সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিক্রিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ লেনদেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে উঠে আসছে স্থানীয় সংসদ সদস্য, সরকার দলের প্রভাবশালী নেতা ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নাম। এরমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংসদ সদস্যের ছেলে ও নিকটাত্মীয়দের ডিলারশিপ পাওয়া নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।
ফরিদপুরের নগরকান্দায় ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন অর্ধশতাধিক আবেদনকারীরা। এ ছাড়া নাটোরের লালপুরে নিয়মবহির্ভূতভাবে সাব-ডিলারের কাছে সার বিক্রির দায়ে এক ডিলারকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অন্যদিকে, কুষ্টিয়ায় সার ডিলার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের শাস্তি দাবি করেছেন সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এমপির ছেলে ও আত্মীয়দের ডিলারশিপ :
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পর থেকে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসকের কাছেও লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। জেলা প্রশাসক সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি।
অভিযোগ উঠেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের তিনটি ইউনিয়নে সার ডিলারশিপ পেয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে ও নিকটাত্মীয়রা। তথ্যমতে, উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নে এমপি হান্নানের ছেলে আদনান সাদী মেসার্স আলীয়াহ ট্রেডার্সের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন। নাসিরনগর সদর ইউনিয়নে তার আপন বোনজামাই আরক মিয়া মেসার্স আয়ান ট্রেডার্সের নামে এবং গোয়ালনগর ইউনিয়নে আপন ভাগ্নে শরীফের স্ত্রী নুরুন্নাহার আক্তার স্বর্ণা এস এস ট্রেডার্সের নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন।
এমপির ছেলে ও আত্মীয়স্বজনের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনও নিশ্চিত করেছে। তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
নাসিরনগর ছাড়াও জেলার অন্যান্য উপজেলায় ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ১০১টি ইউনিয়ন ও পাঁচটি পৌরসভায় ১০৬টি সার ডিলারশিপের বিপরীতে আবেদন করেন ৮২৫ জন। তাদের মধ্য থেকে ২৯২ জনের আবেদন সুপারিশ করে সার ডিলার-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানো হয়।
প্রত্যেক ইউনিয়নের ডিলার নিয়োগের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিনজনের নাম সুপারিশ করে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি। এর আগে সেপ্টেম্বরে ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জেলা কমিটি। আবেদনগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠানো হয়। যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য তিনজনের নাম পাঠানো হয়। তবে তালিকায় তিনজনের মধ্যে প্রথম স্থানে নাম রাখার জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান বলেন, উপজেলা থেকে প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য যে নামগুলো পাঠানো হয়েছে, সেগুলোই সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। দুই-একটি ক্ষেত্রে শুধু এদিক-সেদিক হয়েছে।
ডিলারশিপ পাইয়ে দিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি এটি করিনি বা অন্য কেউ করেছে, এমন অভিযোগ আমার জানা নেই। উপজেলায় তালিকার ব্যাপারে হয়তো হস্তক্ষেপ থাকতে পারে।’ এ সময় ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পর জেলা প্রশাসকের কাছে কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়েছে বলেও জানান তিনি।
ফরিদপুরে ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেন :
ফরিদপুরের নগরকান্দায় সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ লেনদেন ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলেছেন ডিলারশিপ থেকে বঞ্চিত অর্ধশতাধিক আবেদনকারী। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করেও ডিলারশিপ না পাওয়ার অভিযোগ তুলে নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
গতকাল রোববার সকালে নগরকান্দা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন বঞ্চিত আবেদনকারীরা। তাদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শাহীন মুন্সী। বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণকারী আবেদনকারীদের বাদ দিয়ে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাবশালীদের সুপারিশ এবং অর্থ লেনদেনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
এ সময় নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদারের বিরুদ্ধে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ করেন তারা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ। অভিযোগের বিষয়ে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, ‘আমরা প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে তিনজন করে যোগ্য প্রার্থীর নাম পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় যাদের যোগ্য মনে করেছে, তাদের নিয়োগ দিয়েছে।’
অভিযোগের বিষয়ে নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার বলেন, ‘যতটুকু শুনেছি, যারা পেয়েছেন, তাদের ৯৯ শতাংশ বিএনপির লোক। দু-একজনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না।’
নাটোরে অনিয়ম করে সার বিক্রি, ডিলারকে জরিমানা :
অন্যদিকে নাটোরের লালপুরে সাব-ডিলারের কাছে ২০ বস্তা সার বিক্রির ঘটনায় ভাই ভাই ট্রেডার্সের মালিক ও সার ডিলার ওয়াহিদুল ইসলাম খোকনকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল সকালে উপজেলার ঈশ্বরদী ইউনিয়নে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৪৫ ধারায় তাকে এ অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা গেছে, লালপুর সদর ইউনিয়নের সার ডিলার ভাই ভাই ট্রেডার্সের মালিক ওয়াহিদুল ইসলাম খোকন ঈশ্বরদী ইউনিয়নের সাব-ডিলার বাবুর কাছে ২০ বস্তা সার বিক্রি করেন। পরে সারগুলো পরিবহনের সময় স্থানীয় লোকজন গাড়িটি আটকে পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি যাচাই করে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন লালপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবীর হোসেন। এ সময় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সুব্রত কুমার সরকার উপস্থিত ছিলেন।
কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সুব্রত কুমার সরকার বলেন, ‘সার বিতরণ ও বিক্রির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা জরুরি। কৃষকের কাছে সারের সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করতে সার বিক্রির কার্যক্রম নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। কোনো অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে কুষ্টিয়ায় সার ডিলার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নিয়োগ কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট সদস্যদের শাস্তি দাবি করেছেন কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা।
তার অভিযোগ, প্রত্যেক ডিলারের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে জেলা প্রশাসক বলেছেন, অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে আমির হামজার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেকে/ এমএস