ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনের নেতৃত্ব, জনসমর্থন এবং রাজনৈতিক কৃতিত্বের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক সক্রিয়তা সেই প্রচলিত সমীকরণে পরিবর্তন আনছে। সাম্প্রতিক সময়ে তেলাপোকাদের দল- ককরোচ জনতা পার্টিকে (সিজেপি) ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা এই পরিবর্তনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
ব্যঙ্গ, প্রতিবাদ এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার বাইরে গিয়ে জনমত তৈরির কৌশল নিয়ে আলোচনায় এসেছে সংগঠনটি। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সিজেপির অবস্থানও বৃহত্তর বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস ও তার সমমনা দলগুলোর ‘ইন্ডিয়া’ জোটের মতো প্রতিষ্ঠিত বিরোধী শক্তিগুলোও একই ইস্যুতে আন্দোলন করছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, নতুন প্রজন্মের আন্দোলন থেকে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শক্তিকে কি বৃহত্তর বিরোধী জোট যথাযথ স্বীকৃতি দিচ্ছে? নাকি প্রতিষ্ঠিত নেতাদের রাজনৈতিক উপস্থিতি এবং দলীয় আধিপত্যের কারণে সিজেপির মতো সংগঠনগুলো ক্রমশ আড়ালে চলে যাচ্ছে?
ইন্ডিয়া জোটের মিছিলে রাহুল-প্রিয়াংকার সঙ্গে বামপন্থি নেত্রী নেহা বোরা সামনে থাকলেও সিজেপি নেতারা ছিলেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কংগ্রেসের কিছু সমর্থকের সমালোচনা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সিজেপি নেতাদের অনুপস্থিতি এই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। তবে এই পরিস্থিতিকে নিছক ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখলে বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষিত হবে। প্রশ্ন হলো, সিজেপিকে কি পরিকল্পিতভাবে আড়ালে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, নাকি বিরোধী রাজনীতির অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতাই এই দূরত্ব তৈরি করছে? আর ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরের জায়গা কোথায়?
প্রতিষ্ঠিত রাজনীতির সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
ভারতের বিরোধী রাজনীতিতে কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। জাতীয় পর্যায়ে বিজেপির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো, ঐতিহাসিক পরিচিতি এবং রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শুধু ঐতিহ্য ও সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে জনসমর্থন ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের একটি অংশ প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষণ ও দলীয় কর্মসূচির বাইরে বিকল্প রাজনৈতিক প্রকাশভঙ্গি খুঁজছে। এই জায়গায় সিজেপির মতো আন্দোলনভিত্তিক সংগঠন আলোচনায় আসার সুযোগ পাচ্ছে।
ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য, প্রতীকী প্রতিবাদ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহজে ছড়িয়ে পড়ার মতো বার্তা তরুণদের কাছে রাজনৈতিক বিষয়কে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে পারে। প্রচলিত রাজনৈতিক দল যেখানে সংবাদ সম্মেলন, মিছিল কিংবা সংসদীয় বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে, সেখানে নতুন আন্দোলনগুলো কখনো কখনো হাস্যরস ও সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের মাধ্যমে বৃহত্তর শ্রোতার কাছে পৌঁছায়। এখানে মূল প্রশ্নটি কেবল কে বেশি জনপ্রিয়, তা নয়। বরং কে রাজনৈতিক আলোচনার ভাষা নির্ধারণ করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো নতুন সংগঠন যদি তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করতে পারে, তাহলে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর উচিত সেই উদ্যোগকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে না দেখে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচনা করা। তবে সিজেপির প্রতি জনসমর্থন, সাংগঠনিক বিস্তার কিংবা নির্বাচনি প্রভাব কতটা, তা নির্ধারণের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৃশ্যমানতা সব সময় বাস্তব জনসমর্থনের সমান নয়। একইভাবে, কোনো প্রতিষ্ঠিত দলের জনপ্রিয়তা থাকলেই নতুন আন্দোলনের অবদান অস্বীকার করা যায় না। সেই বিবেচনায় অভিজিৎ দিপকের চেয়ে বামপন্থি নেত্রী নেহা বোরার জনপ্রিয়তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুঙ্গে। এক্ষেত্রে আলোচনাটায় বা কীভাবে এগোবে?
