দুই পা অচল, তবুও থেমে নেই জীবন। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না, অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরাও কঠিন। কিন্তু সংসারের চাকা সচল রাখতে প্রতিদিনই তাকে উঠতে হয় উঁচু উঁচু গাছে। কোমরে বাঁধা প্রায় ৪০ ফুটের দড়ি আর হাতে ধারালো দা—এই দুটিই তার ভরসা। দড়ির সাহায্যে গাছের ডালে উঠে একের পর এক ডালপালা ছাঁটাই করেন কামাল হোসেন। শরীরের অক্ষমতাকে পাশে সরিয়ে জীবিকার তাগিদে বছরের পর বছর ধরে এভাবেই গাছের ডালে ডালে লড়াই করে চলেছেন তিনি।
সকাল হলেই মোটরচালিত ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি ঘুরে খোঁজেন গাছ ছাঁটাইয়ের কাজ। কাজ মিললেই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কোমরে দড়ি বাঁধেন। দড়ির একাংশ গাছের কাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে শরীরের ওপরের অংশের শক্তি দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে যান ওপরে। এরপর এক হাতে দড়ি ধরে অন্য হাতে দা চালিয়ে কাটতে থাকেন ডালপালা। কাজ শেষে সেই দড়ি ধরেই নেমে আসেন নিচে।
দেখলে মনে হতে পারে, এটি কোনো প্রশিক্ষিত গাছ কাটার শ্রমিকের কাজ। অথচ এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি করে আসছেন দুই পা অচল একজন মানুষ। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের পং মসূয়া খাঁ বাড়ির বাসিন্দা কামাল হোসেনের বয়স প্রায় ৪০ থেকে ৪২ বছর। ছোটবেলা থেকেই তাঁর দুই পা অচল। প্রায় ৩০ বছর ধরে গাছ ছাঁটাইয়ের কাজ করে স্ত্রী, সন্তান ও বাবার দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
শৈশব থেকেই প্রতিবন্ধকতা
কামাল হোসেন ওই এলাকার আব্দুল হেকিম খাঁর ছেলে। ছোটবেলা থেকেই দুই পা অচল হওয়ায় অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেননি। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের কোলে কিংবা অন্যের সাহায্যে চলতে হতো তাকে। মাটিতে নামিয়ে দিলে হামাগুড়ি দিয়ে চলতেন। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা তৈরি হয় তার মধ্যে। প্রায় ১০ বছর বয়সে বাবার কাছ থেকেই গাছ ছাঁটাইয়ের কাজ শেখা শুরু করেন। প্রথমে ছোট গাছ ও ডালপালা কাটতেন। তখন দিনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আয় হতো।
ধীরে ধীরে গাছে ওঠা, দড়ি বাঁধা, শরীরের ভারসাম্য রাখা এবং দা দিয়ে ডাল কাটার কৌশল আয়ত্ত করেন। ছোট গাছ থেকে মাঝারি, পরে বড় বড় গাছেও উঠতে শুরু করেন। এভাবেই কেটে গেছে প্রায় তিন দশক।
দড়িই তার ভরসা
কামালের কাছে প্রায় ৪০ ফুট লম্বা দড়িটি শুধু কাজের সরঞ্জাম নয়, জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। বড় গাছে উঠতে এই দড়িই তার ভরসা। দুই পা স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করতে না পারায় গাছে ওঠার প্রতিটি মুহূর্তই তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য ভুল, ভারসাম্য হারানো কিংবা দড়ির কোনো সমস্যা বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তবু পরিবারের কথা ভেবে প্রতিদিন সেই ঝুঁকি নিয়েই কাজে বের হন তিনি।
গাছের উঁচু ডালে পৌঁছে এক হাতে দড়ি ধরে অন্য হাতে দা চালিয়ে ডালপালা কাটেন। অনেক সময় এত উঁচুতে উঠতে হয় যে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষেরই ভয় লাগে। অথচ কামাল সেখানে বসেই কাজ চালিয়ে যান।
অনিয়মিত আয়েই চলে সংসার
গাছ ছাঁটাই করে প্রতিদিন নির্দিষ্ট আয় হয় না কামাল হোসেনের। গাছের আকার, কাজের ধরন ও গৃহস্থের সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে পারিশ্রমিক। কোনো দিন ৮০০ টাকা, কোনো দিন ৭০০ বা ৫০০ টাকা আয় হয়। আবার কোনো দিন সারাদিন কাজ করেও ৩০০ টাকার বেশি আয় হয় না। অনেক দিন কাজও জোটে না।
নিজের মোটরচালিত ভ্যান নিয়ে আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে কাজ খোঁজেন তিনি। পরিচিত কেউ খবর দিলে সেখানে ছুটে যান। কখনো নিজেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে গাছ ছাঁটাইয়ের কাজ চান।
সংসারের ভারও তার কাঁধে
কামাল হোসেন বিবাহিত। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের বাবা তিনি। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। অন্য সন্তানদের পড়াশোনা চলছে। এর পাশাপাশি বৃদ্ধ ও অসুস্থ বাবার দেখাশোনা ও চিকিৎসার দায়িত্বও তার ওপর। কিছুদিন আগে মারা গেছেন তার মা। কোনো ভাই না থাকায় পরিবারের দায়িত্ব আরও বেশি তার কাঁধে। অনিয়মিত আয়ে সংসারের খরচ, সন্তানদের পড়াশোনা ও বাবার চিকিৎসা চালাতে অনেক সময় ধারদেনা করতে হয় তাঁকে।
তবে ভিক্ষা করে বাঁচতে চান না কামাল। নিজের শ্রমে উপার্জন করে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে চান তিনি।
