সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● নানা বিতর্কে আস্থা হারাচ্ছে বিএনপি      ● তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ সংবিধানের দুই অনুচ্ছেদে গণভোট চায় বিএনপি      ● হাম ও ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ গেল ১৫ জনের      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ছয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ২১৫৮       ● হামের উপসর্গে আরও ৯ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩৪১      ● জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে : মন্ত্রী টুকু      ● সায়েন্সল্যাবে ঢাকা কলেজ-আইডিয়াল কলেজ শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ      
আন্তর্জাতিক
আল জাজিরা বিশ্লেষণ
ইরানের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নাকচ, ট্রাম্পের হিসাব কী?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:১৮ এএম
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

ইরানের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের প্রস্তাবে এখনই সম্মতি দেওয়ার চেয়ে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করলে ওয়াশিংটন নিজেদের জন্য তুলনামূলক বেশি সুবিধাজনক শর্ত আদায় করতে পারবে—এমন হিসাব থেকেই ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “তিনি ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, ইরান ‘খুব খারাপভাবে হারছে’ বলেই একটি চুক্তি করতে চাইছে।” তবে তিনি আলোচনায় আগ্রহী হলেও তেহরানের দেওয়া শর্তে কোনো সমঝোতা গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানান।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, “প্রস্তাবের বিষয়ে ট্রাম্পের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া তেহরান দেখেছে। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব এখনো পাওয়া যায়নি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগে কাতার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।”

ইরানের প্রস্তাবে কী ছিল

ইরানের সাত দিনের প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং বিদেশে আটকে থাকা আনুমানিক ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড় করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে লেবানন ও ইয়েমেনসহ বৃহত্তর অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার প্রস্তাবও ছিল।

এর বিনিময়ে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরু করার প্রস্তাব দেয় তেহরান।

প্রস্তাবটির সঙ্গে গত জুনে দুই দেশের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) কিছুটা মিল রয়েছে। তবে চুক্তির শর্ত নিয়ে মতবিরোধের কারণে গত মাসে সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে। এরপর বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ও এর আশপাশে সামরিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি কার্যত ইরানের অবরোধের মধ্যে রয়েছে।

কেন অপেক্ষা করতে চাইছে ওয়াশিংটন

লন্ডনের কিংস কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ আল জাজিরাকে বলেন, “ট্রাম্পের হিসাবটি তুলনামূলক সরল।” তার মতে, নৌ অবরোধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের ওপর চাপ এতটাই বাড়ছে যে তেহরানের নতুন প্রস্তাবকে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সমঝোতার সুযোগের চেয়ে দুর্বলতার প্রকাশ হিসেবে দেখছে।

ক্রিগের মতে, ইরান ‘খুব খারাপভাবে হারছে’—ট্রাম্পের এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট মনে করছেন সময় যত গড়াবে, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান তত শক্তিশালী হবে।

ন্যাটো ডিফেন্স কলেজের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ফেলো রিচার্ড ওয়েইটজও মনে করেন, হোয়াইট হাউস হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করে তেহরানের কাছ থেকে আরও সুবিধাজনক শর্ত আদায়ের চেষ্টা করছে।

তার মতে, ওয়াশিংটনের হিসাব হতে পারে—দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ ইরান সরকারকে আরও ছাড় দিতে বাধ্য করবে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তির আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের ছাড় দেওয়ার প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেন।

অপেক্ষার ঝুঁকিও রয়েছে

তবে সময়ক্ষেপণের কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বিশেষ করে নভেম্বরে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে তা মার্কিন ভোটারদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।

আগস্টের শেষ দিকে রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৩ শতাংশ মার্কিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন এবং ৩১ শতাংশ এর পক্ষে ছিলেন।

ক্রিগের মতে, সময় শুধু ইরানের ওপর চাপ বাড়ায় না, যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও চাপ তৈরি করে। তার ভাষায়, প্রতিটি অতিরিক্ত সপ্তাহে জ্বালানির দাম বাড়ার ঝুঁকি, সামরিক উপস্থিতির চাপ এবং উপসাগরীয় মিত্রদের উদ্বেগও বাড়ছে।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলেন, “ইরানের প্রস্তাবকে ট্রাম্পের জন্য এক ধরনের সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যার মাধ্যমে নির্বাচনের আগে তেল ও গ্যাসের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।”

তবে তিনি মনে করেন, ট্রাম্প প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরও অর্থনৈতিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ইরান পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

হরমুজের বাইরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ওপর চাপ বাড়ালেই যে তেহরান আরও ছাড় দেবে, তার নিশ্চয়তা নেই। বরং সংঘাতের খরচ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে ইরান।

এর মধ্যে হরমুজ প্রণালী, আঞ্চলিক অবকাঠামো এবং ইয়েমেন ও আফ্রিকার শিংয়ের মধ্যবর্তী বাব আল-মান্দাব প্রণালী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-সমর্থিত হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। ফলে বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন, যা পরে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়াবে বলে সতর্ক করেছেন ক্রিগ।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো রস হ্যারিসনের মতে, তেহরান এখন অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার চেয়ে খুব দ্রুত কোনো সমঝোতায় যাওয়ার ঝুঁকিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

আস্থার সংকটও বড় বাধা

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান শনিবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আগের আলোচনার সময় হামলা ও পরবর্তী নিষেধাজ্ঞার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তেহরানের আস্থা নষ্ট হয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোর্তাজাভির মতে, ইরান একই সঙ্গে কূটনীতি ও প্রতিরোধের বার্তা দিচ্ছে। অর্থাৎ দ্রুত সংঘাত বন্ধের প্রস্তাব দেওয়ার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে চাপ মোকাবিলার প্রস্তুতিও দেখাচ্ছে তেহরান।

তার মতে, ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইরানকে আরও ছাড় দেওয়ার বদলে অবস্থান কঠোর করার দিকে ঠেলে দিতে পারে। কারণ অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও ইরান তার মৌলিক স্বার্থ ও ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচিত বিষয়গুলোতে ছাড় দিতে রাজি নাও হতে পারে। দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি আলোচনার অন্যতম প্রধান বিরোধের জায়গা।

সময়কে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা দুই পক্ষেরই

বিশ্লেষক রস হ্যারিসনের মতে, ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান তেহরানের জন্য খুব একটা বিস্ময়কর হওয়ার কথা নয়। তার মতে, ইরানের প্রস্তাবের একটি উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের জনগণ এবং মার্কিন জনসাধারণকে দেখানো যে তেহরান এখনো আলোচনার পথ খোলা রাখছে।

ক্রিগের মতে, ইরান বুঝতে পারছে ট্রাম্প এমন একটি সমঝোতা চান, যেটিকে তিনি রাজনৈতিকভাবে নিজের সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবেন। তাই তেহরানের কৌশল হতে পারে—চাপ বজায় রেখে অপেক্ষা করা এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন আরও বাড়লে সমঝোতার মূল্যও বাড়ানো।

সব মিলিয়ে, বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই মনে করছে সময় তাদের আলোচনার অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। ফলে দ্রুত সমঝোতার বদলে সংঘাত ও কূটনৈতিক চাপ আরও কিছুদিন চলার সম্ভাবনাই সামনে রয়েছে।


সূত্র: আল জাজিরা

কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  ইরান   যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নাকচ   ট্রাম্প   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close