দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম ও প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার এই মেগা প্রকল্পটির প্রথম ইউনিটে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক সফল বিক্রিয়া শুরু হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে এই পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়। এটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে যাওয়ার বড় ধরনের অগ্রগতি, যাকে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’।
গত ২৮ এপ্রিল রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি বা ফুয়েল লোডিং শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। কিন্তু কারিগরি ত্রুটির কারণে কমিশনিং কার্যক্রম দুই মাসের বেশি সময় পিছিয়ে যায়। বি-২ লাইসেন্স পাওয়ার মাধ্যমে সেই বাধা দূর হলো। গতকাল রোববার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন শুরুর পর প্রাথমিকভাবে ৩ শতাংশ থেকে ধাপে ধাপে ২০-৩০ শতাংশে উন্নীত করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়া হবে। আগামী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে এই কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। এখানে উৎপাদন শুরু হলে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ধীরে ধীরে কমে আসবে। এরপর প্রায় ৭-৮ মাস পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলতে পারে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হলে বাংলাদেশ বিশ্বে ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।
গত বৃহস্পতিবার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া (ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি) শুরুর অনুমতি দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা)। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে এই প্রক্রিয়াকে ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ বলা হয়।
বায়রার চেয়ারম্যান ড. মো. মাহমুদুল হাসান জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য চূড়ান্ত বিদ্যুৎ অনুমোদন অর্থাৎ ‘বি-টু’ অনুমোদনের বিষয়টি এখন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বি-১ শেষ করে এখন বি-টুতে যাওয়ার সম্মতি দেওয়া হয়েছে এবং এটি শেষ হলে পরবর্তী ‘সি’ ও ‘ডি’ ধাপগুলো এগিয়ে নেওয়া হবে। সবকিছু মিলিয়ে বি-টু পর্বের কাজ দ্রুত শেষ হবে আশা প্রকাশ করে তিনি জানান, এই বি-টু পর্ব তাড়াতাড়ি শেষ হবে আশা করি। সব মিলিয়ে ধরেন দুই-তিন মাস। এরপর রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। তখন আমরা ৩০০ মেগাওয়াট পাব।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, প্রথম ইউনিটের অটোমেটিক প্রেশার রিলিফ সেফটি ভালভের (পিওআরভি/পিওএসভি) জটিলতার কারণে অনুমোদনটি আটকে ছিল। পরবর্তীতে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল এসে সমস্যার সমাধান করে এবং বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ফলে আগামী ডিসেম্বরের শেষে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
রূপপুরের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। বায়রার অনুমতির মাধ্যমে রিঅ্যাক্টরে একটি স্থিতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হয়েছে, যা কেন্দ্রটিকে স্থির অবস্থা থেকে সক্রিয় অপারেশনাল পারমাণবিক স্থাপনায় রূপান্তর শুরু করেছে। ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরকে তার পূর্ণ নির্ধারিত তাপীয় ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিস্তরে পরিচালনা করে ইনিশিয়াল ক্রিটিক্যালিটিতে নেওয়া হবে। এ সময় রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন সিস্টেম, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সরঞ্জাম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, যাতে ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে।
রূপপুর প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, মেয়াদ বাড়ানোর কারণে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ না থাকলেও ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্প ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। কেন্দ্রটির প্রাথমিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। পরবর্তী সময়ে তা আরও ২০ থেকে ৩০ বছর বাড়ানো সম্ভব। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পরমাণু শক্তি করপোরেশন ‘রোসাটম’-এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট এটি নির্মাণ করছে।
বাণিজ্যিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হওয়ার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হবে। অবশেষে দেশের বৃহত্তম এই বিদ্যুৎ প্রকল্পের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
কেকে/ এমএস