ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) কুষ্টিয়াগামী ডাবল ডেকার বাসে উচ্চস্বরে কথাবার্তা বলা, গল্পগুজব করাকে কেন্দ্র করে সিনিয়র-জুনিয়র মারামারির ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টায় ক্যাম্পাস থেকে কুষ্টিয়াগামী ডাবল ডেকার বাসে আসার পথে কুষ্টিয়া শহরের জেলখানা মোড়ে এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় জুনিয়র শিক্ষার্থীর নাম রিয়াজুল ইসলাম হৃদয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। অন্যদিকে সিনিয়র শিক্ষার্থীর নাম আবু সাঈদ, তিনি আইসিটি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ঘটনায় জুনিয়র হৃদয়ের নাক, কানের নীচে এবং পিঠে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। অপরদিকে আইসিটি বিভাগের আবু সাইদও হাতে আঘাত পেয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ক্যাম্পাস থেকে বাসটি কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর থেকেই আইসিটি বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী বাসের উপর তলায় উচ্চস্বরে কথাবার্তা, গল্পগুজব করছিলেন। এতে ভুক্তভোগী হৃদয়সহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী অস্বস্তি ও বিরক্তি বোধ করেন। বাস থেকে নামার সময় তাদের বিরক্তির বিষয়টি আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের জানিয়ে এধরনের কাজ না করার অনুরোধ জানায় বাংলা বিভাগের হৃদয়ের বন্ধু বাপ্পি ও অন্যরা। এ সময় তারা আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের সেশন জিজ্ঞেস করে বাসে বসে চিল্লাচিল্লি করতে নিষেধ করেন।
এ সময় উভয়েই পরষ্পরের সেশন কতো তা জিজ্ঞেস করলে উভয়ের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে হাতাহাতি মারামারির ঘটনা ঘটে। এতে এ সময় ঘটনার ভিডিও ধারণ এবং অভিযুক্ত আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের পরিচয় জানতে চাওয়ায়, ভিডিও ধারণকারী আরেক শিক্ষার্থীকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও মারধর করা হয়।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে ভুক্তভোগী রিয়াজুল ইসলাম হৃদয় বলেন, গোধূলি বাসের দোতলায় উঠে দেখি কয়েকজন অনেক জোরে চিল্লাচিল্লি করছিল। আমার বন্ধু বাপ্পি নামার সময় তাদের অনুরোধ করে বলে— ‘ভাই, এভাবে চিল্লাচিল্লি না করলে ভালো হয়, অনেকের সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু তারা কোনো কথা না শুনে উল্টো রেগে গিয়ে বলে— ‘তুই কে? তুই আমারে চিনিস?’ বাপ্পি তাদের সেশন জানতে চাইলে তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি খারাপ দেখে আমি বাপ্পিকে সেখান থেকে সরে যেতে বলি। কিন্তু তারা বাপ্পিকে আটকে ধরে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকে। তখন আমি বলি— ‘ভাই, ওকে এভাবে বলছেন কেন? ও তো ঠিক কথাই বলছে, আমার নিজেরই তো মাথায় যন্ত্রণা করছে।’ এ কথা শুনে তারা আমার ওপর চড়াও হয় এবং অনেক ধমকাতে থাকে। আমি তাদের জানাই যে বাপ্পি আমার বন্ধু, তাই আমি কথা বলছি।
তখনই তাদের তিনজন বন্ধু আমাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কা খেয়ে আমি দোতলার জানালার কাঁচের ওপর গিয়ে পড়ি। কাঁচ ভেঙে আমার কাঁধ কেটে গিয়ে প্রচণ্ড রক্তপাত শুরু হয়। ওই অবস্থায় পড়ে থাকার পরও তারা আমাকে ঘাড়ে ও মুখে এলোপাতাড়ি ঘুসি মারতে থাকে, এতে আমার নাক কেটে যায় ও আঘাতপ্রাপ্ত হই। এ সময় বাপ্পি পুরো ঘটনার ভিডিও করার জন্য মোবাইল ফোন বের করলে, অন্য একজন এসে তার ফোন কেড়ে নেয়, কলার ধরে এবং তাকে চড় মারে। পরবর্তী বাসের অন্য যাত্রীরা আমাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ক্যাম্পাস খুললেই আমরা প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করে এর সুষ্ঠু বিচার চাইব।
তবে অভিযোগকে ‘অতিরঞ্জিত’ দাবি করে আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বলেন, ‘আমরা ডাবল ডেকার বাসে ক্যাম্পাস থেকে আসার সময় গল্প করছিলাম। বাসটি যখন জেলখানা মোড়ে পৌঁছায়, তখন নামার মুহূর্তে এক জুনিয়র শিক্ষার্থী এসে আমাদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করে এবং বলে—তোমাদের কোনো ম্যানার নেই। একথা বলার কারণ জিজ্ঞেস করলে আমাদের কথাবার্তায়, গল্পে তাদের অসুবিধা হওয়ার বিষয়টি জানায়। আমরা তাকে আগেই বিষয়টি জানাতে পারতেন কিনা জিজ্ঞেস করলে সে তর্ক শুরু করে। যার সাথে কথা-কাটাকাটি হচ্ছিল, সে একপর্যায়ে নেমেও যায়।’
তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, ‘মূল ঘটনা ঘটেছিল অন্য জায়গায়। পেছন থেকে অন্য একটি ছেলে এসে আমাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বাসের গ্লাসের ওপর ফেলে দেয়। এতে আমার দুটি হাতই মারাত্মকভাবে জখম ও কেটে যায় এবং পরে সদর হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। আমার সঙ্গে যার কথা-কাটাকাটি হয়েছে, সে আমাকে কোনো আঘাত করেনি; আঘাত করেছে পেছন থেকে আসা সম্পূর্ণ অচেনা অন্য একটি ছেলে। আমরা তাদের সেশন জিজ্ঞেস করলে তারা উল্টা আমাদের সেশন জিজ্ঞেস করে আমরা সেশন ২১-২২ বলার পরে তারা তাদের সেশনটি বলেনি। আমরা সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও তারা আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে। বিষয়টিকে জুনিয়র মারধরের নাটক বানিয়ে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনাটি আমি শুনেছি। এ বিষয়ে দুই বিভাগের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা হয়েছে। পরবর্তী তাদের সঙ্গে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কেকে/এআই