মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পথ্য (এমএসআর) সরবরাহ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়ার পর মালামালবাহী দুটি গাড়ি হাসপাতালে পৌঁছানো এবং প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর সেগুলো গ্রহণ করার ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে টেন্ডার প্রক্রিয়া, সরবরাহ করা সামগ্রীর গুণগত মান, মেয়াদ এবং অনুমোদিত তালিকার সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া পণ্যের সামঞ্জস্য নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকাল থেকে শ্রীমঙ্গল সরকারি হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এমএসআর সামগ্রী বোঝাই দুটি গাড়ি অবস্থান করতে দেখা যায়। পরদিন বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে মালামাল গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন হাসপাতালের স্টোরকিপার প্রকাশ দাশ।
তিনি জানান, বুধবার কার্যাদেশ (ওয়ার্ক অর্ডার) পাওয়ার পর সার্ভে কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে মালামাল গ্রহণ করা হয়েছে।
টেন্ডারের মোট অর্থ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, বিস্তারিত তথ্য তার জানা নেই; তবে টেন্ডারটি আনুমানিক ৭৫ লাখ টাকার সামথিং। কত টাকার সামগ্রী রিসিভ করা হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রায় ৪০ লাখ টাকার মতো হবে, তবে এখনও পুরোপুরি হিসেব শেষ হয়নি। বিকাল ৫টা পর্যন্ত মাল মেলানোর কাজ চলছে।’
এ দিকে, মঙ্গলবার রাতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. সিনথিয়া তাসমিন জানান, মঙ্গলবার সকালে গাড়ি দুটি হাসপাতালে আসলেও মালামাল গ্রহণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা উপস্থিত না থাকায় সেদিন মালামাল গ্রহণ করা হয়নি।
মালামাল গ্রহণের পর সরবরাহ করা চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পথ্যের গুণগত মান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেন, সরবরাহ করা কিছু পণ্যের মান ও মেয়াদ নিয়ে চরম সংশয় রয়েছে।
অন্য এক কর্মচারী দাবি করেন, স্বাস্থ্য দপ্তরের অনুমোদিত তালিকা ও চাহিদার সঙ্গে হাসপাতালে সরবরাহ করা পণ্যের ধরণ, পরিমাণ কিংবা মানের অমিল রয়েছে।
তবে অনুমোদিত তালিকা, সরবরাহ চালান ও গ্রহণসংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক নথি প্রকাশ না করায় এ সব অভিযোগের সত্যতা সরেজমিনে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কত টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পেয়েছে এবং বাস্তবে কত টাকার মালামাল গ্রহণ করা হয়েছে—এ সব তথ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিষ্কার করেনি। দরপত্রের নথি, কার্যাদেশ, মূল্যতালিকা ও সরবরাহ চালান জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলেই কেবল প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হবে।
এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ে ১১টি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করেন দৈনিক খোলা কাগজের মৌলভীবাজার স্টাফ রিপোর্টার মো. এহসানুল হক।
আবেদনে বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ ও প্যাথলজি থেকে আদায়কৃত ফি এবং সরকারি কোষাগারে জমার চালান, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়, দরপত্র ও কার্যাদেশের বিস্তারিত, জেনারেটর ও অ্যাম্বুলেন্সের জ্বালানি খরচ এবং রোগীদের পরিসংখ্যান, সরকারি কোয়ার্টারের বাড়িভাড়া ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটির তথ্য, ৩ বছরের বেশি সময় ধরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা, হাসপাতালের আইপিএস ও ব্যাটারি চুরির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য চাওয়া হয়।
আবেদনকারী জানান, গত ৪ অক্টোবর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ই-মেইলে একটি জবাব পাঠালেও তাতে কাঙ্ক্ষিত ১১টি বিষয়ের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ছিল না। পরবর্তী বিস্তারিত তথ্য চেয়ে আবারও ই-মেইল করা হলেও ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত প্রত্যাশিত কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
নানা অনিয়মের অভিযোগ ও জবাবদিহিতার দাবির মধ্যেই অবশেষে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. সিনথিয়া তাসমিনকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে তাকে বদলি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ন্যস্ত করা হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১৫ অক্টোবরের (বৃহস্পতিবার) মধ্যে তাকে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এমএসআর সামগ্রী সরবরাহ ও গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফেরাতে জেলা প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
তাদের মতে—দরপত্র আহ্বান, কার্যাদেশ প্রদান, পণ্য সরবরাহ, গুণগত মান ও মেয়াদ পরীক্ষা এবং চূড়ান্ত বিল পরিশোধের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বদলির পাশাপাশি সার্ভে কমিটির যাচাইপ্রক্রিয়া এবং সরবরাহ করা পণ্যের যাবতীয় নথি নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান স্থানীয়রা।
কেকে/এআই