মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। এ সময়ে নদী ও সাগরে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন উপকূলীয় জেলা বরগুনার হাজারো জেলে। মাছ ধরতে না পারায় বন্ধ হয়ে গেছে তাদের দৈনন্দিন আয়। অথচ পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ থেমে নেই। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সহায়তা হিসেবে জনপ্রতি ২৫ কেজি চাল পেলেও তা দিয়ে ২২ দিন কীভাবে সংসার চলবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় জেলেরা।
বরগুনার পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীসহ উপকূলীয় এলাকার জেলেদের বড় একটি অংশের জীবিকা মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন নদী কিংবা সাগরে মাছ ধরে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে তাদের সংসার। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে নৌকা ও ট্রলার ঘাটে পড়ে রয়েছে। মাছ ধরার জাল মেরামত, নৌকা-ট্রলারের রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা ঘাটে বসে জাল বুনে সময় কাটছে অনেক জেলের। কাজ না থাকায় হাতে টাকা নেই, অন্যদিকে বাজারে নিত্যপণ্যের দামও তাঁদের বাড়তি চাপে ফেলেছে।
জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময় তাদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় পরিবার নিয়ে চরম সংকটে পড়তে হয়। সরকারি সহায়তার চাল দিয়ে কোনোভাবে খাবারের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করলেও চালের বাইরে ডাল, তেল, লবণ, সবজি, ওষুধসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে অর্থের প্রয়োজন হয়। ঋণের কিস্তি ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচও রয়েছে। ফলে শুধু চালের ওপর নির্ভর করে ২২ দিন পার করা তাদের জন্য কঠিন।
জেলে পলাশ হাওলাদার বলেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় আমরা নদীতে মাছ ধরতে পারব না। মাছ ধরেই আমাদের সংসার চলে। কিন্তু এই সময়ে সরকার থেকে যে ২৫ কেজি চাল দেওয়া হচ্ছে, তা দিয়ে পরিবারের সবার খাবারের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। চাল দিয়ে তো আর সব খরচ চলে না। নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে আমাদের জন্য আরও পর্যাপ্ত খাদ্যসহায়তা ও আর্থিক সহযোগিতা সরকার দেয় তাহলো আমাদের জন্য ভালো হবে।
জেলে ফোরকান মিয়া বলেন, গত দুই-তিন বছর ধরে সাগরে তেমন মাছ পাচ্ছি না। মাছ ধরতে গিয়ে অনেক সময় খালি হাতে ফিরতে হয়। সংসারের খরচ চালানো সবকিছুই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।আমরা তো এই পেশা ছাড়া অন্য কোন কাজ করতে পরি না।সরকারে যদি অবরোধের সময় আর্থিক সহায়তা একটু বাড়িয়ে দেয় , তাহলে আমরা বেঁচে থাকতে পারবো। তা না হলে বাধ্য হয়েই বাপ-দাদার মাছ ধরার এই পেশা ছেড়ে দিতে হবে।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, সরকার জেলেদের যে পরিমাণ চাল সহায়তা দিচ্ছে, তা দিয়ে তাদের সংসার চালানো সম্ভব নয়। তাই নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের জন্য চালের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, জীবিকার সংকটে পড়ে জেলেরা যদি পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন, তাহলে দেশের মৎস্যসম্পদ আহরণ ও সংরক্ষণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের জীবিকা সচল রাখতে সরকারকে কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জিয়া উদ্দিন জানান, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা উপলক্ষে বরগুনা জেলায় ৩৯ হাজার ৯৭৬ জন জেলেকে জনপ্রতি ২৫ কেজি করে চাল বিতরন শুরু হয়েছে। জেলায় মোট নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৫২ হাজার ৪৭৬ জন।
তিনি আরও বলেন, জেলেদের খাদ্যসহায়তা বাড়ানোর জন্য আমরা সচিব মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, জেলেদের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কেকে/ এমএস