জীবনের পথ সবার জন্য সমান নয়। কারও চলার পথ মসৃণ, আবার কারও প্রতিটি পদক্ষেপেই থাকে নানা বাধা আর প্রতিকূলতা। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আরিফের পথচলাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখেন তিনি। কারও করুণার পাত্র হয়ে নয়, নিজের শ্রম আর ঘামে জীবিকা নির্বাহ করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চান কসবার এ অদম্য যুবক।
জীবনের একের পর এক কঠিন আঘাত তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। ক্যানসারে হারিয়েছেন বাবা ও ছোট ভাইকে। আর্থিক সংকটে মাঝপথে থেমে গেছে পড়াশোনা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তো রয়েছেই, তার ওপর অসুস্থ মা, সংসারের দায়িত্ব আর অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ, সব মিলিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতা প্রতিনিয়ত তাকে পরীক্ষা নিচ্ছে। তবু হার মানেন নি আরিফ।
অনেকেই তাকে ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন, শুনিয়েছেন অসহায়ত্বের কথা। কিন্তু সবার সেই পরামর্শ উপেক্ষা করে তিনি বেছে নিয়েছেন পরিশ্রমের পথ, গড়ে তুলেছেন ছোট্ট একটি ব্যবসা। মানুষের কাছে হাত পেতে নয়, নিজের শ্রমে উপার্জন করে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চান কসবার এ অদম্য যুবক।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামের হানিফ মিয়ার ছেলে আরিফ। দুই ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছোট। তার জীবনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসে পরিবারের দুই প্রিয় মানুষকে হারানোর মধ্য দিয়ে।
২০১৯ সালে ক্যানসারে মারা যান তার বাবা। এর আগে ২০১৯ সালে একই রোগে মারা যান ছোট ভাই। একের পর এক শোক আর পরিবারের আর্থিক সংকটের ভারে এলোমেলো হয়ে যায় তার জীবন। কসবা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও শেষ পর্যন্ত আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি শিক্ষাজীবন। স্বপ্নের খাতা বন্ধ করে তাকে নামতে হয় জীবন সংগ্রামে।
অভাবের কাছে হার মানলেও আত্মসম্মানের কাছে হার মানতে রাজি নন আরিফ।
প্রতিদিন ভোর হলেই শুরু হয় তার বেঁচে থাকার লড়াই। ছুটে যান কসবা বাজারে। সেখানে ছোট্ট একটি স্টলে সাজিয়ে বসেন মোবাইলের কাভার, হেডফোনসহ বিভিন্ন ধরনের মোবাইল এক্সেসরিজ। পাশাপাশি পথচারীদের ওজন মেপেও সামান্য কিছু আয় করেন। দিনভর পরিশ্রমের পর যা উপার্জন হয়, তা দিয়েই চলে সংসারের খরচ। স্বপ্ন বড়, কিন্তু পুঁজি ছোট। ব্যবসায় পণ্যের চাহিদা থাকলেও আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় মালামাল তুলতে পারেন না। ফলে বাড়াতে পারছেন না বিক্রিও।
২০২০ সালে একটি ছোট ওজন মাপার মেশিন দিয়ে শুরু হয়েছিল তার উপার্জনের পথচলা। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পরে ছোট্ট একটি স্টলে ব্যবসা শুরু করেন। সেই থেকে প্রতিদিনের পরিশ্রমই তার বেঁচে থাকার অবলম্বন।
জীবনের এ কঠিন সময়ে আরিফের পাশে নেই বাবা, নেই ছোট ভাই। অসুস্থ মা আর নিজের সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে। স্ত্রীও সন্তানসম্ভবা। অনাগত সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন যেমন তাকে সাহস জোগায়, তেমনি পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাও তাকে তাড়া করে ফেরে। তবু তিনি থেমে থাকতে চান না। কারণ, তার কাছে এ ছোট্ট দোকানটি শুধু আয়ের উৎস নয়, আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
‘ভিক্ষা ছাড়া আর কী করতে পারবা?’ এমন কথাও শুনতে হয়েছে আরিফকে। কিন্তু সেই কথায় ভেঙে না পড়ে তিনি বেছে নিয়েছেন পরিশ্রমের জীবন। তার বিশ্বাস, সামান্য সহযোগিতা পেলে এ ক্ষুদ্র ব্যবসাটিকেই আরও বড় করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব।
আরিফের সংগ্রাম কাছ থেকে দেখছেন কসবা বাজারের ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। তাদের চোখে, তিনি কেবল একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নন; প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার এক অনন্য উদাহরণ।
ক্রেতা ফয়েজুর রহমান বলেন, ‘আমি আরিফের নিকট থেকে একটি মানিব্যাগ কিনেছি। ফুটপাতে এরকম ভালো জিনিস সচরাচর পাওয়া যায় না। জিনিস খুব ভালো। আরিফ এখানে দীর্ঘদিন যাবত ব্যবসা করছে। আমরা চাই সরকারিভাবে যেনো তাকে সহায়তা দেওয়া হয়।’
আরেক ক্রেতা সালাহউদ্দিন আইয়ুবী বলেন, ‘তার বাবা নেই, মা আছে। সঙ্গে তার পরিবারও আছে। সে ইচ্ছা করলেই মানুষের নিকট হাত পাততে পারতো কিন্তু সে সেটা না করে দিন রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে।’
আরিফের দীর্ঘদিনের সহকর্মী এক পাশের ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি তার সঙ্গে প্রায় ছয় বছর যাবৎ ব্যবসা করে যাচ্ছি। আরিফ মোটামুটি শিক্ষিত। সরকার যদি তাকে কোনো চাকরির ব্যবস্থা করে দেন, তাহলে আশা করি সে করতে পারবে। সে তার পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতেও পারবে।’
