কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামি রাজনৈতিক দলের ঐক্যের খসড়া রূপরেখা নিয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার বাবুনগরে বৈঠক হয়েছে। প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠকে দলগুলোর প্রস্তাব ও সম্ভাব্য ঐক্যকাঠামো নিয়ে আলোচনা হলেও সব বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি। এ অবস্থায় পরবর্তী আলোচনা ও সমন্বয়ের জন্য সাত দল থেকে তিনজন করে সদস্য নিয়ে একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম (বাবুনগর) মাদরাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে সাত দলের ৩৫ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। সাত দলের সম্ভাব্য ঐক্যের কাঠামো, সমন্বিত কর্মপদ্ধতি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কার্যক্রমের খসড়া রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দলগুলোর দেওয়া পৃথক প্রস্তাব পর্যালোচনা করে একটি সমন্বিত খসড়া তৈরি করা হয়েছে। রোববারের বৈঠকে সেটি সাত দলের প্রতিনিধিদের সামনে উপস্থাপন করা হয়।
বৈঠক শেষে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মুফতি জসীমউদ্দিন সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে দেশের আলেমসমাজ ও মুসলিম সমাজের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ইসলামপন্থী দলগুলোকে একটি প্ল্যাটফর্মে এনে একসঙ্গে কাজ করার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। এ লক্ষ্যেই সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার একটি ফর্মুলা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
মুফতি জসীমউদ্দিন বলেন, ‘প্রত্যেক দল তাদের নিজস্ব প্রস্তাব দিয়েছে। হেফাজতে ইসলামের আমির সে সব প্রস্তাব পর্যালোচনা করছেন। রোববারের বৈঠকে প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়। আমিরের পরামর্শে তৈরি করা একটি খসড়া রূপরেখা সাত দলের প্রতিনিধিদের কাছে দেওয়া হয়েছে।’
বৈঠকে সাত দলের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য ২১ সদস্যের লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাতটি দল থেকে তিনজন করে সদস্য এ কমিটিতে থাকবেন। হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান কমিটির নেতৃত্ব দেবেন বলে জানিয়েছেন মুফতি জসীমউদ্দিন।
তিনি জানান, আগামী ২২ অক্টোবর ঢাকায় লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক হবে। সেখানে রোববারের বৈঠকে আলোচিত খসড়া রূপরেখা নিয়ে আরও আলোচনা ও সমন্বয়ের কাজ করা হবে।
বৈঠককে কেন্দ্র করে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রতিনিধিদের গণমাধ্যমে কথা না বলার জন্য হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে বৈঠক শেষে অধিকাংশ নেতা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। পরে মুফতি জসীমউদ্দিন বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করেন।
বৈঠকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী সভাপতিত্ব করেন। মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান, সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা খলিল আহমদ কাসেমী, নায়েবে আমির মুফতি জসীমউদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ ও নায়েবে আমির মাওলানা সালাউদ্দিন নানুপুরী উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমেদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান, খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইজহার, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন রাজী এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজীসহ সংশ্লিষ্ট দলগুলোর নেতারা অংশ নেন।
ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা সাতটি দল হলো ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
কওমি ঘরানার ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হয় গত ১৬ জুলাই। ওই দিন ফটিকছড়ির জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে বৈঠক হয়। সেখানে সাত দলের শীর্ষ নেতারা ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হন। এরপর প্রতিটি দলকে নিজস্ব প্রস্তাব জমা দেওয়ার জন্য ৩ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা ও সমন্বয়ের জন্য হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে সাত সদস্যের একটি উপকমিটি গঠন করা হয়।
হেফাজতে ইসলাম সূত্রে জানা গেছে, ১৬ জুলাইয়ের পর উপকমিটি অন্তত তিনটি বৈঠক করেছে। এর মধ্যে দুটি বৈঠক ঢাকায় এবং একটি চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ ১ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী মাদরাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে দলগুলোর পৃথক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করে একটি সমন্বিত খসড়া রূপরেখা তৈরির কাজ শেষ করা হয়। রোববার ফটিকছড়িতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সেই খসড়া রূপরেখা সাত দলের প্রতিনিধিদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। তবে রূপরেখার সব বিষয়ে একমত হতে পারেনি দলগুলো। ফলে বিষয়গুলো নিয়ে আরও আলোচনা ও সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত হয়। এরই অংশ হিসেবে ২১ সদস্যের লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কেকে/এআই