শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে নোটিশ, তবু অনুমোদন ছাড়াই চলছিল টুপটুপ রিসোর্ট      ● কক্সবাজারের রিসোর্টে ভয়াবহ আগুন, ৩ শিশুসহ ১০ পর্যটকের মৃত্য      ● ধর্ম যার যার-রাষ্ট্র সবার, নিরাপত্তার অধিকার সবার : প্রধানমন্ত্রী      ● দিল্লিতে মিছিলের পূর্বেই আটক অভিজিৎ, হেফাজতে নেহা বোরা      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় চারজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১১৮১       ● হাম উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ শিশুর মৃত্যু      ● আবারও গুলি-কুপিয়ে জখম, চাঁদাবাজি-দখলবাজিতে টালমাটাল মোহাম্মদপুর      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
মিয়ানমার করিডর: বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা
ড. মাহরুফ চৌধুরী
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:০৪ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

মানবসভ্যতার ইতিহাসে বাণিজ্যপথ কেবল পণ্য পরিবহনের মাধ্যম ছিল না; তা ছিল সভ্যতার বিকাশ, সংস্কৃতির বিনিময় ও ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের চালিকাশক্তি। প্রাচীন সিল্ক রোড যেমন চীন, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপকে যুক্ত করে পণ্যের পাশাপাশি জ্ঞান, প্রযুক্তি, ধর্ম ও সংস্কৃতির বিস্তার ঘটিয়েছিল, তেমনি আজকের বিশ্বে করিডর, বন্দর, মহাসড়ক ও রেলপথকে কেন্দ্র করে নতুন ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতা গড়ে উঠছে।

আধুনিক করিডরকে অনেক সময় ‘অর্থনৈতিক ধমনি’ বলা হয়। কারণ এর মাধ্যমে কেবল পণ্য নয়, পুঁজি, প্রযুক্তি, মানুষ ও তথ্যও চলাচল করে; ফলে একটি অঞ্চলের উৎপাদন কাঠামো নতুনভাবে বিন্যস্ত হতে পারে। একবিংশ শতাব্দীতে যে রাষ্ট্র সংযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করবে, সে অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ পাবে। অবকাঠামোগত সংযোগ শুধু পরিবহনের উন্নয়ন নয়; এটি বাজার সম্প্রসারণ, বাণিজ্যব্যয় হ্রাস, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলে অন্তর্ভুক্তির পূর্বশর্ত। তাই আজ ‘কোথায় একটি দেশ অবস্থিত’—এর পাশাপাশি ‘দেশটি কোন কোন অঞ্চলের সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে সংযুক্ত’—তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে স্থলপথে সংযোগের প্রশ্নটি এই বৃহত্তর বাস্তবতারই অংশ। বিষয়টি কেবল একটি সড়ক বা রেলপথ নির্মাণের নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, আঞ্চলিক বাণিজ্য, শিল্পায়ন, সরবরাহব্যবস্থা ও ভূ-রাজনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে জড়িত। চীনের ইউনান প্রদেশ, মিয়ানমারের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চল এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রামকেন্দ্রিক বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে কার্যকর বহুমাত্রিক সংযোগ গড়ে উঠলে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনকে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার একটি নতুন অর্থনৈতিক অক্ষ তৈরি হতে পারে।

তবে একটি করিডর তখনই অর্থবহ হয়, যখন সড়ক বা রেলপথের সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস, গুদাম, লজিস্টিকস, ডিজিটাল বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনের সমন্বয় ঘটে। সড়ক নির্মাণ করিডরের সূচনা হতে পারে, কিন্তু করিডর অর্থনীতি গড়ে ওঠে তার চারপাশে উৎপাদন, বাণিজ্য ও সেবার একটি সমন্বিত বাস্তুতন্ত্র তৈরি হলে। তাই এটি একই সঙ্গে পরিবহন প্রকল্প, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ভূ-অর্থনৈতিক কৌশলের প্রশ্ন।

দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশ দীর্ঘদিন ধরেই সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূল অত্যন্ত উন্নত হলেও ইউনান ও আশপাশের অভ্যন্তরীণ প্রদেশগুলো সমুদ্রবন্দর থেকে তুলনামূলকভাবে দূরে। ফলে আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে তাদের অনেকাংশে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় বন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই বাস্তবতা চীনের জন্য পরিবহনব্যয় কমানো, অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং বিকল্প সরবরাহপথ তৈরির প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে তাই দক্ষিণমুখী সংযোগের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে আরও কার্যকর যোগাযোগ গড়ার লক্ষ্য রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত সরবরাহশৃঙ্খলের বৈচিত্র্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি। এ লক্ষ্য থেকেই চীন মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর, তেল ও গ্যাস পাইপলাইন এবং অর্থনৈতিক করিডরে বিনিয়োগ করে আসছে। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত কিয়াউকফিউ ইউনানকে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের একটি সরাসরি ভূ-অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বারের সম্ভাবনা তৈরি করে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি স্বাভাবিক সম্ভাব্য অংশীদার। ভৌগোলিকভাবে দেশটি দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, মিয়ানমার, দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী সংযোগবিন্দু। এর সঙ্গে রয়েছে চট্টগ্রামসহ একাধিক সমুদ্রবন্দর, ক্রমবর্ধমান শিল্পভিত্তি, বৃহৎ ভোক্তাবাজার এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সেতুর সুযোগ। কুনমিং থেকে ম্যান্ডালে, সেখান থেকে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চল ও রাখাইন হয়ে চট্টগ্রামে কার্যকর সড়ক ও রেলসংযোগ গড়ে উঠলে চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির বন্দর নয়, আঞ্চলিক ট্রানজিট ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা পাবে।

এমন সংযোগে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পণ্য বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারে; আবার বাংলাদেশের শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য রপ্তানি পণ্যও দ্রুততর আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। এর ফলে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নতুন শিল্প, গুদামজাতকরণ, পরিবহন, সীমান্তবাণিজ্য ও লজিস্টিকস সেবার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। করিডরটি যদি কেবল ‘পথ’ না হয়ে উৎপাদন ও বাণিজ্যের সমন্বিত অর্থনৈতিক অক্ষ হয়, তবে তার প্রভাব বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলেও পড়বে।

একসময় বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারকে নিয়ে বিসিআইএম করিডোরের ধারণা ব্যাপক আলোচনায় এসেছিল। রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে উদ্যোগটি কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি, তবে এর অন্তর্নিহিত যুক্তি আজও প্রাসঙ্গিক। বিসিআইএমের মূল লক্ষ্য ছিল সংযোগের মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও মানুষের চলাচল বাড়ানো এবং বিচ্ছিন্ন জাতীয় অর্থনীতিকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা। বর্তমান বিশ্বে সরবরাহশৃঙ্খলের বৈচিত্র্য ও বিকল্প বাণিজ্যপথের গুরুত্ব বাড়ায় সংযোগের প্রয়োজনীয়তা বরং আরও বেড়েছে।

এই সংযোগ বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক সুযোগ তৈরি করতে পারে। প্রথমত, এটি রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্য আনতে সহায়তা করবে। বাংলাদেশের রপ্তানি এখন প্রধানত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকানির্ভর; ফলে বৈশ্বিক মন্দা, বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন বা ভূ-রাজনৈতিক সংকটে ঝুঁকি তৈরি হয়। এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজার, বিশেষ করে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য ও ডিজিটাল সেবার জন্য নতুন সম্ভাবনা খুলতে পারে। তবে এর জন্য প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, মান নিয়ন্ত্রণ, মানদণ্ডের স্বীকৃতি ও দ্রুত কাস্টমস ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, সংযোগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিকতা থেকে ছড়িয়ে দিতে পারে। করিডরের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ সড়ক, রেল, নৌপথ ও বন্দর যুক্ত হলে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও বৃহত্তর পূর্বাঞ্চল নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। শিল্প, গুদামজাতকরণ, পরিবহন ও পর্যটনের বিকাশ স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসে সহায়ক হবে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ট্রানজিট ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। সিঙ্গাপুর, দুবাই বা নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা বলছে, কৌশলগত অবস্থান নিজে থেকে সম্পদ নয়; তাকে সম্পদে রূপান্তর করতে চাই কার্যকর প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ ও বাণিজ্যবান্ধব নীতি। বাংলাদেশ যদি বন্দর, নৌপথ ও স্থলসংযোগকে একটি সমন্বিত লজিস্টিকস ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তবে ট্রানজিট ফি-র পাশাপাশি বন্দরসেবা, গুদামজাতকরণ, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, বিমা, ব্যাংকিং, প্যাকেজিং ও পরিবহনসেবা থেকেও বড় অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে পারবে।

কিন্তু এই সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তব চ্যালেঞ্জও বড়। মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এখন সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি সড়ক, রেল বা বাণিজ্যিক করিডর বাস্তবায়নকে জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক করিডরের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ ভূখণ্ড, কার্যকর প্রশাসন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, আইনগত নিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—যা বর্তমান মিয়ানমারে অনিশ্চিত।

