সেতু আছে, কিন্তু পারাপারের উপায় নেই। নির্মাণের দীর্ঘ পাঁচ বছর পার হতে চললেও মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার লাঘাটা নদীর ওপর চার কোটি টাকা ব্যয়ের সেতুটির কাজ আজও অসম্পূর্ণ। দুই পাশে সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) না থাকায় প্রায় চার কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি জনগণের কোনো কাজেই আসছে না।
ফলে রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের দক্ষিণ ইসলামপুরসহ ১২টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষকে প্রতিদিন চরম ঝুঁকি নিয়ে ডিঙ্গি নৌকা ও নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে।
উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কামারচাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-ধলাই খেয়াঘাট সড়কের আওতাধীন লাঘাটা নদীর ওপর ৬০ মিটার দীর্ঘ আরসিসি সেতুটির নির্মাণকাজ ২০২০ সালের ৬ জুলাই শুরু হয়। ১ কোটি টাকা বাজেটের এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৪ কোটি ৪ লাখ ৩ হাজার ৪৪৯ টাকা।
চুক্তি অনুযায়ী, ২০২১ সালের ১৮ নভেম্বরের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘প্রিন্স মামুন (জেভি)’-র কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে আরও প্রায় চার বছর অতিবাহিত হলেও সেতুটি চলাচলের উপযোগী করতে পারেনি ঠিকাদার।
সরেজমিনে দেখা যায়, মূল সেতুর কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকলেও দুই প্রান্তে সংযোগ সড়ক না থাকায় ব্রিজটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো পড়ে আছে। এতে দক্ষিণ ইসলামপুর, খাস প্রেমনগর, মিটিপুর, ভোলা নগর, শ্যামেরকোনা, নওয়াগাঁও, আলালপুর, হাটিকরাইয়া, গোবিন্দপুর ও কালইকুনাসহ অন্তত ১২টি গ্রামের অধিবাসীরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, প্রবীণ ব্যক্তি এবং মুমূর্ষু রোগীদের জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নিতে চরম বেগ পেতে হচ্ছে। এ ছাড়া কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া ও ব্যবসার মালামাল পরিবহনে স্থানীয়দের খরচ ও সময়–দুটোই দ্বিগুণ লাগছে।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যবসায়ী মুজিব মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘সেতুটি চালুর আশায় ছিলাম, কিন্তু কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও আমাদের দুঃখ ঘুচলো না। বর্ষাকালে নৌকা আর সাঁকোই আমাদের একমাত্র ভরসা।’
কাজের ধীরগতির বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘প্রিন্স মামুন (জেভি)’-এর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মুঠোফোনে বারবার চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুমে প্রয়োজনীয় মাটি সংগ্রহ করতে না পারায় সংযোগ সড়কের কাজ দীর্ঘদিন ধরে আটকে ছিল। পাশাপাশি জমি অধিগ্রহণের একটি পরিকল্পনা নেওয়া হলেও পরবর্তীতে আইনি জটিলতার কারণে সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদ্যমান অবস্থাতেই অ্যাপ্রোচ রোডের কাজ সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহ বা আগামী সপ্তাহের মধ্যেই সংযোগ সড়কের মাটির কাজ শুরু হতে পারে বলে আশ্বস্ত করেছে রাজনগর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
এ বিষয়ে রাজনগর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) আব্দুল গনি দৈনিক খোলা কাগজকে বলেন, ‘মূল সেতুর কাজ প্রায় শেষ হলেও বর্ষার কারণে মাটি না পাওয়ায় সংযোগ সড়কের কাজ বিলম্বিত হয়েছে। জমি অধিগ্রহণেও কিছু আইনি জটিলতা রয়েছে। তাই বর্তমান অবস্থাতেই আমরা সংযোগ সড়ক বা অ্যাপ্রোচের কাজ সম্পন্ন করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঠিকাদার পটুয়াখালী জেলার বাসিন্দা হওয়ায় দু-এক দিনের মধ্যে তিনি এলাকায় পৌঁছাবেন। আশা করা যাচ্ছে, চলতি সপ্তাহের মধ্যে সম্ভব না হলেও আগামী সপ্তাহের মধ্যেই মাটির কাজ পুরোদমে শুরু হয়ে যাবে।’
এদিকে সরকারি বিপুল অর্থ খরচের পরও সেতুর সুফল না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী। তারা অনতিবিলম্বে সকল আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে দ্রুত সেতুটি চালুর জোর দাবি জানান।
কেকে/এআই