ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় ২৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকায় কেনা দুটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাযন্ত্র বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকার লিনিয়ার এক্সেলেটর এখনো বাক্সবন্দী। অন্যদিকে, ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা ক্যাথল্যাব প্রায় নয় বছরেও চালু হয়নি। যন্ত্র দুটি চালু না করেই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পুরো বিল পরিশোধের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
হাসপাতালের চিকিৎসা সামগ্রী (এমএসআর) কেনাকাটা, ওষুধের মজুতের হিসাব, সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া জমা এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগেও বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। এসব ঘটনায় প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দুদক।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া দুদকের অভিযান মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাত ৮টায় শেষ হয়। পরে সংবাদ সম্মেলনে অভিযানের তথ্য তুলে ধরেন দুদকের জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। তার নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি দল এ অভিযান পরিচালনা করে।
দুদক জানায়, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের হয়রানি, দালালদের মাধ্যমে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো, নিয়োগে অনিয়ম এবং কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে এ অভিযান চালানো হয়।
বাক্সবন্দী সাড়ে ১৪ কোটি টাকার যন্ত্র
দুদক কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে হাসপাতালের ক্যানসার ইউনিটের জন্য প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি লিনিয়ার এক্সেলেটর কেনা হয়। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের আগেই যন্ত্রটি কেনায় সেটি দীর্ঘদিন ধরে বাক্সবন্দী অবস্থায় পড়ে আছে।
একই অর্থবছরে হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের জন্য ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ক্যাথল্যাব স্থাপন করা হয়। কিন্তু স্থাপনের পর থেকে সেটিও চালু হয়নি। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, যন্ত্র দুটি অব্যবহৃত থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পুরো বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ করেছে দুদক। যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান।
ওষুধের হিসাবে গরমিল
হাসপাতালের চিকিৎসা সামগ্রী কেনাকাটা ও মজুত ব্যবস্থাপনাতেও অসংগতি পেয়েছে দুদক। সংস্থাটির অনুসন্ধানে ‘ফেব্রিক্স’ নামের একটি ওষুধের ৭৬২ বোতল ঘাটতি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, ‘হেক্সাটন’ নামের ওষুধের বোতল হিসাবের তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে।
দুদক কর্মকর্তা জানান, ওষুধের পরিমাণে এ ধরনের অসংগতি অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে সিটি স্ক্যান ও এক্স-রে পরীক্ষা বন্ধ থাকার বিষয়টিও অনুসন্ধান করেছে সংস্থাটি। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এমএসআর কেনার কার্যাদেশে সিটি স্ক্যান ও এক্স-রে ফিল্ম সরবরাহের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে দুদক জানায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওই দুটি সামগ্রী সরবরাহ করেনি। অন্যান্য সামগ্রীর বিল পরিশোধ করা হলেও এ দুটি সামগ্রী সরবরাহ না করার ঘটনায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এক মাসে জমা হয়নি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া
সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া আদায় ও সরকারি হিসাবে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের তথ্য পেয়েছে দুদক। সংস্থাটির অনুসন্ধান অনুযায়ী, হাসপাতালে মোট পাঁচটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এর মধ্যে দুটি অচল এবং তিনটি সচল।
দুদকের দাবি, সচল তিনটি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া বাবদ গত এক মাসে কোনো অর্থ সরকারি হিসাবে জমা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রতিটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে দায় নির্ধারণের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদন দুদক কমিশনারের কাছে পাঠানো হবে।
দুদকের তথ্য নিয়ে আপত্তি পরিচালকের
এ বিষয়ে হাসপাতালের উপপরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মানষ কৃষ্ণ কুন্ডু বলেন, দুদক যেসব তথ্য চেয়েছে, সেগুলো দিয়ে তারা সহযোগিতা করেছেন। হাসপাতালের দুটি চিকিৎসাযন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকার বিষয়টি মন্ত্রণালয়কেও জানানো হয়েছে।
তবে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া জমা না হওয়ার বিষয়ে দুদকের দেওয়া তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। এমএসআর কেনাকাটায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই বলেও জানান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক।
দুদক জানিয়েছে, সংগৃহীত নথিপত্র যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণের পর অনিয়মের প্রকৃত চিত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেকে/সাশ স