বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬,
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বৈঠকে যোগদান প্রধানমন্ত্রীর       ● ভারতের কাছে পানির ন্যায্য হিস্যা চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী      ● প্রবাসী আয়ে জোয়ার : ছয় দিনে এল ৭,৭৪৯ কোটি টাকা      ● ১০ উড়োজাহাজ কিনতে এয়ারবাসের সঙ্গে বিমানের চুক্তি সই      ● ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অধিকার নিশ্চিত করতে চায় সরকার : প্রধানমন্ত্রী      ● অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে জেট ফুয়েলের দাম লিটারে বাড়ল ১৭ টাকা      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘন্টায় ৮ মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ২৮৯      
দেশজুড়ে
অটোর দাপটে বদলে যাচ্ছে বিয়ানীবাজার, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
বিয়ানীবাজার (সিলেট) প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৩৩ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

সন্ধ্যার পর কাজ শেষে ছোট্ট ঘরে ফিরেই মেয়ের কাশির শব্দ শুনতে পান আসিয়া। সারাদিন মানুষের বাসায় কাজ করে ক্লান্ত শরীরটা তখন একটু বিশ্রাম চায়। কিন্তু ছয় বছরের আইমুনার কাশি শুনলেই সেই ক্লান্তি যেন উধাও হয়ে যায়। মেয়েকে নিয়ে ছুটতে হয় চিকিৎসকের কাছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানান, আইমুনার শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরে সিসা প্রবেশ করছে। কিন্তু সেই সিসা আসছে কোথা থেকে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে তাদের ঘরের পাশের একটি অটোরিকশার গ্যারেজের কথা।

নয়াগ্রামের ওই গ্যারেজে রয়েছে ৩০টিরও বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। প্রতিদিন সেখানে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়, গাড়ি ঢোকে-বের হয়। অথচ গ্যারেজের আশপাশে বসবাসকারী মানুষের অনেকেই জানতেন না, ব্যাটারির সঙ্গে যুক্ত সিসাজাতীয় উপাদান পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আইমুনার ঘটনা তাই শুধু একটি শিশুর অসুস্থতার গল্প নয়। এটি বিয়ানীবাজারের দ্রুত বদলে যাওয়া নগরজীবনের একটি প্রতিচ্ছবি। মানুষের চলাচল সহজ করতে বাড়ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান, বদলে যাচ্ছে পেশা; একই সঙ্গে বাড়ছে যানজট, সড়ক বিশৃঙ্খলা, ব্যাটারি বর্জ্য ও সম্ভাব্য পরিবেশগত ঝুঁকি। সহজ ও সাশ্রয়ী যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করলেও এই বাহনের দ্রুত বিস্তার এখন নতুন করে সামনে আনছে নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন।

বিয়ানীবাজার পৌরশহর থেকে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন—প্রায় সর্বত্রই এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপট। শহরের অলিগলি, বাজার, প্রধান সড়ক ও আবাসিক এলাকার রাস্তায় দিনভর চলাচল করছে এসব যান। অটোরিকশার সংখ্যা কত, তার সঠিক হিসাব নেই। সরকারি বা স্থানীয় পর্যায়েও এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো পরিসংখ্যান সহজে পাওয়া যায় না। তবে সড়কে এসব বাহনের উপস্থিতি দেখলেই বোঝা যায়, কয়েক বছর আগের তুলনায় এর সংখ্যা কতটা বেড়েছে।

শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও এখন অটোরিকশা জড়িয়ে গেছে। মালিক, চালক, গ্যারেজকর্মী, ব্যাটারি চার্জিং ব্যবসা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি নতুন অর্থনৈতিক বলয়। অনেক পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে অটোরিকশা। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তারের কারণে সেই অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের সমস্যা।