আন্দোলনের কৃতিত্ব ও বিরোধী ঐক্যের সংকট
এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, ভোটাধিকার এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা। এসব প্রশ্নের সমাধান রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি তথ্য-প্রমাণ, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনার মাধ্যমে হওয়া প্রয়োজন। এই ইস্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠন সক্রিয় হলে আন্দোলনের পরিসর বিস্তৃত হওয়ার কথা।
কিন্তু বাস্তবে বিরোধী রাজনীতিতে প্রায়ই একটি প্রতিযোগিতা দেখা যায়-কে আন্দোলনের মুখ, কে সবচেয়ে বেশি জনসমর্থন অর্জন করেছে এবং কে রাজনৈতিক সাফল্যের কৃতিত্ব পাবে। এই প্রতিযোগিতা কখনো কখনো মূল দাবিকে দুর্বল করে দেয়। আন্দোলনের লক্ষ্য হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা নয়, বরং একই শিবিরের অন্য শক্তিকে ছাপিয়ে যাওয়া।
সিজেপিকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কও এই বৃহত্তর সমস্যার আলোকে দেখা প্রয়োজন। কংগ্রেসের কিছু সমর্থক যদি সংগঠনটিকে রাহুল গান্ধীর তরুণ সমর্থকদের প্রভাবিত করার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে তা বিরোধী রাজনীতির জন্য উদ্বেগজনক প্রবণতা। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন সমর্থকের বক্তব্যকে পুরো কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে ধরে নেওয়াও যুক্তিসংগত নয়।
একইভাবে, কোনো রাজনৈতিক চা চক্র বা কর্মসূচিতে সিজেপি নেতাদের অনুপস্থিতি থেকে সরাসরি পরিকল্পিতভাবে তাদের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আমন্ত্রণ, যোগাযোগ এবং অংশগ্রহণের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। কিন্তু এমন ঘটনা যদি বৃহত্তর রাজনৈতিক দূরত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে, তাহলে বিরোধী জোটের নেতৃত্বকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
বিজেপির বিরুদ্ধে কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বিরোধীদের ঐক্য প্রয়োজন। সেই ঐক্য কেবল বড় দলগুলোর মধ্যে আসন সমঝোতা কিংবা যৌথ সংবাদ সম্মেলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ছাত্র সংগঠন, নাগরিক আন্দোলন এবং নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্কও তার অংশ হওয়া উচিত। সিজেপির রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে কেউ একমত না হলেও সংগঠনটির বক্তব্য শোনার এবং তার কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ: সহযোগিতা, না আধিপত্যের লড়াই?
ভারতের তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে কেবল কোনো একটি দলের ভোটব্যাংক হিসেবে দেখা উচিত নয়। তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা, প্রতিবাদী মনোভাব এবং নতুন যোগাযোগপদ্ধতি গণতন্ত্রকে আরও প্রাণবন্ত করতে পারে। কিন্তু সেই অংশগ্রহণকে যদি প্রতিষ্ঠিত নেতাদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়বে।
সিজেপি বা এল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস এসোসিয়েশনের (আইসা) মতো সংগঠনগুলোর সামনে যেমন নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করা, সাংগঠনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং জনসমর্থনের বাস্তব ভিত্তি তৈরি করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তেমনি কংগ্রেস ও ইন্ডিয়া জোটের সামনেও রয়েছে নতুন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন। কোনো আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা শুধু তার ভাইরাল ভিডিও বা নাটকীয় প্রতিবাদের ওপর নির্ভর করতে পারে না। ধারাবাহিক কর্মসূচি, সুস্পষ্ট দাবি এবং বাস্তব রাজনৈতিক ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি কার্যকর বিরোধী রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত বহুত্ববাদ। সেখানে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব যেমন থাকতে পারে, তেমনি সিজেপি, আইসা এবং অন্যান্য নাগরিক ও ছাত্র সংগঠনের স্বাধীন ভূমিকাও স্বীকৃতি পেতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অর্থ সব কণ্ঠস্বরকে নিজের অধীনে নিয়ে আসা নয়; বরং ভিন্নমতকে একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক লক্ষ্যের দিকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া।
শেষ পর্যন্ত সিজপিকে আড়ালে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কি না, তার উত্তর নির্ভর করবে বাস্তব রাজনৈতিক আচরণ, সংগঠনগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং আন্দোলনের ধারাবাহিকতার ওপর। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: বিরোধী রাজনীতি যদি নতুন প্রজন্মের উদ্যোগকে সহযোগী হিসেবে গ্রহণ না করে, তাহলে নিজেদের সম্ভাবনাকেই সংকুচিত করবে। আর যদি প্রতিষ্ঠিত দলগুলো নতুন কণ্ঠস্বরকে জায়গা দেয়, তাহলে সেই বহুত্ববাদই বিজেপিবিরোধী রাজনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। গণতন্ত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কে মঞ্চের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে, তা নয়; বরং মঞ্চে কারা কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে।
লেখক: কলামিস্ট, পর্তুগাল
কেকে/সাশ