জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের সব সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করে সরকার। পরবর্তী সময়ে নাগরিক সেবা সচল রাখতে সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডগুলোর দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা। তবে ওয়ার্ডগুলোতে নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। নাগরিক সেবা পেতেও দেখা দিয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। জরুরি সেবা পেতে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে কাজ করতে গিয়ে যে আমলাতান্ত্রিক মানসিকতায় অভ্যস্ত হয়েছেন, তা থেকে বের হতে পারছেন না। ফলে সাধারণ বিষয়কেও জটিল করে তুলছেন তারা। বিশেষ করে জন্মনিবন্ধন সনদ, মৃত্যু সনদ, সনদ সংশোধন ও নাগরিকত্ব সনদসহ বিভিন্ন সেবা পেতে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একাধিক আঞ্চলিক অফিস ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা হাসনাইন খোলা কাগজকে বলেন, ‘আমার নাগরিক সনদের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু গত কয়েক দিন ঘুরেও সংগ্রহ করতে পারিনি। এর অন্যতম কারণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষের সমস্যা বুঝতে অনেকটা ব্যর্থ হচ্ছেন। সাধারণ বিষয়কেও জটিল করে তুলছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে সাধারণ একটি নাগরিক সনদ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পাওয়া যেত। এখন তা পেতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়। এর মধ্যে কাগজপত্রের ঝামেলা তো আছেই। একগাদা কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এসব ভোগান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা সোহানুর রহমান খোলা কাগজকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় অনেক সময় তাদের সঙ্গে কথাও বলা যায় না। জরুরি প্রয়োজনে কার্যালয়ে গেলে জানানো হয়, ‘স্যার ব্যস্ত’। এক সপ্তাহ ঘোরাঘুরির পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দেখা পেলেও একটি সনদ পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অথচ আগে খুব কম সময়ে এসব সেবা পাওয়া যেত।
তবে নাগরিকদের অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি না থাকায় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের এ দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে যে কোনো সনদ দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রমাণ নিশ্চিত করতে হয়। এ কারণে তাৎক্ষণিকভাবে সব সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। একইসঙ্গে একজন কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সব কাজ সম্পন্ন করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৭-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) মো. হাসান হাবীব খোলা কাগজকে বলেন, ‘স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাদের এলাকার ভোটার ও বাসিন্দাদের সম্পর্কে জানতেন। ফলে যে কোনো সনদ দিতে তেমন ঝামেলা হতো না। কিন্তু আমরা এখানে কাউকে চিনি না। এ অবস্থায় কাউকে কোনো সনদ বা নাগরিক সুবিধা দিতে হলে অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়টি কারও কাছে ভোগান্তি মনে হলে এখানে আমাদেরও কিছু বলার থাকে না। যেহেতু এখন ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই, সেহেতু প্রয়োজনীয় তথ্য নিশ্চিত করতেই হবে।’
সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজের তদারকি এবং টিসিবির পণ্য বিতরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু কাউন্সিলর না থাকায় এসব সেবা পেতেও ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবাগ্রহীতারা। তাদের ভাষ্য, সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হলেও দাপ্তরিক কাজের চাপের কারণে তারা নগরবাসীকে যথাযথভাবে সেবা দিতে পারছেন না। একজন জনপ্রতিনিধি যে সেবা স্বল্প সময়ে দিতে পারতেন, তা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
নাগরিক সেবা নিতে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, সাধারণ সেবা পেতে একগাদা কাগজপত্র জমা দেওয়ার চাপ থাকলেও আর্থিক লেনদেন বা ঘুষ দিলে এসব কাগজপত্রের অনেক কিছুই প্রয়োজন হয় না। অনেক ক্ষেত্রে মাত্র একটি কাগজ জমা দিয়েই নাগরিক সনদসহ বিভিন্ন সেবা পাওয়া যায়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এর বাইরে গেলেই কার্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নানা অজুহাত দেখান। অথচ টাকা দিলেই নিয়মনীতি অনুসরণের প্রয়োজন হয় না বলে অভিযোগ তাদের।
এদিকে নাগরিক সেবার এ সংকট সমাধানে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও দ্রুত সময়ে নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন নগর-পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, ‘এ সমস্যা সমাধানে দুটি কাজ করতে হবে। প্রথমত, কারিগরি দিক। ভোটার আইডিসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের তথ্যভান্ডার সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তবে তথ্যের মালিকানা সরকারের কাছেই থাকবে। সিটি করপোরেশনগুলোকে শুধু তাদের আওতাধীন নাগরিকদের তথ্য ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের সব দপ্তর যেন একই তথ্যভান্ডার ব্যবহার করতে পারে, সে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নাগরিকদের দেওয়া বিভিন্ন কার্ড ও তাদের তথ্যও একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। এতে সরকারি সেবা দেওয়া সহজ হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য কাজে লাগাতে পারবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকটি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি কর্মকর্তাদের দিয়ে জনপ্রতিনিধির কাজ কখনোই হবে না। ফলে এ সংকট সমাধানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি প্রয়োজন। যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বে আনতে হবে। নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকাই এখনকার অন্যতম মূল সমস্যা।’
এ বিষয়ে কথা হলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আলী আকবর খোলা কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় কিছু সমস্যা হচ্ছে। তবে সরকার বলছে— নির্বাচন দিয়ে দেবে। যদি নির্বাচন দিয়ে দেয়, তাহলে হয়তো এসব সমস্যা থাকবে না। আর জনপ্রতিনিধির কাজ তো প্রশাসক দিয়ে হবে না। এ ছাড়া একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তার ভোটারদের কাছে দায়বদ্ধ। তিনি সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে আন্তরিক হবেন, এটাই স্বাভাবিক।’
কেকে/ এমএস