এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও চারজনের প্রাণ গেছে। এ নিয়ে চলতি বছর মৃতের সংখ্যা ৩৩৫। নতুন ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১৮১ জন, বছরে মোট ভর্তি ১ লাখ ৮ হাজার ৪৪০ জন। বছর শেষ হতে আড়াই মাস বাকি থাকতেই ভর্তি রোগীর সংখ্যা গত বছরের পুরো বছরের হিসাবকে ছাড়িয়ে গেছে।
গত বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন, মারা যান ৪১৩ জন। এবার বছর শেষ হতে আড়াই মাস বাকি থাকতেই ভর্তি রোগীর সংখ্যা গত বছরের পুরো বছরের হিসাবকে ছাড়িয়ে গেছে। বছরের শুরুটা ছিল তুলনামূলক শান্ত। জুলাইয়ের শেষ নাগাদ মোট আক্রান্ত ছিলেন ১৩ হাজার ৬৪৪ জন। তারপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। সেপ্টেম্বরেই ভর্তি হয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন, মৃত্যু হয়েছে ১৪৮ জনের।
অক্টোবরেও গতি কমেনি। ৫ অক্টোবর পর্যন্ত মৃত্যু ছিল ২৭১, যা গতকাল পর্যন্ত ৩৩৫। এগারো দিনে ৬৪টি প্রাণ গেছে এবং দৈনিক ভর্তি প্রায় দুই হাজারের কাছাকাছি থেকেছে।
একটি তথ্য কিছুটা স্বস্তির। ভর্তি রোগীর অনুপাতে মৃত্যুহার এ বছর প্রায় ০.৩ শতাংশ, গত বছর ছিল প্রায় ০.৪ শতাংশ, আর ২০২৩ সালে (৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি ভর্তি, ১ হাজার ৭০৫ মৃত্যু) ছিল প্রায় ০.৫ শতাংশ। চিকিৎসা-ব্যবস্থাপনায় কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত এতে আছে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বাড়লে মৃত্যুহার কম থাকলেও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ে। তা ছাড়া এই হিসাব শুধু হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের, ঘরে থাকা বা শনাক্তের বাইরে থাকা রোগীরা এতে নেই। ডেঙ্গু নিধনে বিশ্বের অভিজ্ঞতাকে আমরা কাজে লাগাতে পারি। সিঙ্গাপুর ওলবাকিয়াযুক্ত পুরুষ মশা ছেড়ে বন্য এডিসের সংখ্যা কমাচ্ছে। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে এতে ডেঙ্গুর ঝুঁকি প্রায় ৭১-৭২ শতাংশ কমেছে।
ইন্দোনেশিয়ার ইয়গ্যাকার্তায় মশা প্রতিস্থাপনের কৌশলে ডেঙ্গু প্রায় ৭৭ শতাংশ কমেছিল। ব্রাজিল গেছে টিকার পথে। তাদের এক ডোজের বুটানটান-ডিভি টিকা ১২ থেকে ৫৯ বছর বয়সিদের মধ্যে গুরুতর ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে ৯১.৬ শতাংশ কার্যকর, এবং তা সরকারি ব্যবস্থায় বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে। এই দেশগুলো ডেঙ্গুকে মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখে না, দেখে বছরব্যাপী বিজ্ঞাননির্ভর কর্মসূচি হিসেবে। আমাদের উদ্যোগ এখনো অনেকটা প্রতিক্রিয়াশীল রোগী বাড়লে অভিযান, কমলে শিথিলতা। তবে সতর্কতাও জরুরি। সম্পদে সীমাবদ্ধ দেশে একই ফল মিলবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তাই দেশীয় বাস্তবতায় পরীক্ষা অপরিহার্য।
এই পরিস্থিতিতে সরকারকে ডেঙ্গু মোকাবিলায় কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছি। প্রথমত স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে বছরব্যাপী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ও নিশ্চিত বরাদ্দ জরুরি। সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় নির্মাণস্থল ও জমে থাকা পানির নিয়মিত তদারকি এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ। জেলাভিত্তিক মশার ঘনত্ব, ভাইরাসের সেরোটাইপ ও শনাক্তকরণের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে।
দিত্বীয়ত জেলা ও উপজেলায় পরীক্ষা, রক্ত, স্যালাইন ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে ওলবাকিয়ার নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা যেতে পারে। টিকার কার্যকারিতা, মূল্য ও সরবরাহ মূল্যায়নে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করতে হবে। কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই করে এর বিজ্ঞানসম্মত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল, মসজিদ ও মহল্লায় স্থায়ী সচেতনতা কার্যক্রম।
ডেঙ্গু নতুন নয়, ২০২৩ সালের ভয়াবহতাও আমরা দেখেছি। প্রতিবার সংকটে উদ্যোগ নিই, সংকট কমলে থেমে যাই। এই চক্র না ভাঙলে প্রতিটি বর্ষা-পরবর্তী মৌসুমে একই শোক ফিরে আসবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণযোগ্য, তবে তার জন্য চাই রাজনৈতিক অঙ্গীকার, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ। আজকের ৩৩৫ জনের মৃত্যু যেন আগামী বছরের জন্য শেষ সতর্কবার্তা হয় সেই প্রত্যাশা করছি।
কেকে/সাশ