দুর্গাপূজা উপলক্ষে রংপুর বিভাগের বাজারগুলোতে নারিকেলের দাম হু হু করে বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে যেখানে প্রতি জোড়া নারিকেল ১৬০-১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, এখন সেখানে দাম দাঁড়িয়েছে ২৫০-৩০০ টাকায়। গত বছর একই সময় প্রতি জোড়া নারিকেলের দাম ছিল মাত্র ১৯০-২০০ টাকা। হঠাৎ এ দামবৃদ্ধিতে বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ক্রেতারা হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, দুর্গাপূজায় নারিকেলের চাহিদা ব্যাপক থাকায় ব্যবসায়ীরা এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। রংপুর বিভাগের আট জেলায় এ বছর ৫৩৫৮ টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। ১৬-২১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এ উৎসব।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা জানান, প্রতিটি দুর্গা মণ্ডপে গড়ে ৮০-১০০টি পর্যন্ত নারিকেল লাগে। অনেক মণ্ডপে এ সংখ্যা আরও বেশি। এ ছাড়া পূজা উপলক্ষে প্রতিটি পরিবার ১০-৫০টি নারিকেল ক্রয় করে থাকে। নাড়ু তৈরি ও পূজার নানা আনুষ্ঠানিকতায় নারিকেল অপরিহার্য। নারিকেল ছাড়া দুর্গাপূজা অসম্পূর্ণ।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ী হাট এলাকার বাসিন্দা প্রবীর চন্দ্র বর্মণ (৬৫) বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার নারিকেলের দাম বেশি। আমাদের পরিবারের চাহিদা ২০টি হলেও দাম বেশি হওয়ায় মাত্র ১০টি কিনেছি। দুই সপ্তাহ আগেও দাম কম ছিল। দুর্গাপূজার চাহিদা বেশি থাকায় ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। পুরো পূজাজুড়ে নারিকেল ব্যবহার করা হয়।’
রংপুরের নজিরের হাট এলাকার অ্যাডভোকেট নিরবালা রায় (৪০) জানান, এবার নারিকেল কিনতে গিয়ে মাথায় হাত পড়েছে। দাম এত বেশি যে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। নারিকেল ছাড়া নাড়ু তৈরি করা যায় না, তাই কম হলেও কিনতে হয়েছে।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বৈদ্যের বাজার এলাকার কৃষক রজনী মোহন্ত (৬৫) বলেন, ‘শুধু নারিকেল নয়, পূজার অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে। বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন। এতে পূজার সামগ্রিক খরচ বেড়েছে।’
বড়বাড়ী হাটের নারিকেল ব্যবসায়ী মোবারক আলী জানান, আমাদের এলাকায় নারিকেলের উৎপাদন খুবই কম। দক্ষিণাঞ্চল থেকে নারিকেল আনতে হয়। এবার পরিবহন খরচ বেড়েছে, পাইকারি বাজারেও দাম বেশি। আমরা প্রতি জোড়া নারিকেলে ২০–২৫ টাকা লাভ করি। মাঝেমধ্যে পচা নারিকেলও থাকে। বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
কুড়িগ্রামের যাত্রাপুর হাটে নারিকেল ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, ‘দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতারা আগের মতো পরিমাণে নারিকেল কিনছেন না। আমাদের এলাকায় নারিকেল গাছ খুবই কম আর যতগুলোতে গাছ থেকে তাতে নারিকেলের ফলনও তেমন হয় না। গেল বছরের তুলনায় নারিকেল কম বিক্রি হচ্ছে। আমরা পাইকারি বাজার থেকে বেশি দরে নারিকেল কিনছি তাই খুচরা বাজারে বেশি দরে নারিকেল বিক্রি করছি।’
রংপুর নগরীর গুপ্তপাড়া দুর্গা মন্দিরের কোষাধ্যক্ষ অশোক সরকার জানান, এ বছর নারিকেলসহ পূজার সকল ধরনের উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় পূজার খরচ অনেক বেড়েছে। আমাদের মন্দিরে পূজার জন্য প্রতিবছর ১২০টি নারিকেল প্রয়োজন হয়। এ বছর প্রতিজোড়া নারিকেল ৩০০ টাকা দরে কিনেছি। গেল বছর নারিকেল কিনেছিলাম ২০০ টাকা জোড়া।
তিনি বলেন, ‘বাড়িতে ব্যবহারের জন্য নারিকেলের চাহিদা কিছুটা কম করা গেলেও মন্দিরের জন্য কমানো যায় না। মন্দিরে পূজার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই নারিকেল কিনতে হয়েছে।’
লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ী দুর্গা ও কালী মন্দিরের সভাপতি ও পুরোহিত শঙ্কর চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, ‘দুর্গাপূজায় নির্দিষ্ট পরিমাণ নারিকেল ব্যবহার করতেই হবে। দাম যতই বাড়ুক পূজার নিয়ম পালনে ছাড় নেই। এ বছর শুধু নারিকেল কিনতেই মণ্ডপ প্রতি উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।’
লালমনিরহাট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি হিরালাল রায় জানান, দুর্গা পূজাকে ঘিরে নারিকেলের নাড়ু খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। নিমন্ত্রিত অতিথিরা এসেই নারিকেলের নাড়ুর সন্ধান করে থাকেন। তাই দুর্গাপূজা চলাকালিন নারিকেল একটি গুরুত্বপুর্ণ ফল। এ বছর নারিকেলের দাম বেশি। তবুও লোকজন সাধ্যমতো নারিকেল কিনছেন। নারিকেলের পাশাপাশি পূজার জন্য অন্যন্য উপকরণের দাম বৃদ্ধিতে মন্দির কমিটির সদস্যরা পূজার খরচ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।
কেকে/এআই