পুষ্টিকর খাবারের উচ্চমূল্যের কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা অনুসরণ করতে পারছেন না অনেক রোগী। একই সমস্যায় পড়ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় পুষ্টিকর খাবারের ওপর শুল্ক কমানো এবং কোমল পানীয়, ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানভীর আহমেদ।
সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিংয়ে পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার সরবরাহ বাড়াতে বিশেষ ভর্তুকি দেওয়ার আহ্বান জানান এ পুষ্টিবিদ।
দামের কারণে অনুসরণ করা যাচ্ছে না পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা
শিক্ষকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট হিসেবে কাজ করছেন তানভীর আহমেদ। রোগীর শারীরিক অবস্থা ও পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় খাবার কেনার সামর্থ্য থাকে না রোগীদের।
এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, মিষ্টিকুমড়ার বীজ, কিনোয়া ও অন্যান্য বীজ পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য হিসেবে পরিচিত। জটিল রোগে আক্রান্ত কিছু রোগীর খাদ্যতালিকায় এসব খাবার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে উচ্চমূল্যের কারণে নিয়মিত এগুলো কেনা অনেকের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পুষ্টিবিদের পরামর্শ থাকলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতায় কাঙ্ক্ষিত খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা সম্ভব হয় না।
এ সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবারের ওপর বিদ্যমান শুল্ক কমিয়ে দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন তানভীর আহমেদ।
অস্বাস্থ্যকর খাবারে কর বাড়ানোর প্রস্তাব
পুষ্টিকর খাবারের ওপর শুল্ক কমালে রাজস্বের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে বলে মনে করেন এ পুষ্টিবিদ। এ ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে কোমল পানীয়, ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
তার প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য, একদিকে পুষ্টিকর খাবার সহজলভ্য করা, অন্যদিকে অস্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর করনীতির মাধ্যমে রাজস্বের ভারসাম্য রক্ষার সম্ভাবনা বিবেচনা করা। তবে এ ধরনের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সম্ভাব্য রাজস্ব প্রভাব ও করনীতির কার্যকারিতা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিয়েও উদ্বেগ
রোগীদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টিগত অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তানভীর আহমেদ। তাঁর মতে, বিভিন্ন কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী অপুষ্টি ও অতিপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন অপুষ্টি বা ‘হিডেন ম্যালনিউট্রিশন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়।
শিক্ষার্থীদের খাদ্যতালিকায় বাদাম ও বিভিন্ন ধরনের বীজের মতো পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এসব খাবার সহজে খাওয়া গেলেও দাম বেশি হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে নিয়মিত কেনা সম্ভব হয় না। দাম সাশ্রয়ী হলে তাঁদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে এসব খাবার ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
যবিপ্রবির ৪৩ শতাংশ ছাত্রী রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত
যবিপ্রবির ছাত্রীদের নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তানভীর আহমেদ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪৩ শতাংশ ছাত্রী রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের পুষ্টিগত অবস্থার উন্নয়নে এ ধরনের সমস্যা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা ও তা কেনার সামর্থ্য নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়তা মিলতে পারে। এ জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপও জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
ডাইনিংয়ে পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে ভর্তুকির দাবি
শিক্ষার্থীদের পুষ্টির উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিংয়ের খাবারের মান বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছেন এ পুষ্টিবিদ। বিশেষ করে ছাত্রী হলের ডাইনিংয়ে পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার সরবরাহ বাড়াতে বিশেষ ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন তিনি।
তার মতে, সাশ্রয়ী মূল্যে পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পুষ্টির চাহিদা পূরণ সহজ হবে। একই সঙ্গে তাদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাজীবনে ভালো করার অনুকূল পরিবেশ তৈরিতেও এটি সহায়ক হতে পারে।
সরকারি উদ্যোগের প্রত্যাশা
দেশি-বিদেশি ফলের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তানভীর আহমেদ। একই সঙ্গে পুষ্টিকর খাবারের শুল্ক কমানো, অস্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর কর বাড়ানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিংয়ে পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি।
তার মতে, পুষ্টিকর খাবার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা করা গেলে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কেকে/সাশ