রোহিঙ্গা সংকটও এই সমীকরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার আশ্রয়দাতা, আর সংকটের মূল উৎস মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। তাই মিয়ানমারের সঙ্গে বড় সংযোগ প্রকল্পের আলোচনায় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি মানবিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতাকেও বিবেচনা করতে হবে। বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে বলতে পারে, রাখাইনে টেকসই শান্তি, নিরাপদ পরিবেশ ও রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া কোনো করিডরের দীর্ঘমেয়াদি সফলতা সম্ভব নয়। সংযোগ ও শান্তি তাই পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং পরস্পরনির্ভর উন্নয়ন প্রক্রিয়া।

এছাড়া নিশ্চিত করতে হবে যে সংযোগের সুবিধা একমুখী না হয়ে পারস্পরিক হয়। বিশ্বের বহু দেশ বড় করিডর প্রকল্পে অংশ নিয়েও প্রত্যাশিত লাভ পায়নি, কারণ তারা শিল্পভিত্তি, বন্দর সক্ষমতা, দক্ষ জনশক্তি ও নীতিগত প্রস্তুতিকে একই গতিতে এগিয়ে নিতে পারেনি। ফলে করিডর দিয়ে পণ্য চললেও মূল্য সংযোজনের বড় অংশ অন্যত্র চলে যায়। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি করিডর অর্থনীতি, যেখানে দেশ শুধু ট্রানজিটের ভূখণ্ড নয়; বরং উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন, আর্থিক সেবা ও পুনঃরপ্তানির মাধ্যমে মূল্যশৃঙ্খলের উল্লেখযোগ্য অংশ নিজের মধ্যে ধরে রাখবে।

মনে রাখতে হবে, করিডর লক্ষ্য নয়; তা জাতীয় সমৃদ্ধির একটি মাধ্যম। একটি প্রকল্পের সাফল্য নির্ধারিত হবে কত কিলোমিটার সড়ক বা রেলপথ হলো তাতে নয়; বরং সেটি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়াল তাতে। একই সঙ্গে পরিবেশগত, সামাজিক, নিরাপত্তাগত ও আর্থিক ঝুঁকিও হিসাবে রাখতে হবে। অর্থাৎ নীতি হওয়া উচিত প্রকল্পকেন্দ্রিক নয়, ফলাফলকেন্দ্রিক।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে তাই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানকে কেবল মানচিত্রের বাস্তবতা হিসেবে রেখে দেওয়া যায়; আবার অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিল্প, মানবসম্পদ ও কূটনীতির সমন্বিত ব্যবহারে সেটিকে অর্থনৈতিক শক্তি ও কৌশলগত সম্পদে রূপান্তরও করা যায়। তবে নীতিটি হওয়া উচিত অতি-আশাবাদী বা অতি-সন্দেহপ্রবণ কোনোটিই নয়; বরং সম্ভাবনা, ব্যয়, ঝুঁকি ও জাতীয় স্বার্থের সুসংহত মূল্যায়নে ধাপে ধাপে এগোনো।

এর জন্য প্রয়োজন সম্ভাব্য রুট ও বিকল্প রুট নিয়ে সমীক্ষা, বন্দর ও লজিস্টিকস সক্ষমতা বৃদ্ধি, সীমান্ত অবকাঠামো আধুনিকায়ন, কাস্টমস সংস্কার এবং মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নজর রাখা। পরিস্থিতি অনুকূল হলে যেন বাংলাদেশ প্রস্তুত থাকে, আবার প্রতিকূল হলে যেন অতিরিক্ত ঝুঁকিতে না পড়ে—এই দ্বৈত প্রস্তুতিই বাস্তববাদী নীতির ভিত্তি হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত মিয়ানমার করিডর বাংলাদেশের জন্য কেবল চীনের সঙ্গে একটি নতুন স্থলপথের সম্ভাবনা নয়; এটি নিজের ভূগোলকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনে রূপান্তর করা যায়, তার একটি বড় পরীক্ষা। প্রশ্নটি কেবল ‘চীনের সঙ্গে সংযোগ হবে কি না’ তা নয়; বরং ‘সংযোগ হলে বাংলাদেশ তার কতটা মূল্য নিজের অর্থনীতি, শিল্প ও মানুষের উন্নয়নে রূপান্তর করতে পারবে’—সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে সমন্বিত করে এগোলে বঙ্গোপসাগর থেকে ইউনান পর্যন্ত সম্ভাব্য এই সংযোগ বাংলাদেশের জন্য নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। ভূগোল তখন আর শুধু অবস্থান থাকবে না; সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার মাধ্যমে সেটিই হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি।

লেখক:  ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন

কেকে/সাশ 


আরও সংবাদ   বিষয়:  মিয়ানমার করিডর   বাংলাদেশের সম্ভাবনা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close