পার্শ্ববর্তী ব্যবসায়ী মো. হানিফ মিয়া বলেন, ‘আরিফ একজন প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী হয়েও সে তার শ্রমের বিনিময়ে হালালভাবে উপার্জন করে যাচ্ছে। তাকে যদি সরকার সহায়তা করত তাহলে, তার ব্যবসাটাকে আরেকটু উন্নত করতে পারতো।’
এত মানুষের সহমর্মিতা আর প্রশংসার মধ্যেও আরিফের চাওয়া খুব বেশি নয়। তিনি চান, নিজের ব্যবসাটিকে একটু বড় করতে, নিয়মিত পণ্য তুলতে এবং পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে। কারও করুণার পাত্র হতে চান না; চান নিজের যোগ্যতা ও শ্রম দিয়ে স্বাবলম্বী হতে।
আরিফ বলেন, ‘আমি কসবা বাজারে ২০২০ সাল থেকে ব্যবসা করে আসছি। প্রথমে ছোট্ট একটি (ওজন মাপার) মেশিন দিয়ে শুরু করি। পরে আমার পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য ছোট্ট একটি স্টলে করছি। আমার পরিবারটি দরিদ্র এবং নিম্নবিত্ত পরিবার। তাই সামান্য পুঁজি দিয়ে আমার এই ব্যবসাটি শুরু করা। মালের অত্যধিক চাহিদা থাকলেও নানাবিধ আর্থিক সঙ্কটের কারণে ব্যবসাটি ঐরকমভাবে পরিচালন করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই সহযোগিতা করেছেন তবে সরকারিভাবে এখনও কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমি সরকার এবং সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের নিকট আবেদন করছি আমার এ ক্ষুদ্র ব্যবসাটি পরিচালনা করার জন্য সামান্য কিছু হলেও অনুদান প্রদান করুন। আমার মা অসুস্থ এবং আমার স্ত্রীও সন্তান সম্ভাবা।’
ব্যবসাকে বেছে নেওয়ার কারণ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা করার জন্য আমার প্রবল ইচ্ছা। আমি কসবা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছি। আর্থিক সমস্যা এবং আমার ছোট ভাই ক্যন্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। পরে ২০২৪ সালে আমার বাবাও মারা যান ক্যন্সারে। মানসিক চাপ এবং আর্থিক সঙ্কট দুইটা মিলিয়েই আমি আমার লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারিনি।’
জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার কথা তুলে ধরে আরিফ বলেন, ‘আমি আমার পরিবারের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম। অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন ভিক্ষা করার জন্য। কেউ কেউ বলেছেন, ভিক্ষা ছাড়া তুমি আর কী করতে পারবা? তবে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি হালালভাবে ব্যবসা করে, পরিশ্রম করে আয় করার।’
আরিফের এ কথাগুলো যেন তার আত্মমর্যাদাবোধ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিরই প্রতিচ্ছবি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, প্রিয়জন হারানোর বেদনা কিংবা অভাব কোনোটিই তাকে নিজের পথ থেকে সরাতে পারেনি। বরং প্রতিদিন ছোট্ট দোকানটিতে বসে তিনি প্রমাণ করছেন, সুযোগ পেলে মানুষ নিজের ভাগ্য বদলানোর লড়াইয়ে কতটা দৃঢ় হতে পারে।
এখন তার প্রয়োজন একটু সহযোগিতা, ব্যবসার পুঁজি কিংবা যোগ্যতা অনুযায়ী একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ। সরকারি সহায়তা ও সমাজের বিত্তবান মানুষের সামান্য সহযোগিতা তার ব্যবসাকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা, সংসারের ব্যয় নির্বাহ এবং অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার পথ কিছুটা সহজ করতে পারে।
তাই আরিফের পাশে দাঁড়াতে সমাজের সামর্থ্যবান ও মানবিক মানুষদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের প্রত্যাশা, আরিফের মতো একজন পরিশ্রমী মানুষ যেন কেবল শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক সংকটের কারণে পিছিয়ে না পড়েন। তার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হোক, ব্যবসাটি আরও বড় করার পথ খুলে যাক।
কসবা উপজেলা মার্কেটের পশ্চিম কোণে ছোট্ট একটি দোকানে প্রতিদিন জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন আরিফ। তার জীবনের গল্প কেবল দুঃখ-বেদনার নয়, এটি আত্মমর্যাদা, সাহস আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। যে মানুষটি বাবাকে হারিয়েছেন, হারিয়েছেন ছোট ভাইকে, থামাতে হয়েছে পড়াশোনা, তিনিই আজ নিজের শ্রমে পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনছেন।
আরিফের জীবন যেন নীরবে একটি কথাই বলে, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার শারীরিক সীমাবদ্ধতায় নয়, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও মাথা উঁচু করে বাঁচার সাহসে। ভিক্ষার পথ নয়, পরিশ্রমের পথ বেছে নেওয়া এ যুবকের স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন একটু সহযোগিতা, একটু মানবিকতা আর এগিয়ে আসার মতো কিছু হাত।
কেকে/এআই