কামাল হোসেন বলেন, “আমার দুই পা অচল। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মা অনেক কষ্ট করে আমাকে লালন-পালন করেছেন। প্রায় ১০ বছর বয়সে বাবার কাছ থেকে গাছের কাজ শেখা শুরু করি। প্রথমে ছোটখাটো কাজ করতাম। পরে ধীরে ধীরে বড় গাছে ওঠা শিখেছি।”
তিনি বলেন, “কোনো দিন ৮০০ টাকা পাই, কোনো দিন ৭০০, ৫০০ বা ৩০০ টাকা হয়। সব সময় কাজও থাকে না। গৃহস্থরা যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা দেন। এই আয় দিয়েই সংসার চালাতে হয়।”
গাছে ওঠার ঝুঁকি প্রসঙ্গে কামাল বলেন, “বেশিরভাগ বড় গাছেই আমি দড়ি দিয়ে উঠি। গাছে উঠতে অনেক কষ্ট হয়, শরীরেও ব্যথা লাগে। তারপরও মনোবল শক্ত থাকায় এতদিন কাজটা করে আসতে পেরেছি।”
ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরেও আগের মতো শক্তি নেই। আগে যেভাবে বড় বড় গাছে উঠতে পারতাম, এখন ততটা পারি না। আর কতদিন এভাবে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে পারব, জানি না।”
তিনি বলেন, “আমার নিজের কোনো পুঁজি নেই। সরকার যদি আমাকে সহযোগিতা করে কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে নিজের পরিশ্রমে সংসার চালাতে পারব। আমি কারও কাছে ভিক্ষা চাই না; কাজ করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই।”
‘কামালের মতো মানুষ দেখিনি’
প্রতিবেশী নজরুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই কামালের দুই পা অচল। প্রায় ১০ বছর বয়সে গাছে ওঠা শুরু করেন তিনি। প্রথমে ছোট ডালপালা ছাঁটাই করলেও ধীরে ধীরে বড় বড় গাছে ওঠার দক্ষতা অর্জন করেন। তবে অনেক প্রতিবন্ধী মানুষ দেখেছি, কিন্তু কামালের মতো মানুষ দেখিনি। সে কারও কাছে হাত পাততে চায় না। নিজের শ্রমে উপার্জন করে সংসার চালাতে চায়। কামালের জন্য ছোট কোনো দোকান কিংবা স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে তাঁর জীবন অনেকটা সহজ হতো।
স্থানীয় ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, “দুই পা অচল হওয়ায় কামাল স্বাভাবিকভাবে গাছে উঠতে পারে না। দড়ির সাহায্যে সে অনেক বড় বড় গাছে ওঠে। আমরা তাকে গাছে উঠতে দেখে সত্যিই অবাক হয়ে যাই। অনেক সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষও এত বড় গাছে উঠে কাজ করতে ভয় পাবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল জব্বার বলেন, “দুই পা অচল হওয়ার পরও কামাল অনেক কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছে। তার বাবা বৃদ্ধ ও অসুস্থ। সংসারের দায়িত্ব মূলত তার ওপর। সরকারের পক্ষ থেকে তার জন্য একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা দরকার।”
গাছে উঠতে দেখলে ভয় পান স্ত্রী
কামালের স্ত্রী পারভিন আক্তার বলেন, “আমার স্বামী দুই পা দিয়ে হাঁটতে পারেন না। তারপরও সংসারের জন্য প্রতিদিন কাজ করতে বের হন। বড় বড় গাছে দড়ি বেঁধে উঠে ডালপালা কাটেন। তাকে গাছে উঠতে দেখলে আমাদেরও ভয় লাগে। কখন কী হয়, সেই চিন্তায় থাকি।”
তিনি বলেন, “কিন্তু কাজ না করলে সংসার চলবে না। তার আয় দিয়েই সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা ও শ্বশুরের চিকিৎসার খরচ চালাতে হয়। এখন বয়সও বাড়ছে, আগের মতো শরীরে শক্তি নেই। সরকার যদি তাকে কোনো স্থায়ী কাজ বা ছোট ব্যবসার ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে আমাদের কষ্ট অনেকটাই কমবে।”
সহায়তার আশ্বাস সমাজসেবা কর্মকর্তার
কটিয়াদী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আবুল খায়ের বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও কামাল নিজের শ্রম ও ইচ্ছাশক্তি দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিনি সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, “কামালকে ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে গাছ ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের পাশাপাশি কোনো ছোট ব্যবসা বা আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিয়মিত আয় করতে পারেন।”
আবেদন করলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, কামাল কর্মসংস্থানের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
তিনি বলেন, “তার শারীরিক সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোন কাজ উপযোগী হবে, সেটি বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব। তিনি ছোট কোনো ব্যবসা করতে চাইলে, যেমন চায়ের দোকান বা অন্য কোনো দোকান, সেক্ষেত্রেও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।”
ইউএনও আরও বলেন, “কামাল সরাসরি উপজেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করতে পারেন। তাঁর প্রয়োজন ও সক্ষমতা অনুযায়ী যথাসাধ্য সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।
কেকে/সাশ