গুলি, খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ও ফুটপাত দখল—সব মিলিয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে টালমাটাল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এলাকাটি বারবার গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে আসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ধরপাকড়ের ঘটনাও কম নয়। তারপরও বারবার নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে আলোচনায় আসছে মোহাম্মদপুর। স্থানীয়রা জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরো কঠোর হতে হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে, একাধিক ঘটনায় আগ্নেয় অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাতে বাবা-ছেলেকে গুলি ও এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করার ঘটনায় ফের আলোচনায় এসেছে এলাকাটি।
জানা গেছে, দুর্বৃত্তদের গুলিতে এক বাবা এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার ছেলে গুরুতর আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মোহাম্মদপুর থানাধীন ময়ূরভিলার সামনে প্রধান সড়কে এ ঘটনা ঘটে।
আহতরা হলেন মো. সুমন (৪৫) ও তার ছেলে ফাহিম (১৮)। সুমনের বাবার নাম মো. হোসেন আলী। আহত বাবা ও ছেলে পেশায় আলু-পেঁয়াজ বিক্রেতা। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয়দের তথ্যানুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ময়ূরভিলার সামনে সড়কে দুই থেকে তিনজন দুর্বৃত্ত সুমনকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে তার পায়ে গুলি লাগে। একই সময় তার ছেলে ফাহিমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করা হয়। পরে আহত অবস্থায় দুইজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তারা ফুটপাতে ভ্যানে করে আলু-পেঁয়াজের ব্যবসায় করতেন। এখানেই ফুটপাতে ব্যবসায় করতো ফরহাদ নামে একজন তাকেও আরশিনগরে কুপিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। গতকালের ঘটনায় যাদের কুপিয়ে গুলি করা হয়েছে তারা ফরহাদের আত্মীয় বলে জানা গেছে।
ঘটনার পরপরই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল হালিমসহ পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে পুলিশের বেশ কয়েকটি গাড়ি মোতায়েন করা হয়।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদ থেকে তিন রাস্তার মোড় পর্যন্ত বিস্তৃত ফুটপাতের দোকানগুলো ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের বিরোধ চলে আসছে। এই ফুটপাতে কয়েকশত দোকান রয়েছে। এসব দোকান থেকে নিয়মিত টাকা আদায় এবং সেই টাকার ভাগাভাগি নিয়ে মাঝেমধ্যেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয়দের ভাষ্যানুযায়ী, ফুটপাতের দোকানের ধরন ও আকারভেদে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। কোনো কোনো দোকানি দাবিকৃত টাকা দিতে না পারলে কিংবা নির্ধারিত অঙ্কের কম দিলে বিরোধ সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে কেরানীগঞ্জের আরশীনগরের একটি সেলুনে ফরহাদের ওপর হামলা চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হলে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এই ফুটপাতকে কেন্দ্র করেই ফরহাদ খুন হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছিল, ফরহাদ পাটালী গ্রুপের সদস্য ছিলেন। ফরহাদের স্বজনদের দাবি ছিল, তিনি মোহাম্মদপুরের ময়ূরভিলা এলাকায় ফুটপাতে মাছের ব্যবসা করার চেষ্টা করছিলেন। সেখানে একটি কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্য তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করেন। এককালীন ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিদিনও চাঁদা দিতে বলা হয়েছিল বলে দাবি স্বজনদের। ফরহাদ এতে রাজি না হওয়ায় তাঁদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়।
গেল ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে জুলাইযোদ্ধা সমন্বয়ক ইব্রাহিমকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। সেই ঘটনায়ও আলোচনায় আসে মোহাম্মদপুর ও ফুটপাত। তবে পুলিশ জানিয়েছিল, একটি ক্লাবঘরকে কেন্দ্র করে ওই ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হলে অনেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন।
ফুটপাতের চাঁদাবাজি ও জমি দখলের মতো ঘটনা যেন মোহাম্মদপুরে সপ্তাহের ব্যবধানেই ঘটছে। এক মাসের মধ্যে তিনটি স্থানে জমি দখলচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ পুলিশ বিট অফিসের সামনে চাঁদ উদ্যানসংলগ্ন ক্রয়কৃত একটি প্লট কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নিয়ে ভোরবেলায় দখলের চেষ্টা চালায় একটি গ্রুপ। দখলচেষ্টা চলে বেলা ১১টা পর্যন্ত। ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত হলে সবাই পালিয়ে যায়।
মোহাম্মদপুর থানাধীন বেড়িবাঁধের পশ্চিম পাশে চাঁদ উদ্যানের ‘রোজ ভিলা’ সংলগ্ন ওই জমিতে থাকা একটি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় দুর্বৃত্তরা। এ সময় কার্যালয় থেকে এসি, ফ্রিজ, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, টেবিল, চেয়ারসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র লুটপাট করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে গেল শনিবার (১০ অক্টোবর) মোহাম্মদপুরের ৪০ ফিট এলাকায় রাজধানী হাউজিংয়ের অফিসে একদল দুর্বৃত্ত হামলা চালায়। সেই ঘটনায় পুলিশ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। হাউজিংটির মালিক সেলিম সাহেবের অভিযোগ, একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ তার হাউজিং দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। দুর্বৃত্তরা অফিসে ঢুকেই জানায়, ‘চেয়ারম্যান’ নামের একজন তাদের সেখানে পাঠিয়েছেন।
তার অভিযোগ অনুযায়ী, ওই কথিত চেয়ারম্যান হলেন ‘কিলার বাদল’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি।
এরপর মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিংয়ে একটি প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি এবং দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তী সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও এসআরবির (সাবেক র্যাব) সদস্যরা উপস্থিত হলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।
এদিকে মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কিছুদিন আগে জেনেভা ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে।
এ ছাড়া পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইবনে মিজা মুঠোফোনে খোলা কাগজকে বলেন, ‘এলাকাটিতে যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, সব কটিতেই কেউ না কেউ গ্রেপ্তার বা আটক হয়েছেন। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সজাগ রয়েছে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। গতকালের ঘটনায়ও যারা জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। এ বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। মোট কথা, কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তারে ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আশা করা যায়, পরিস্থিতি শান্ত হবে।’
কেকে/এমএ