নদী, নৌকা আর বৈঠার ছন্দে গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐতিহ্যের নাম নৌকাবাইচ। সেই ঐতিহ্যের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে এবার ৭৩ হাত দীর্ঘ বিশাল এক বাইচের নৌকা নির্মাণ করছেন মাগুরার পল্লিচিকিৎসক অরুন চন্দ্র বিশ্বাস। নিজের শখ, এলাকাবাসীর উৎসাহ আর নৌকার প্রতি ভালোবাসা থেকেই তার এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। ‘জয় মা দুর্গা’ নামের নৌকাটিতে একসঙ্গে বৈঠা হাতে বসতে পারবেন ৬৫ থেকে ৬৮ জন বাইচালক। নৌকাটিকে ঘিরে ইতোমধ্যে স্থানীয় মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল।
মাগুরা সদর উপজেলার কুচিয়ামোড়া গ্রামের বাসিন্দা অরুন চন্দ্র বিশ্বাসের বয়স ৪৬ বছর। পেশায় তিনি একজন পল্লিচিকিৎসক। আমুড়িয়া বাজারে রয়েছে তাঁর চিকিৎসাসেবার চেম্বার। তবে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি এবার তিনি সময় ও অর্থ ব্যয় করছেন নিজের দীর্ঘদিনের শখ পূরণে। বাড়ির পাশের কটকি নদীর তীরে একটি আকাশমণি বাগানে চলছে তাঁর স্বপ্নের নৌকা নির্মাণের কাজ।
জানা গেছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর নৌকাটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। খুলনার তেরখাদা উপজেলার মঠবাড়ি গ্রামের চারজন অভিজ্ঞ কারিগর দিনরাত পরিশ্রম করে এর মূল কাঠামো তৈরি করেছেন। ইতোমধ্যে নৌকার প্রধান নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। দেওয়া হয়েছে আলকাতরার প্রলেপও। আগামী ২৫ অক্টোবরের মধ্যে গলুই নির্মাণ ও রঙের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তার।
নৌকাটি নির্মাণে মাগুরা ও যশোর জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে সেগুন ও লোহাকাঠ। এসব কাঠ কিনতে ব্যয় হয়েছে প্রায় চার লাখ ৩০ হাজার টাকা। চারজন কারিগরের মজুরি বাবদ খরচ হয়েছে আরও ৮০ হাজার টাকা। অন্যান্য খরচ যোগ করে নৌকাটি নির্মাণে মোট ব্যয় পাঁচ লাখ টাকার বেশি হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নৌকাটি দেখতে প্রতিদিনই সেখানে ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দূরদূরান্ত থেকে আসা উৎসুক মানুষ। এত বড় একটি বাইচের নৌকা নির্মাণের খবর ছড়িয়ে পড়ায় এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে বাড়তি উদ্দীপনা।
স্থানীয় বাসিন্দা মহিতোষ মণ্ডল বলেন, “নৌকাটি নির্মাণের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এটি দেখতে আসছেন। ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ এলাকায় ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। এত বড় একটি নৌকা তৈরি হচ্ছে, এটি আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়।”
নৌকাটির প্রধান কারিগর মো. কামরুল ইসলামের বয়স ৬৭ বছর। তিনি খুলনার তেরখাদা উপজেলার মঠবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নৌকাবাইচের নৌকা নির্মাণ করে আসছেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে কামরুল ইসলাম বলেন, “১৯৮৬ সাল থেকে বাইচের নৌকা তৈরি করছি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে আমরা কাজ করি। তবে এত বড় নৌকা এবারই প্রথম বানালাম।”
উদ্যোক্তা অরুন চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আমার নৌকাটি এ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বড়। নদীর ধারে আমার বাড়ি। নৌকার প্রতি শখ থেকেই এ উদ্যোগ নিয়েছি। এলাকাবাসীও আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন।”
তিনি আরও জানান, আগামী নভেম্বরে মহম্মদপুরে মধুমতি নদীতে অনুষ্ঠিতব্য একটি নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে ‘জয় মা দুর্গা’র যাত্রা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু স্থানীয় প্রতিযোগিতায় নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত নৌকাবাইচেও অংশ নিতে চান তিনি। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই নৌকাটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
গ্রামবাংলার নদীকেন্দ্রিক জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে নৌকাবাইচের সম্পর্ক বহুদিনের। সময়ের পরিবর্তনে অনেক এলাকায় এ ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের জৌলুশ কমে এলেও নৌকাবাইচকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ এখনো রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অরুন চন্দ্র বিশ্বাসের এ উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে ঐতিহ্যবাহী খেলাটিকে নতুন করে প্রাণবন্ত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
নির্মাণকাজ শেষ হলে ‘জয় মা দুর্গা’ নৌকাটি নদীর বুকে বৈঠার ছন্দে ছুটবে, অংশ নেবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়। অরুন চন্দ্র বিশ্বাসের ব্যক্তিগত শখ থেকে শুরু হওয়া এ উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত মাগুরা অঞ্চলের নৌকাবাইচের ঐতিহ্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।