অটোরিকশা শুধু সড়কের চিত্র বদলায়নি, বদলে দিয়েছে মানুষের পেশার ধরনও। তুলনামূলক সহজে কাজ পাওয়া এবং প্রতিদিন হাতে নগদ টাকা আসার কারণে বিভিন্ন পেশার মানুষ আগের কাজ ছেড়ে অটোরিকশা চালানোর দিকে ঝুঁকছেন। পৌরশহরের দাসগ্রামের বাসিন্দা বাবুল একসময় ট্রাকের হেলপার ছিলেন। প্রতিদিন প্রায় ৮০০ টাকা আয় করতেন। এখন অটোরিকশা চালিয়ে প্রতিদিন ১ হাজার টাকার কম নিয়ে বাড়ি ফেরেন না বলে জানান তিনি।

ট্রাকের হেলপারের কাজ ছেড়ে অটোরিকশা চালানোর কারণ জানতে চাইলে বাবুল বলেন, ‘বাসের হেলপার হয়ে মালামাল ওঠানামা করতে ভালো লাগে না। অটো রাত ১০টার মধ্যে বন্ধ করে বাসায় ফিরতে পারি।’

ফতেহপুরের একটি কনফেকশনারিতে কাজ করতেন সাইদুল। সেই চাকরি ছেড়ে এখন তিনি অটোরিকশা চালান। সাইদুলের চলে যাওয়ায় আক্ষেপ করে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক বলেন, ‘আমার ভালো সেলসম্যানটা চলে গেল।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এমন ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। অটোরিকশা চালিয়ে তুলনামূলক ভালো আয় করার সুযোগ থাকায় বিভিন্ন পেশার মানুষ এ কাজে আসছেন। ফলে স্থানীয় শ্রমবাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। একদিকে অটোরিকশা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে, অন্যদিকে কিছু ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানে দক্ষ বা অভিজ্ঞ কর্মী ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

অটোরিকশার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্ট। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য গ্যারেজ। কোথাও একই স্থানে কয়েকটি গাড়ি রাখা হচ্ছে, আবার কোথাও সারি করে বসানো হয়েছে ব্যাটারি চার্জিংয়ের ব্যবস্থা। প্রতিটি অটোরিকশার জন্য নিয়মিত ব্যাটারি চার্জ করতে হয়। ফলে গাড়ির সংখ্যা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে চার্জিংয়ের প্রয়োজনীয়তা। এসব চার্জিং পয়েন্টে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে।

অটোরিকশার মোট সংখ্যা এবং চার্জিং পয়েন্টের সুনির্দিষ্ট হিসাব না থাকায় এ খাতে মোট কত বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে, তারও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। ফলে একদিকে অটোরিকশার দ্রুত বিস্তার, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বাড়তি চাপ—দুটি বিষয়ই এখন আলোচনায় আসার দাবি রাখে।

তবে এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো ব্যাটারি। এসব যানবাহনে সাধারণত লেড-অ্যাসিড বা সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়। একটি ব্যাটারিতে থাকা সিসা ব্যবহারের সময় সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ না করলেও ব্যাটারি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, পরিবর্তন করা, মেরামত বা পুরোনো ব্যাটারি যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করার সময় সিসাজাতীয় উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিসার দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিয়ানীবাজারের চিকিৎসক ডা. আবু ইসহাক আজাদও এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তার মতে, ব্যাটারির ক্ষতিকর উপাদান কখন মানুষের নাক-মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করছে, অনেক সময় তা বোঝার উপায় থাকে না।

তবে আইমুনার অসুস্থতার সঙ্গে পাশের গ্যারেজের ব্যাটারির সিসার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পরিবেশগত নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দিষ্ট তদন্ত প্রয়োজন। এ ধরনের বৈজ্ঞানিক যাচাই ছাড়া কোনো একটি উৎসকে তার অসুস্থতার একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। ফলে আইমুনার ঘটনা যেমন উদ্বেগ তৈরি করছে, তেমনি এই ঘটনা ঘিরে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনছে।

অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়কে শৃঙ্খলার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। শহরের বিভিন্ন মোড়ে একসঙ্গে অনেক অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকায় যান চলাচলে বাধা তৈরি হচ্ছে। কোথাও যাত্রী ওঠানামার জন্য নির্দিষ্ট স্থান নেই। কোথাও রাস্তার ওপরই গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো মোড়ে একসঙ্গে অনেক অটোরিকশা জমে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।

পথচারীদের অভিযোগ, কিছু অটোরিকশা দ্রুতগতিতে চলাচল করায় রাস্তা পারাপারের সময় ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে ব্যস্ত সড়কে শিশু, বয়স্ক ও স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। মালিক ও চালকদের মধ্যে বিরোধ, পার্কিং নিয়ে সমস্যা এবং রুট ব্যবস্থাপনার অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। ফলে যে বাহন মানুষের চলাচল সহজ করার কথা, সেটিই কখনো কখনো সড়কে বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

অটোরিকশার সহজলভ্যতা মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের অভ্যাসেও পরিবর্তন আনছে। আগে যে দূরত্ব মানুষ হেঁটে যেতেন, এখন সেই দূরত্বও অনেকে অটোরিকশায় পাড়ি দিচ্ছেন। ডা. আবু ইসহাক আজাদের মতে, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মানুষের শারীরিক সুস্থতার ওপর পড়তে পারে। সহজে ও দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধার কারণে হাঁটার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। ফলে দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণও কমতে পারে।

অবশ্য ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ইতিবাচক দিকও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। স্বল্প দূরত্বে দ্রুত যাতায়াত, অপেক্ষাকৃত কম খরচে চলাচল এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে এই বাহন। বাবুলের মতো চালকের কাছে এটি একটি জীবিকার নিশ্চয়তা। সাইদুলের মতো অনেকের কাছে এটি আগের চাকরির চেয়ে বেশি আয়ের সুযোগ। যাত্রীদের কাছেও এটি সহজ ও দ্রুত পরিবহনের মাধ্যম।

সমস্যা তৈরি হচ্ছে তখনই, যখন এই বিস্তার কোনো পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা, পুরোনো ব্যাটারি কোথায় যাচ্ছে, চার্জিং পয়েন্ট কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, গ্যারেজ আবাসিক এলাকার কতটা কাছে থাকা উচিত, সড়কে অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড বা রুট থাকবে কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখন প্রয়োজন।

বিয়ানীবাজারের দ্রুত পরিবর্তনের গল্পে আইমুনার কাশি হয়তো একটি ছোট ঘটনা। কিন্তু সেই কাশির ভেতর লুকিয়ে আছে বড় একটি প্রশ্ন—শহরের উন্নয়ন ও মানুষের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে আমরা কি নতুন কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছি?

একদিকে অটোরিকশা মানুষের চলাচল সহজ করছে, কর্মসংস্থান তৈরি করছে, বহু পরিবারের আয় বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ছে গ্যারেজ, চার্জিং পয়েন্ট, পুরোনো ব্যাটারি এবং সড়কে যানবাহনের চাপ। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়েই বিয়ানীবাজারকে খুঁজতে হবে একটি টেকসই সমাধান।

অটোরিকশা বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। প্রয়োজন পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। প্রয়োজন অটোরিকশার সংখ্যা ও রুটের সঠিক তথ্য, নির্দিষ্ট পার্কিং ও চার্জিং ব্যবস্থা, পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সম্ভাব্য স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাও জরুরি।

কারণ, শহরের গতি যতই বাড়ুক, সেই গতির নিচে যেন চাপা না পড়ে আইমুনাদের মতো শিশুদের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা। বিয়ানীবাজারের সামনে এখন সেই ভারসাম্য তৈরির চ্যালেঞ্জই সবচেয়ে বড়—উন্নয়নের গতি থাকবে, কিন্তু সেই গতির মূল্য যেন মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে দিয়ে দিতে না হয়।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close