোট্ট মাটির বেদির ওপর সবুজ পাতায় ভরা তুলসীগাছ—সকালের রোদে যার পাতায় ঝিলমিল করে শিশির। সন্ধ্যা নামলে কোথাও কোথাও জ্বলে ওঠে প্রদীপ।

একটি গাছকে ঘিরে এ যেন বিশ্বাস, ভালোবাসা আর ঐতিহ্যের এক নীরব সংসার। হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে তুলসী পবিত্র উদ্ভিদ হিসেবে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও পূজা-পার্বণে তুলসীপাতার ব্যবহার প্রচলিত। গবেষণাতেও তুলসীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে।

বাংলাপিডিয়ার লোকসংস্কার বিষয়ক আলোচনাতেও হিন্দু সমাজে তুলসীসহ বিভিন্ন বৃক্ষের পূজার প্রচলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

রাম তুলসী, কৃষ্ণ তুলসী—নামেও বৈচিত্র্য

তুলসীর মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। ঐতিহ্যগতভাবে রাম তুলসী ও কৃষ্ণ বা শ্যাম তুলসী নাম দুটি বহুল পরিচিত। সবুজাভ পাতার তুলসীকে অনেক জায়গায় রাম তুলসী এবং বেগুনি বা গাঢ় রঙের পাতার তুলসীকে কৃষ্ণ তুলসী বলা হয়। গবেষণায় এই দুই ধরনের তুলসীকে Ocimum tenuiflorum-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

ফরিদপুরের বিভিন্ন গ্রামেও বাড়ির আঙিনায় কিংবা টবে এ সব ধরনের তুলসীগাছ লাগাতে দেখা যায়। কারও কাছে এটি পবিত্রতার প্রতীক, কারও কাছে ভেষজ গাছ, আবার কারও কাছে এটি শৈশব ও পূর্বপুরুষের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পরিচিত সবুজ নাম।

আধুনিকতার ভিড়েও হারায়নি তুলসী

একসময় গ্রামের মানুষের ঘরোয়া চিকিৎসাজ্ঞান ছিল মূলত প্রকৃতিনির্ভর। কোন পাতায় কী গুণ, কোন গাছের ছাল কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, কোন শিকড় কখন সংগ্রহ করতে হয়—এ সব জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ত।
সেই লোকজ জ্ঞানের ভাণ্ডারে তুলসী ছিল অন্যতম পরিচিত উদ্ভিদ।

আজকের দিনে সেই চর্চা অনেকটাই কমেছে। তারপরও ফরিদপুরসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামে তুলসীগাছ এখনো মানুষের বাড়ির আঙিনায় টিকে আছে। আধুনিক ওষুধের পাশাপাশি মানুষের সাংস্কৃতিক স্মৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপনের সঙ্গে গাছটি এখনো নীরবে যুক্ত।

‘তুলসী আমাদের কাছে শুধু গাছ নয়’

ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার ময়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কালিপদ চক্রবর্তী বলেন, ‘তুলসী আমাদের কাছে শুধু একটি গাছ নয়, এটি আমাদের ঘর-সংসার, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকা একটি আপন নাম। ছোটবেলায় দেখেছি বাড়ির উঠোনে তুলসীমঞ্চ থাকত, সন্ধ্যায় সেখানে প্রদীপ জ্বলত। আবার অসুখ-বিসুখে বড়রা তুলসীর পাতার কথা বলতেন। সময়ের সঙ্গে চিকিৎসা পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু তুলসীর প্রতি মানুষের যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা—সেটি এখনো আছে। আমার মনে হয়, আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে এ গাছের ভেষজ ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরা দরকার। একটি তুলসীগাছ রোপণ মানে শুধু একটি গাছ লাগানো নয়; এর সঙ্গে যেন আমাদের পুরোনো গ্রামবাংলা, প্রকৃতি ও ঐতিহ্যকেও বাঁচিয়ে রাখা।’

কোনো এক নিভৃত গ্রামের উঠোনে হয়তো এখনো বাতাসে দুলছে তুলসীর পাতা। ভোরের শিশিরে তার শরীর ভিজে উঠছে, সন্ধ্যার প্রদীপে তার ছায়া পড়ছে মাটির উঠোনে। সেই ছোট্ট সবুজ গাছটি যেন সময়ের দুই প্রান্তকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে—একদিকে প্রাচীন ভেষজ জ্ঞান, অন্যদিকে আধুনিকতার ব্যস্ত জীবন।

তুলসী তাই শুধু একটি পাতা নয়—এটি ভেষজ ঐতিহ্যের স্মৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক এবং গ্রামবাংলার উঠোনে টিকে থাকা এক সবুজ ইতিহাস।

তবে ভেষজ ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও গুরুতর বা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় তুলসীকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার না করে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

কেকে/এআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  গ্রামবাংলা   জীবন   সংস্কৃতি   তুলসী  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close