নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফের মরদেহের ময়নাতদন্তে শরীরে ছয়টি গুলির আঘাত পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাঁচটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেলেও একটি পিঠের ভেতরে আটকে ছিল। এ ঘটনায় তার স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় সাত থেকে আটজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে মামলাটি করা হয়। এর আগে বিকেলে নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে আলিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
হত্যা মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ খান। শনিবার (১৭ অক্টোবর) তিনি জানান, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ জানান, আলিফের বুকে তিনটি গুলির আঘাত ছিল। এর মধ্যে দুটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যায়, অন্যটি পিঠের ভেতরে আটকে ছিল। এ ছাড়া কপালের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে একটি গুলি মাথার পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। বাকি দুটি গুলির একটি মাথার ওপরের অংশের চামড়া এবং অন্যটি ডান কাঁধের পাশের চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে যায়।
ক্ষতচিহ্ন পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসকের প্রাথমিক ধারণা, আলিফকে সামনের দিক থেকে পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছিল।
আলিফ বেসরকারি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন তিনি। কলমাকান্দার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামের মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে আলিফ শ্বশুরবাড়ি তেলনজিয়ায় থাকতেন।
স্বামী হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন তার স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। তাদের দুটি শিশুসন্তান রয়েছে। স্বামীকে হারিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
যেভাবে গুলি করা হয় আলিফকে
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে তেলনজিয়া এলাকার একটি চায়ের দোকানে বসে চা পান করেন আলিফ। সেখান থেকে বিরিশিরি উতরাইল বাজারের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর বুঝতে পারেন, নিজের মুঠোফোনটি দোকানে ফেলে এসেছেন। মিনিট তিনেকের মধ্যে তিনি আবার দোকানে ফিরে যান।
আলিফ মুঠোফোন নিয়ে বের হওয়ার সময় দুই যুবক দোকানে এসে দোকানদারের কাছে সিগারেট চান। এরপর তাকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়েন তারা। গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে ওই দুই যুবক পালিয়ে যান। পরে আলিফকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ
এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হয়েছিলেন আলিফ। তাকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছিল। এ সময় তার সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাঁকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়।
ওই ঘটনায় আলিফ বাদী হয়ে মামলা করেন। পরে পুলিশ নাম উল্লেখ করা দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তারা জামিনে মুক্ত রয়েছেন।
আলিফের বড় ভাই শহীদ ইসলাম ফকির বলেন, সাংবাদিকতা করার কারণে তার ভাইয়ের অনেক শত্রু তৈরি হয়েছিল। ভাইকে নির্মমভাবে হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
কেকে/সাশ